ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ১১ ১৪৩১

‘পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানায় বিনিয়োগ বেশি কিন্তু রিটার্ন ভালো’

নাজমুল ইসলাম ফারুক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৫১, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩  
‘পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানায় বিনিয়োগ বেশি কিন্তু রিটার্ন ভালো’

রাজধানীর অদূরে ধামরাই ডুলিভিটা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে পরিচ্ছন্ন সুউচ্চ ভবন দাঁড়িয়ে আছে। ভবনগুলোর প্রতি ফ্লোরে কাজ করছে কর্মীরা। মূল গেইটের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় ভবন দুটির মাঝে আছে বেশ ফাঁকা জায়গা। তাতে কোথাও টমেটো, কোথাও মরিচ, লেটুস পাতা, ধনিয়াপাতা, লালশাক, পালংশাকসহ নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সবজির চাষ করা হয়েছে। তাছাড়া রয়েছে সবুজ গাছপালা, নার্সারি, চারদিকে নয়ন জুড়ানো সবুজ মাঠ। এতোটাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন যে কোথাও নেই কোনও ধূলিকণা। ভবনের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের খেলা, আর ছাদে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। এমন পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছে কর্মীরা। তাদের চোখে মুখে নেই কোনও ক্লান্তির ছোঁয়া, আছে সদা হাসি-খুশি ও প্রফুল্লতা। পরিবেশবান্ধব লিড প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্নোটেক্স আউটারওয়্যারে সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।

কর্মরত পোশাককর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কর্মীদের কাজে রয়েছে স্বাধীনতা। পণ্যের গুনগত মান বজায় রাখতে প্রতিটি কর্মী আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছে। যদি কোনও কর্মীর কাজে বা ব্যক্তিগত বা শারীরিক সমস্যা হয় তাহলে ডিজিটাল সুইস চাপলে দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার নিকট দ্রুত হাজির হয়। তার সমস্যা শুনেন ও সমাধান করেন। তাতে নেই কোনও বাড়তি ঝামেলা। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে রয়েছে প্রতিযোগিতা। কাজের ক্ষেত্রে একজন কর্মী আরেকজনের চেয়ে প্রতিযোগিতায় ভালো করলে তার জন্য রয়েছে নানা আকর্ষণীয় পুরস্কার। এসব পুরস্কারের জন্য কর্মীরা নিজ আগ্রহে রীতিমত ভালো কাজ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন।  

তারা আরও জানান, পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া কর্মীদের জন্য রয়েছে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ। পিছিয়ে পড়া কর্মীদের সবুজে ঘেরা ‘গ্রিন হাউজ’ এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা দক্ষতা বাড়িয়ে পদোন্নতি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সারা বছর কাজের স্বীকৃত স্বরূপ নানা পুরস্কার ছাড়াও বছরে কোম্পানির মুনাফার অংশ পায় কর্মীরা। প্রতিদিন দুপুরে দেওয়া হয় বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার। খাবারে পুষ্টির পরিমাণ নির্ণয় করতে রয়েছে পুষ্টিবিদের টিম। তাছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রয়েছে আলাদা মেডিক্যাল ইউনিট। সেখানে সার্বক্ষণিক রয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীরা। যেকোনও প্রয়োজনে রয়েছে সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। এছাড়া কর্মীদের নিরাপত্তায় রয়েছে অটোমেটেড ফায়ার প্রটেকশনসহ নানা সুবিধা। শুধু তাই নয়, সবুজায়নের লক্ষে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণের জন্য নার্সারি থেকে কর্মীদের মাঝে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করা হয়। কর্মীদের ছাড়াও আশপাশে মানুষদের মাঝে বছরে নানা রকমের ১ লাখ গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় স্নোটেক্স নার্সারি থেকে।  

মাসুমা আক্তার নামে একজন কর্মী বলেন, আমি এখানে দুই বছর ধরে কাজ করি। নিয়মিত বেতন ভাতা পাই। টিমের মধ্যে যারা ভালো কাজ করি তাদের পুরস্কার দেওয়া হয়। তাতে আমরা অনেক খুশি। তাছাড়া দুপুরে খাবার কারাখানায় খাই, এতে কোন টাকা-পয়সা দিতে হয় না। যেকোনো শারীরিক সমস্যা হলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।  

