ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৮ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪৩১

রানা প্লাজা ট্রাজেডির ১১ বছর

কেমন আছে পিতৃ-মাতৃহীন শিশুরা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪১, ২৪ এপ্রিল ২০২৪  
কেমন আছে পিতৃ-মাতৃহীন শিশুরা

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি কাঁদিয়েছে সারা বিশ্বকে। আবার, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে রেশমা নামের এক তরুণীকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও মানুষকে বিস্মিত করেছে।

প্রায় দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক পঙ্গুত্বসহ নানান শারীরিক ক্ষত নিয়ে আজও বেঁচে আছেন। কিন্তু সেদিনের ঘটনায় নিহত এবং আহতদের শিশু সন্তানদের ভবিষ্যত কি হবে, তাদের ভরণপোষণ এবং পুনর্বাসন কে করবে, তা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল; ঘটনার ১১ বছর পরও সেই অনিশ্চয়তা কাটেনি।

রানা প্লাজা ট্রাজেডির এগারো বছর পূর্ণ হলো। পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের অনেককে আশ্রয় দেওয়ার মতো কোন আত্মীয়স্বজন ছিল না। ধাপে ধাপে এই ধরনের শতাধিক শিশুর ঠাঁই হয়েছে গাইবান্ধায় ‘অরকা হোমস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে।

হঠাৎ করেই জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে আসা এসব ছোট ছোট অসহায়, এতিম শিশুরা কেমন আছে জানতে সরেজমিনে বুধবার (২৪ এপ্রিল) সকাল ১১টায় অরকা হোম পরিদর্শন করা হয়।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে অবস্থিত এই ‘অরকা হোম’ নামের প্রতিষ্ঠানটি। বেশ গোছানো ও পরিপাটি পরিবেশ। মানসম্মত আবাসিক ব্যবস্থাসহ তাদের জন্য রয়েছে উন্নত খাবার, প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান, বিনোদন, ক্রীড়া সামগ্রী ও পৃথক পাঠাগার।
অরকা হোমস সূত্রে জানা গেছে, রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠনের (ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন) সদস্যরা ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে ২০১৪ সালে ‘অরকা হোম’ নামের এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনতলা বিশিষ্ট দু’টি এবং প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলা বিশিষ্ট অপর একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। এর একটি ভবনে ছেলে শিশু এবং অপর ভবনে মেয়ে শিশুরা বসবাস করছে।

বর্তমানে এখানে মোট ৫৭ জন এতিম শিশু লেখাপড়া করছে। তাদের মধ্যে ২২ জন শিশু রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে পিতা-মাতাকে হারিয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩৫ এতিম শিশু এখানে বসবাস করছে। অরকা হোমের মাঠেই রয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোসেনপুর মুসলিম একাডেমি। এখানেই লেখাপড়া করছে এসব অনাথ শিশুরা। এই স্কুলে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার ব্যবস্থা রয়েছে।

রানা প্লাজা ধসে গুরুতর আহত হন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার শাহিনুর বেগম। তার ছেলে শাহজাহান আকন্দ 'অরকা হোমে' বড় হচ্ছে। আহত শাহিনুর বেগম বলেন, আমি জানি না আমার এবং আমার ছেলের ভবিষ্যৎ কি। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি তেমন কোন সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। আশ্বাসের উপরই জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। ইচ্ছে ছিল, ভালো অংকের ক্ষতিপূরণ পেলে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবো। এখন আশায় আছি, যদি কোন সহযোগিতা পাই। অরকা হোমে নিজের ছেলের যত্ন সম্পর্কে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

একই উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের মরুয়াদহ গ্রামের বাসিন্দা হারুন উর রশিদ। সেদিনের রানা প্লাজা ভবন ধসে তার স্ত্রী পারভিন বেগম গুরুতর আহত হন। তাদের দুই সন্তান জিম পারভেজ রানা ও সুরাইয়া আক্তার অরকা হোমে থেকে লেখাপড়া করছে।

