ঢাকা     বুধবার   ১৭ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৪ ১৪৩১

রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার সমিতির নির্বাচন

আওয়ামীপন্থীদের চাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ফল স্থগিত

রাজশাহী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:২৪, ১ মার্চ ২০২৪   আপডেট: ২২:৫৮, ১ মার্চ ২০২৪
আওয়ামীপন্থীদের চাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ফল স্থগিত

ভোট গণনা শেষ। ফল ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। এমন সময় আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা দাবি করলেন ভোট পুনর্গণনার। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাতে রাজি নন। এ নিয়ে হট্টগোল। একপর্যায়ে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন। চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করেছেন। ফলে নির্বাচনের ফল ঘোষণা স্থগিত হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার সমিতির নির্বাচনে এমন ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর শুক্রবার বেলা ১১টায় বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা সংবাদ সম্মেলন করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা দ্রুত ফল ঘোষণা করারও দাবি জানিয়েছেন। নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট এলাকার একটি হোটেলের সম্মেলন কক্ষে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরাবরই দুটি প্যানেলে রাজশাহী বার সমিতির নির্বাচন হয়ে থাকে। এবারও আওয়ামী আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলে নির্বাচন হয়। মোট ২১টি পদের বিপরীতে দুই প্যানেলের একজন করে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আওয়ামী আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি প্রার্থী ছিলেন মো. ইব্রাহিম। আর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন সাইফুর রহমান খান রানা। বিপরীত প্যানেলে সভাপতি পদে আবুল কাশেম ও সাধারণ সম্পাদক পদে জমসেদ আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৬৮৩ জন। এরমধ্যে ৬৩৭ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোটগ্রহণের পর রাতে গণনা শুরু হয়। ১১টি টেবিলে তিনজন করে ভোট গণনা শুরু করেন। এই তিনজনের মধ্যে দুই প্যানেল থেকে দুইজন এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একজন ছিলেন। গণনার পর বিভিন্ন টেবিল থেকে আসা ফল একত্রিত করছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শেখ জাহাঙ্গীর সেলিম। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ফল ঘোষণার প্রস্তুতি নেন। এমন সময় আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা আবারও ভোট গণনার দাবি জানান। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এতে অসম্মতি জানান। তিনি বলেন, ‘ফল নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তারা তিন দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন।’

তার এ কথার পর শুরু হয় হট্টগোল। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা দাবি করেন, নির্বাচনে তাদের প্যানেলের সভাপতি-সম্পাদকসহ ১৯ জন বিজয়ী হয়েছেন। শুধু সদস্য পদে আওয়ামীপন্থী দু’জন বিজয়ী হয়েছেন। এ কারণে আওয়ামীপন্থীরা জটিলতার সৃষ্টি করছেন। এ সময় দুইপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও শুরু হয়। একপর্যায়ে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা লাথি দিয়ে ব্যালট বক্স ভেঙে ফেলেন। এসময় তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করতে থাকেন।

চাপের মুখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফল ঘোষণা না করে রাত ১টার দিকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদকে ফোন করেন। পরে জেলা প্রশাসক একজন কর্মকর্তাকে পাঠালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্যালটগুলো অন্য একটি বক্সে ঢুকিয়ে তার হাতে তুলে দেন। ব্যালট বক্সটি এখন জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি শাখায় রয়েছে। রাজশাহী বার সমিতির নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল।

এই ঘটনার পর শুক্রবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী আবুল কাশেম, রাজশাহী মহানগর সভাপতি আইনজীবী এরশাদ আলী ঈসা, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী শফিকুল হক মিলন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী পারভেজ তৌফিক জাহেদীসহ বিএনপিপন্থী অন্য আইনজীবীরা।

তারা দাবি করেন, ২১টি পদের মধ্যে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১৯টিতেই তাদের প্যানেলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। টেবিলে টেবিলে ভোট গণনার সময় থাকা তাদের প্যানেলের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তারা এই ফল জেনেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও এই ফল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা দেখেন যে, সভাপতি পদে তাদের প্রার্থী মাত্র তিন ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হচ্ছেন। তাই তারা ফল পুনর্গণনার দাবি জানান। কিন্তু অতীতে কখনও এ রকম হয়নি বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এতে অসম্মতি জানান। এরপরই তারা নির্বাচনের ফল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। এই পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করেন। তারা এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে সুষ্ঠুভাবে ভোটের ফল প্রকাশের আহ্বান জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি প্রার্থী মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘এটা আমাদের বার সমিতির অভ্যন্তরীণ বিষয়। এসব নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক না।’ বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা সংবাদ সম্মেলন করে কী অভিযোগ তুলেছেন, সেটাও জানি না। আগে দেখি, তারপর আমরা কথা বলব।’

পদত্যাগ করা প্রধান নির্বাচন কমিশনার শেখ জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘ফল ঘোষণার আগমূহুর্তে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরাই হট্টগোল করেছেন। তারা অযৌক্তিকভাবে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান। তা না করার কারণে তারা ব্যালট বক্স ভেঙে দেন। আমাকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। আমি পদত্যাগ করে ব্যালট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখায় দিয়ে দিয়েছি। এখন এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে জেলা প্রশাসন। আমি এসবের মধ্যে নেই।’

কেয়া/ফয়সাল

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়