হাবিবুর রহমান নামের একজন কর্মী বলেন, এই কারখানায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করি। অন্যান্য কারখানার চেয়ে অনেক ভালো। কারখানায় দুপুরে ফ্রি খাবার খাই। একদিন ভাত, ডাল, ডিম, লেবু, শাকসবজি দিলে অন্যদিন মাংস দিয়ে খাবার দেয়। তাছাড়া কাজেও কোনও চাপ নেই, কেউ খারাপ ব্যবহার করে না। কাজে কেউ পিছিয়ে থাকলে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে নেয়া হয়। মনে হয় বাড়িতে বসে কাজ করছি। তাই কাজ করতে ভালো লাগে।  

স্নোটেক্সের কর্ণধার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ। তিনি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, একজন সংগঠক। তিনি শুধু ব্যবসায় মুনাফা নিয়ে চিন্তিত নয়, কীভাবে কর্মীদের ভালো রাখা যায়, ক্রেতাকে ভালো রাখা যায় বিশেষ করে মানুষের কল্যাণে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাজে আসবে সেই স্বপ্নেই তিনি সবসময় বিভোর। আর মানুষের কল্যাণের স্বপ্ন তো তিনি লালন করেছেন ছাত্রজীবন থেকে। মানুষের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্যে ছাত্রজীবন থেকে অরাজনৈতিক সংগঠনের সংগঠক ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সময় নানা কারণে তা নিয়মিত করতে না পারা তাকে এখনো তাড়া করে। আর তাই ব্যবসার পাশাপাশি মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। প্রথমই তিনি ভেবেছেন স্নোটেক্স কোম্পানিতে যারা কাজ করছেন তাদের নিয়ে। এই শিল্প পরিবারের বর্তমানে ১৯ হাজার সদস্য কেউ যেন সমস্যায় না থাকেন। তাদের জন্য অনেক বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেন সবসময়। আর এর অংশ হিসেবে স্নোটেক্স এই বিশাল পরিবারের সব সদস্যদের জন্য পুষ্টির নিশ্চয়তায় দুপুরে বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।  

সুন্দর পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তুলার বিষয়ে স্নোটেক্স আউটারওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ বলেন, পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা করার আগে চেষ্টা করেছি কীভাবে ভালো কারখানা করা যায়। সনদের চেয়ে মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানিকে ভালো করা। তা করতে গিয়ে দেখলাম পরিবেশবান্ধব সবুজ একটা মাধ্যম। সবুজ কারখানা করায় আমাদের বেশি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তাতে ইউটিলিটি ব্যয় কমবে কিন্তু কারখানার সক্ষমতা বাড়বে। পরিবেশবান্ধব কারখানায় বিনিয়োগ বেশি কিন্তু অপারেশন ব্যয় কম।

তিনি বলেন, আমাদের সোলার প্যানেল আছে। এটি ৬ বছরে আমাদের রিটার্ন দেবে আর বাকি ১৬ বছর বিনা খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। পানি আগে যা ব্যবহার করতাম এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কী পরিমাণ দিনের আলো ব্যবহার করা হবে তা পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার নীতিমালায় বলা আছে। আমরা সেগুলো পরিপালন করছি। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা না করলে আমাদের জন্য লস। এক কথা বলা যায়, সবুজ কারখানা করলে ভালো, না করলে লস। সবুজ কারখানা করায় আমরা এখন ভালো ফল পাচ্ছি।

সবুজ কারখানায় ক্রেতাদের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে এসএম খালেদ বলেন, আমরা সব বড় বড় ব্যান্ডেড বায়ারদের সঙ্গে কাজ করি। তারা সবসময় চায় এমন কোম্পানিতে কাজ করবে, যারা পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা ও কমপ্লায়েন্স মানবে। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা করায় পণ্যের মূল্য বেশি পাচ্ছি না, তবে আগের চেয়ে বায়ারদের বেশি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা করার কারণে নিয়মিত অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে, পেমেন্টের নিশ্চয়তা রয়েছে, এছাড়াও অনেক সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

