ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৫ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ১২ ১৪৩১

খুলনা প্রিন্টিংয়ের শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেন, তদন্তের নির্দেশ

নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:০৩, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  
খুলনা প্রিন্টিংয়ের শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেন, তদন্তের নির্দেশ

পুঁজিবাজারে পেপার ও প্রিন্টিং খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের (কেপিপিএল) শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া এবং অধিক পরিমাণ লেনদেনের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এজন্য বিএসইসি দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের কারখানায় উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে। তারপরও কোম্পানিটির শেয়ারের দাম রহস্যজনকভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত রোববার (৪ ফেব্রুয়ারি) কোম্পানিটির বর্তমান পরিস্থিতি জানার জন্য কারখানা পরিদর্শন করেছে ডিএসইর পরিদর্শক দল। পরিদর্শনকালে তারা কারখানাটি বন্ধ পেয়েছে। এ খবর প্রকাশ পাওয়ার পরেও কোম্পানিটির শেয়ারের দামের উল্লম্ফন থামেনি। এরই ধারাবাহিকতায় কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া এবং হঠাৎ অধিক পরিমাণ শেয়ার লেনদেনের কারণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪ কার্যদিবসে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের শেয়ারের দাম ৩০.৮০ টাকা বেড়েছে। গত ২ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ২৬ টাকা। ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬.৮০ টাকায়। ফলে, এ সময়ের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১১৮.৪৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া, ২ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮৭১ টাকা। ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ লাখ ৬১ হাজার ১৯২ টাকা। ফলে, কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অস্বাভিক বেড়ে যাওয়া এবং হঠাৎ অধিক পরিমাণ শেয়ার লেনদেন বিএসইসির সার্ভিল্যান্স বিভাগের নজরে এসেছে।

ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাকে (সিআরও) পাঠানো চিঠিতে বিএসইসি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের শেয়ারের দাম ও পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্য এবং শেয়ারের পরিমাণ বৃদ্ধি সংক্রান্ত কোনো মূল্য-সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেনি। এ পরিস্থিতিতে ডিএসইকে কোম্পানিটির শেয়ারের লেনদেন সম্পর্কে বিশদ বিবরণে ওপর উল্লেখিত সময়ের জন্য তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, দেখা যাচ্ছে যে, কোম্পানিটির শেয়ার ২৬ টাকা থেকে ৫৬.৮০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে গত ২ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। অর্থাৎ কোম্পানিটির শেয়ার উল্লিখিত সময়ে ১১৮.৪৬ শতাংশ বেড়েছে। এই চিঠি জারির তারিখ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে বিএসইসির কাছে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলো।

এদিকে, চলতি বছরের গত ২৯ জানুয়ারি শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে ডিএসই কোম্পানিটিকে চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির জবাবে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ ডিএসইকে জানায়, কোনো প্রকার অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই তাদের শেয়ারের দাম বাড়ছে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের মতে, উৎপাদন বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এর পেছনে কোনো কারসাজি আছে কি না, তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের শেয়ার নিয়ে কোনো কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা সতর্ক না হলে এই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হতে পারে।

কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে আসছে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। লোকসান গুনতে থাকার মধ্যেই কোম্পানিটির উৎপাদ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ প্রায় দুই বছর ধরে কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ আছে। ইতোমধ্যে কোম্পানিটির পুঞ্জিভূত লোকসান ও দায় তার পরিশোধিত মূলধনকেও ছাড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০২২) কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে (০.০৬) টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল (১.৯৬) টাকা। এছাড়া অর্ধবার্ষিক প্রান্তিকে (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২২) কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে (০.১১) টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) ছিল (২.৯৯) টাকা। এছাড়া, সর্বশেষ ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ০.২৫ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এরপর থেকে কোম্পানিটি আর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।

প্রসঙ্গত, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৪ সালে। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৭৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। সে হিসেবে কোম্পানিটির মোট শেয়ার ৭ কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজারটি। এর মধ্যে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩৯.৭৬ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১.১১ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৯.১৩ শতাংশ শেয়ার আছে। মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৫২.৫০ টাকায়।

এনটি/রফিক

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়