ঢাকা     বুধবার   ১৭ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৪ ১৪৩১

বাংলাদেশে যে ভাষায় কথা বলেন মাত্র দু’জন 

নিউজ ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩৯, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৫:৫৮, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বাংলাদেশে যে ভাষায় কথা বলেন মাত্র দু’জন 

ভেরোনিকা কেরকেট্টা ও ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা (বামে), ছবি : বিবিসি বাংলা

ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা ও তার বড় বোন ভেরোনিকা কেরকেট্টা। পেশায় চা-শ্রমিক। দু’জনেরই আঞ্চলিক ভাষা ‘খাড়িয়া’। ভাষা গবেষকরা বিসিসি বাংলাকে জানান, বাংলাদেশে এই দুই বোনই কেবল অনর্গল খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন। খাড়িয়া ‘পারসি ভাষা’ হিসেবেও পরিচিত।

বাংলাদেশে সিলেট অঞ্চলের ৩৫টি চা বাগানের গ্রামে তিন থেকে পাঁচ হাজারের মতো খাড়িয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে। তবে, ভেরোনিকা কেরকেট্টার আক্ষেপ করে বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এখন যদি আমরা দুই বোন মারা যাই, এই ভাষাও আমাদের সাথে সাথে শেষ হয়ে যাবে। কারণ, আর কেউ তো বলতে পারে না।’

শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা বাগানের অদূরে বর্মাছড়া খ্রিস্টান পাড়ায় দুই বোন ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা ও ভেরোনিকা কেরকেট্টার বসবাস। তাদের পিতামাতা এসেছিলেন ভারতের রাঁচি থেকে। মা-বাবার কাছে খাড়িয়া বলতে শিখলেও এ ভাষায় লেখাপড়ার কোনো সুযোগ ছিল না তাদের। এখন পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে প্রয়োজন অনুসারে বাংলা, সাদরি এবং বাগানি ভাষায় কথা বলেন।

এর কারণ, পরিবার-পরিজন, পরবর্তী প্রজন্ম, পাড়া, গ্রামে কোথাও খাড়িয়া ভাষায় কথা বলার মতো মানুষ নেই। মাতৃভাষার চর্চা, বইপত্র এবং সংরক্ষণের অভাবে বাংলাদেশ থেকেই হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে ভাষাটির।

খাড়িয়া সমাজ প্রধান জহরলাল পাণ্ডে জানান, হাতে গোনা দশ-পনেরজন খাড়িয়া ভাষার গুটিকয়েক শব্দার্থ জানেন এবং কিছু কিছু বোঝেন। সব মিলিয়ে কিন্তু বাংলাদেশে খাড়িয়াদের মুখের ভাষা হিসেবে এটি এখন মৃতপ্রায়।

তিনি বিবিসি বাংলাকে আরও জানান, আমাদের পূর্বপুরুষরা এসেছে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি থেকে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, বাগানের জীবিকা নির্বাহের খাতিরে। ওরা যে ভাষাটা নিয়ে আসছে সেটা প্রয়োগ করতো। আমরা এখন বুঝতে পারতেছি কিন্তু কীভাবে ভাষাটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখবো সেটা তো জানি না। যেমন এখন এরা দুই জন (ক্রিস্টিনা ও ভেরোনিকা) আছে। এই দুই জন যদি চলে যায়, তাহলে বাংলাদেশে এই ভাষাটা থাকবেও না।

ক্রিস্টিনা ও ভেরোনিকা কথা বলতে পারলেও খাড়িয়া ভাষায় লিখতে বা পড়তে পারেন না। এ ভাষায় কোনও বইপত্র বা শিক্ষার ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। এ ছাড়া, চা বাগানের পাড়াগুলোয় মিশ্র জাতির বসবাস থাকার কারণে সেখানে এখন বাগানে প্রচলিত ভাষা এবং বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

ক্রিস্টিনা বলেন, বাচ্চারা স্কুলে যায়। বাংলা ভাষায় পড়ালেখা করে। বাংলা কথা বলে। বাংলা ভাষা ভালবাসে।

বর্মাছড়া গ্রামের শিশুরা যে স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা পায় সেখানে অন্তত আটটি নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। বর্মাছড়া শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে খাড়িয়া শিশু আছে ১৮-২০টি। স্কুলে গিয়ে দেখা গেল তাদের পাঠদান হচ্ছে বাংলায়।

এই স্কুলের দুজন শিক্ষিকাও খাড়িয়া সম্প্রদায়ের। তারাও খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন না। তাদের একজন লিজা নানোয়ার বলেন, আমরা এখানে খুব সংখ্যালঘু। জন্ম থেকেই ভাষাটা শুনিনি। দু’একজন পারেন, তারা বাড়িতে ব্যবহার করে। আমরা সামগ্রিকভাবে এটা পাইনি। বই আমি দেখিনি। বলতে গেলে আমরা হারিয়েই ফেলছি ভাষাটাকে। আর এখানে স্কুলে আমাদের পড়ানোর মাধ্যম হলো বাংলা। এই অবস্থায় আমরা বুঝতে পারি আমরা আসলে অনেক কিছু হারিয়েছি।

খাড়িয়া সম্প্রদায়ের আরেকজন শিক্ষিকা গীতা বলেন, মাঝে মাঝে লজ্জিতবোধ করি। আমিও যদি ভাষাটা পারতাম। কথা বলতে পারতাম, পড়তে পারতাম, নাচ-গানও করতে পারতাম!

ভারতের উড়িষ্যা এবং ঝাড়খণ্ডে খাড়িয়া ভাষা প্রচলিত আছে। সেখানে এ ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। আছে বইপত্র এবং ব্যাকরণও। কিন্তু বাংলাদেশে এই ভাষা সংরক্ষণ বা পাঠদানের ব্যবস্থা নেই। ক্রিস্টিনা জানান, বাংলাদেশে খাড়িয়া জাতি পাবেন। কিন্তু এই ভাষা আর পাবেন না। আমাদের জাতি আছে ভারতে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। দেখা করতে পারি না। আমাদের ভয় করে। আমাদের তো পাসপোর্ট নেই। সেরকম টাকা নেই, তাই করতে পারি না।

খাড়িয়া ভাষা বাঁচিয়ে রাখতে নাতি-নাতনির সঙ্গে এ ভাষায় কথা বলেন সত্তরোর্ধ ভেরোনিকা কেরকেট্টা। তিনি বলেন, এই ভাষায় যেন বইপত্র হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে। তারা বই পেলে পড়ালেখা করে এই ভাষা বুঝতে পারবে।

মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জনের সুযোগ না থাকাতে ভাষাটি বাংলাদেশ থেকে বিপন্নপ্রায় হিসেবেই দেখছেন ভাষা গবেষকরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাশরুর ইমতিয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, খাড়িয়া বাংলাদেশে বিপন্ন ভাষাগুলোর একটি। এ ভাষাটার সর্বশেষ দুজন ভাষী আছেন। তারা যদি হারিয়ে যায় তাহলে একই সঙ্গে হারিয়ে ফেলবো যে খাড়িয়া ভাষা বাংলাদেশে এসেছিল কীভাবে। এই সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, গল্প কিংবা ধারণা- সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু ভারতে খাড়িয়া ভাষা ও ব্যাকরণ সংহত আছে তাই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমেও এ ভাষা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা যায়।

ঢাকা/এনএইচ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়