পোশাক শিল্পে আমাদের বড় সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের বিনিয়োগ, বায়ারদের অর্ডারে কোনও সমস্যা নেই। প্রতিনিয়ত জ্ঞান আহরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ। ভিয়েতনামে ভিজিটে গিয়ে দেখলাম তারা কীভাবে উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা কোথায় ভালো করেছে আর আমরা কেন পিছিয়ে পড়েছি বুঝার চেষ্টা করলাম। তাদের মতো আমরা যদি এগিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকে আর তা কাজে লাগিয়ে ভালো কিছু করতে পারবো। এই জ্ঞান আহরণই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চায়না ও ভিয়েতনামের অবস্থা দেখে মনে হয় আমাদের আরও ৫/৭ শতাংশ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ার প্রভাব সম্পর্কে স্নোটেক্স এমডি বলেন, আমাদের ডাইং ও ওয়াশিং কারখানা নাই বলে সরাসরি প্রভাব কম পড়লেও সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে। আমরা ওভেন করছি, তাতে আয়রনের জন্য গ্যাসের দরকার হয়। কিন্তু যাদের কাছ থেকে ফ্রেবিক্স ক্রয় করি, ওয়াশিং করি তাদের খরচ বাড়ছে। তাদের জন্য আমাদেরও সব ধরনের খরচ বেড়েছে। তাই রিভিউ করে দাম আরও কমানো যেতে পারে। সরকারের কাছে এটাই আমাদের অনুরোধ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কর্মীদের কল্যাণ ও পণ্যের গুনগত মান ধরে রাখা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের শিল্প পরিবারের সদস্যদের জন্য ভালো কিছু করাই আমার মূলমন্ত্র। কর্মীদের জন্য আরও ভালো কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে। যা জমির অপ্রতুলতায় থমকে আছে। তবুও অমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি প্রত্যেক সদস্যের জন্য বেনিফিট কীভাবে বাড়ানো যায়। প্রত্যেক সদস্যের জন্য ন্যায্যমূল্যে নানা পণ্য, খেলাধুলা, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা আরামদায়ক সময় কাটাতে পারেন সেজন্য মাস্টারপ্ল্যান করার চেষ্টা করছি। দুই কারখানার ভবনের মাঝের খালি জায়গা ব্যবহার করে ভালো টেকসই কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অপরদিকে, প্রতিদিন যে কাজটি ভুল করছি সেটি সঠিকভাবে করা আমাদের কাজ। কোন পদ্ধতিতে আমরা পণ্যের গুনগত মান ভালো রাখতে পারি সেই জ্ঞান আহরণ করতে হচ্ছে। আমাদের পণ্য ও কাজের জন্য যাতে বায়ারদের কোনও ক্ষতি না হয়, এছাড়া কমপ্লায়েন্স পরিপালন করে সাশ্রয়ী মূল্যে বায়ারদের অর্ডার নিশ্চিত করতে পারি সেজন্য কাজ করছি। বায়ারদের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য দিতে পারলে নিয়মিত অর্ডার পাওয়া যাবে, কারখানার উৎপাদন বাড়বে। নিয়মিত উৎপাদন বাড়লে রিটার্ন আসবে, সবাই ভালো থাকবে।  

নতুন বিনিয়োগে কোনও প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিনিয়োগের আমাদের কোনও সমস্যা নেই। ব্যাংক, বায়ারদের সঙ্গে রয়েছে সুসম্পর্ক। যেকোনো বিনিয়োগ আমরা করতে পারি। বিনিয়োগ করা গেলে একটা পর্যায়ে ভালো রিটার্ন আসে। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা করতে বিনিয়োগ বেশি লাগে কিন্তু রিটার্ন ভালো পাওয়া যায়।

স্নোটেক্স বিশ্বের ৫৩টি দেশে পোশাক রপ্তানি করছে। তবে সরাসরি রপ্তানি করছে আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, জাপানের বাজারে। নতুনভাবে জাপান ও দুবাই বাজারে ক্রেতাদের সন্ধান করছে প্রতিষ্ঠানটি। ধামরাই ডুলিভিটায় বর্তমানে ৭৫ বিঘা জমিতে অবস্থিত স্নোটেক্স। প্রতিষ্ঠানটি তৈরি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘সারা লাইফস্টাইল’ নামে ব্র্যান্ড। দেশীয় এই ব্যান্ডটিও সাশ্রয়ী মূল্যে ক্রেতাদের নাগালে পৌঁছে দিচ্ছে পণ্য, ফলে ক্রেতাদের কাছে ব্যান্ডটি বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

ঢাকা/এনএইচ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়