ঢাকা     সোমবার   ২৭ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪৩১

হার না মানা নারী উদ্যোক্তা নাতাশা

মেহেদী হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:০৫, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ২০:০৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
হার না মানা নারী উদ্যোক্তা নাতাশা

‘পথ শেষ মানে থেমে যাওয়া নয়, বরং নতুন পথের সৃষ্টি’- কথাটির বাস্তবে রূপ দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তা নাশরা হক নাতাশা। ‘দেশজ গহনা’ ও ‘নব পরিধেয়’ নামে দুইটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি। তিনি বর্তমানে হাতে তৈরি গহনা নিয়েই বেশি কাজ করছেন।

নাতাশা পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলেন। কৃতিত্বের সঙ্গে ভালো রেজাল্ট নিয়ে স্কুল, কলেজ পর্ব শেষ করেন তিনি। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির পর রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে তার বিয়ে হয়ে যায়।

ছোটো থেকেই তার ইচ্ছে ছিল শিক্ষক হওয়ার। বিয়ে হওয়ায় একরকম ধাক্কাই খেলেন তিনি। তবে পড়াশোনার প্রতি তার ছিল অদম্য ইচ্ছে। শ্বশুর বাড়ি থেকে নানা প্রতিবন্ধকতা ও ছোট বাচ্চাকে সামলিয়ে তিনি চালিয়ে গেছেন লেখাপড়া। এভাবেই ২০১৬ সালে প্রথম স্থান অধিকার করে মাস্টার্স শেষ করেন নাতাশা।

লেখাপড়া শেষ করে ব্যাংক-বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ব্যর্থ হন নাতাশা। প্রচণ্ড হতাশা ঘিরে ধরে তাকে। ২০২০ সালে করোনা কালে হতাশাগ্রস্ত নাতাশার জীবনে আলোর রেখা নিয়ে আসে ফেইসবুকভিত্তিক অনলাইন প্লাটফর্ম উই ও ডিজিটাল স্কিল ফর বাংলাদেশ গ্রুপ। সেখান থেকে তিনি দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার কৌশল রপ্ত করেন। সেখানে ই-ক্যাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজিব আহমেদের দিক-নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করতেন। এভাবেই আস্তে আস্তে হয়ে ওঠেছেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।

ছোটো থেকেই হাতের কাজ বা ক্রাফটিং করতে খুব পছন্দ করতেন নাশরা। সুই-সুতার কাজসহ নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস নিজেই তৈরি করতেন তিনি। সে অভিজ্ঞতা তাকে বেশ কাজে দিয়েছে। দেশি পোশাকের পাশাপাশি হাতে তৈরি গহনা নিয়ে কাজ করে অনলাইনে বেশ সাড়া পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে অনলাইনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে তিনি নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রথমে কুর্তি, পাঞ্জাবি, টিশার্ট শাড়ি নিয়ে কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে ভালোই বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু করনার সময় থেকে সেটা কমতে শুরু করে। তারপর মাঝে কাজ কিছুদিন স্থগিত থাকে। করোনায় সময় উই’তে প্রথম জয়েন করি। সেখানে দেশি পণ্যের উদ্যোক্তাদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হই। আমার পণ্য নিয়ে অনেক পোস্ট করি, সেখানে কিছু সেলও হয়। বর্তমানে গহনার ক্রেতাই বেশি।

২০২২ সালে স্বামী স্ট্রোক করলে বড় ধাক্কা খান নাতাশা। স্বামীর অসুস্থতার কারণে পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার কাঁধে চলে আসে। প্রথম দিকে এ উদ্যোক্তা হতে গিয়ে স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির মানুষদের কাছ থেকে ভালোই বাঁধা আসে। তারা নাতাশার চাকরি করাকে পছন্দ করলেও উদ্যোক্তা হিসেবে মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। এজন্য সবার আড়ালেই নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তিনি নিরবে সততার সঙ্গে কাজ করে গেছেন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কটু কথা তাকে দমাতে পারেনি।

তার স্বামী বি এফ শাহীন কলেজের অধ্যাপক মাহবুব আলম। অধ্যাপক মাহবুব অসুস্থ হওয়ার পর তার এই চেষ্টাই আশীর্বাদ হয়ে আসে। সংসারের হাল ধরতে অসুস্থ স্বামী নিজেই বলেন, কিছু একটা করতে। এরপর থেকে অসুস্থ স্বামী এবং দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার সামলানোর পাশাপাশি যতটুকু সময় পান, তার সবটুকু দিয়ে এগিয়ে নিতে থাকেন তার স্বপ্ন। বর্তমানে ফেসবুক গ্রুপ, পেইজ ও প্রোফাইল থেকে তার প্রচুর অর্ডার আসে। এখন পরিবারের সবাই কমবেশি সাপোর্ট করছেন। তিনি এখন যে কোনো কাজ অনায়াসে করে যেতে পারছেন, যা এক সময় অকল্পনীয় ছিল।

নাতাশা বলেন, অনলাইনের বিজনেসের ক্ষেত্রে অনেকের একটি ভুল ধারণা দেখা যায়। সবাই মনে করে, অনলাইনে পণ্য কিনলে ঠকতে হয়, আর দামও বেশি রাখে। দীর্ঘদিন ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করে গেছি। এখন আমার ক্রেতারা এ ধরনের ধারণা থেকে বের হয়ে এসেছেন। ক্রেতাদের বেশিরভাগই একবার পণ্য নিয়ে পুনরায় অর্ডার করছেন।

প্রথমে কুর্তি, পাঞ্জাবি, টিশার্ট শাড়ি নিয়ে কাজ শুরু করলেও তার মুল ফোকাস গহনা আর চুড়িতে। তিনি বলেন, ক্রেতারা এখন আমার হাতে তৈরি গহনাকে বেশি পছন্দ করছেন। তাদের পছন্দ মতো কাস্টমাইজ গহনা করে নিচ্ছেন। এছাড়া শীতের সময় শালও অনেক বিক্রি করেছি। শাড়ির ক্রেতাও আছে অনেক। বর্তমানে মণিপুরী শাড়ি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। লাভ-লোকসান মিলিয়ে ব্যবসা ভালোই চলছে।

আগামীতে দেশি পণ্য আরও নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান নাতাশা। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো আমার গহনা বিদেশে গেছে। ওই ক্রেতা আবারও নিবেন বলেও জানিয়েছেন। আমি আশাবাদী ই-কমার্স সেক্টরের মাধ্যমে অনেক বড় পর্যায়ে পৌঁছোতে পারবো। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আমার গহনা বিদেশে যাবে এবং এক্সিবিশন হবে, এটা আমার বিশ্বাস।

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়