হারুন অর রশিদ বলেন, আমার স্ত্রী এখনো খুব অসুস্থ। ডায়াবেটিস আছে। কয়েকদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তার পায়ের একটি আঙ্গুল কেটে দিয়েছেন চিকিৎসক। আমি দরিদ্র মানুষ। আমার পক্ষে চিকিৎসা খরচ বহন করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আজ থেকে ৬/৭ বছর আগে সরকার থেকে নেওয়া ব্যাংক একাউন্ট নাম্বারে এক লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলাম। এরপর আর কেউ কোন খোঁজ-খবর নেয়নি।

রানা প্লাজা ভবন ধসে নিহত হন মানিকগঞ্জের রওশন আরা বেগম। পরিবার থেকে দেখভালের কেউ না থাকায় তার সন্তান তাহমিনা আক্তার বিথি গাইবান্ধার অরকা হোমে থেকে লেখাপড়া করছে। তাহমিনা আক্তার বিথি বলেন, অনেক কষ্টের মধ্যেও আমরা এখানে ভালো আছি। মা মারা যাওয়ার পর বাবা অন্য জায়গায় বিয়ে করেছেন। তিনি আর তেমন খোঁজ-খবর নেন না। এখানকার লেখাপড়া ও খাবারের মান ভালো। এই অরকা হোমের তত্ত্বাবধানে যারা আছেন, তারা সবাই খুব ভালো।

রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে অরকা হোমে পড়ছে রিক্তা বানু ও মাসতুরা আক্তার। রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে মারা যান তাদের মা মমতা বেগম। এরপর থেকেই পিতৃ-মাতৃহীন দুই এতিম শিশুর এখানে ঠাঁই হয়েছে।

অরকা হোমের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা ২০১৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের নিজস্ব অর্থায়নে এই হোম পরিচালিত হচ্ছে। সম্পূর্ণ ক্যাডেট কলেজের পরিবেশে পিতৃ-মাতৃহীন এসব শিশুর লেখাপড়া, থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ অরকা হোম বহন করছে।

তিনি আরও বলেন, ছেলে এবং মেয়ে শিশুদের জন্য আলাদা আলাদা ভবন রয়েছে। গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হতাহতদের ছেলেমেয়েরা এখানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের কারো বাবা নেই, কারো আবার মা নেই। কোন কোন শিশুর বাবা-মা দু'জনই নেই। বুধবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে আসরের নামাজের পর নিহত ও তাদের সন্তানদের জন্য দোয়া করা হয়। এ ছাড়া রাত ১০টায় সাবেক এক ক্যাডেট আমেরিকা থেকে জুম কলের (ভিডিও কল) মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং দোয়া করবেন।

২০১৩ সালের ওই ঘটনার পর ২০১৪ সাল থেকে যারাই রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়েছেন, তারাই এই অরকা হোমের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। এসব অনাথ শিশুদের জন্য তাদের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

অরকা হোমের প্রতিষ্ঠাতা হোসেনপুর গ্রামের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ক্যাপ্টেন) জাহান ইয়ারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির আরেক দাতা সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ক্যাপ্টেন) জাহান ইয়ারের ছোট ভাই জাহিদুল হক বলেন, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে নিহতদের সন্তানদের পুনর্বাসন করার চিন্তা থেকেই রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্ররা এই অরকা হোম প্রতিষ্ঠা করেন। আমি নিজে উত্তরা ব্যাংকের এরিয়া ম্যানেজার (এজিএম) ছিলাম। গত বছর রিটায়ার্ড করে এখানকার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। মূলত, মানবিক দিক বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। এখানে লেখাপড়া করে অনেকেই এখন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। অনাথ শিশুদের জন্য এখানে সবকিছুই বিনামূল্যে করা হয়। তাদের জন্য উন্নত পরিবেশের পাশাপাশি উন্নত খাবার এবং চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে। আমরা চাই, এখানকার প্রতিটি শিশু উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। তারাও সমাজের জন্য অবদান রাখুক।

মাসুম/ফয়সাল

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