ঢাকা     বুধবার   ২৯ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪৩১

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সফল আইভি

মেহেদী হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৮, ১৮ এপ্রিল ২০২৪  
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সফল আইভি

আইভি আফতাব। স্নাতকে পড়া অবস্থায় ২০১০ সালে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ড্রইং শিক্ষিকা হিসেবে যুক্ত হন। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইন্সটিটিউটের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগ থেকে স্নাতক ও  ২০১৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা) থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। স্নাতকোত্তর শেষ করার পরই তার বিয়ে হয়ে যায় এবং শুরু হয় সংসার জীবন।

শিক্ষকতা ও সংসার জীবন সমানতালে খুব একটা ভালো চলছিল না। চাকরিই একমাত্র লক্ষ্য হওয়ার পরও সাংসারিক চাপে তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এরই মাঝে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের মা হয়ে যান তিনি। এজন্য পরে আর চাকরিতে ফেরা হয়নি। টিউশন যা ছিল, সেগুলো বাড়ির বাহিরে হওয়ায় তাও বন্ধ হয়ে যায়। মোটকথা ড্রইং এর জগৎ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গিয়ে শুধু সংসার সামলাচ্ছিলেন তিনি।

আইভি আফতাবকে নিয়ে এতো কথা বলার কারণ হলো- তিনি এখন সংসার সামলানোর পাশাপাশি হয়ে উঠেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা। তবে শিক্ষকতার চাকরি ছাড়ার পর থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু সংসারই সামলিয়েছেন। ওই সময়ে বেশ হতাশা কাজ করছিল আইভির। এরই মধ্যে ই-ক্যাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজিব আহমেদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় তার।

তিনি বলেন, খুব হতাশায় ছিলাম। এক পর্যায়ে আমার ছোটবোনের মাধ্যমে খোঁজ পাই শ্রদ্ধেয় রাজিব আহমেদ স্যারের। যেহেতু বাহিরে গিয়ে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না, তাই চিন্তা করছিলাম বাসায় বসে আমার পড়াশোনা রিলেটেড কিছু করা যায় কিনা। এ নিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা বলি এবং তার পরামর্শে হ্যান্ড পেইন্ট নিয়ে কাজ শুরু করি। এভাবেই আমার উদ্যোক্তা হিসেবে পথ চলা শুরু হয়।

এরই মধ্যে আইভি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘দেশি পোশাক’ নামে একটি পেজ খোলেন। তার পড়াশোনা ও কাজের বিষয় একই হওয়াই তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। তারপরও নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনলাইনে কোর্স করেন। তার প্রথম কাজের অর্ডার আসে ২০২১ সালে।

তিনি বলেন, আমি যেহেতু গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী, তাই হ্যান্ড পেইন্ট-এ ডিজাইন মোটিফে কাজ করতে পছন্দ করি। ২০২১ সালে আমার ছোট বোনের পরিচিত এক আপু হ্যান্ড পেইন্টের কাজ সম্পর্কে জানতে পারে। তারপর তিনি তার খাদি শাড়িতে হ্যান্ড পেইন্ট করিয়ে নেন। মূলত এটাই আমার প্রথম কাজ। বলা যায়, আমার অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তা জীবন শুরু হয়।

তবে শুরুতে হ্যান্ড পেইন্ট করার জন্য কোনো ধরনের ফ্রেম বা রং ছিল না। আবার সংসার সামলিয়ে এগুলো পরিচালনা করা অনেক কষ্টকর ছিল। সবমিলিয়ে শুরুতে অনেক কষ্ট হয়েছিল তার।

এ নারী উদ্যোক্তা বলেন, সারাদিন সংসার সামলিয়ে কোনোভাবেই আমি আমার উদ্যোগের কাজ করতে পারতাম না। কাজের ফাঁকে যতটুকু সময় পেতাম, তার মধ্যেই নিজের কাজ করতাম। কিন্তু সেটা ছিল খুবই অল্প সময়। কিন্তু এখন আমরা যৌথভাবে থাকি না, আলাদা হয়েছি। এজন্য আমার কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেকটা সহজ হয়েছে, পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছি। ইচ্ছেমতো ছুটতে পারছি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে।

প্রথম দিকে অনলাইনে তেমন পরিচিতি না থাকায় তেমন অর্ডার আসতো না উদ্যোক্তা আইভির। সবকিছু একরকম বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, আসলে অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তাদের কাজ যতই ভালো হোক, ব্যক্তিগত পরিচিতি না থাকলে অর্ডার আসে না বললেই চলে। এছাড়া আমি যদি আমার পণ্য নিয়ে লিখতে না পারি, পণ্যকে ফোকাস না করি তাহলে কে অর্ডার দিবে? ফলে মাঝপথে আমার কাজ কিছুদিন বন্ধ রেখে রাজিব আহমেদ স্যারের পরামর্শে আরিফা মডেল অনুসরণ করা শুরু করি।

আরিফা মডেলের মাধ্যমে বেশ উপকৃত হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আরিফা মডেল আমার পরিচিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সাহায্য করে। এখন আলহামদুলিল্লাহ আমার অর্ডার ভালোই হয়। কোনো কোনো মাসে ছয়টা পর্যন্ত অর্ডার আসে।

হ্যান্ড পেইন্টিং হওয়ায় সম্পূর্ণ কাজ আইভি নিজেই সম্পন্ন করে থাকেন। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ কাজ আমিই করি। ডিজাইন থেকে ‍শুরু করে সবকিছু আমাকেই করতে হয়। তবে কাস্টমাররা তার পছন্দ অনুযায়ী বিষয় বলে দেন। আমি নিজের ইচ্ছেমতো সে বিষয় অনুপাতে ডিজিইন কাস্টমাইজ করে দেই। মূলত আমার কাজগুলো থিম বেইজ হয়ে থাকে। সবমিলিয়ে ভালোই আয় হয়।

তবে এই উদ্যোক্তার কোনো মূলধন নেই। কখনো ঋণের জন্য আবেদনও করেননি। আইভি বলেন, আমার মূলধন নেই বললেই চলে। এতোদিন কাস্টমারের দেওয়া বিভিন্ন পণ্যে ডিজাইন করে দিয়েছি। তবে ইদানিং আমি পাইকারী দরে অল্প অল্প করে শাড়ি, কামিজের কাপড়, ব্লাউজের কাপড়, শাল ইত্যাদি কিনে সেগুলো ডিজাইন করে বিক্রি করছি। এটা করলে অবশ্য তুলনামুলক লাভও বেশি হয় এবং মানও ভালো থাকে।

একটা ডিজাইন চিন্তা করতে তিনি কমপক্ষে একদিন সময় নেন। তারপর সেটা ড্রইং করে কাস্টমারকে দেখান। কাস্টমারের পছন্দ হলে সে অনুযায়ি কাজ করতে তার প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। তিনি বলেন, আমার কাজ ডিজাইন মোটিফ নিয়ে হওয়ার কারণে একটু সময় লাগে। কিন্তু আমার পড়াশোনা ডিজাইন নিয়েই। তাই এ কাজটি করতে আমি খুব ভালোবাসি।

তিনি আরও বলেন, ওয়াশ পেইন্টিং এর মাধ্যমে একদিনে দুটি শাড়ির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু আমি সেটা করি না। এক সপ্তাহে একটা শাড়ির কাজ করি। আমি আমার প্রতিটি কাজের মধ্যে সমস্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা সবকিছু উজাড় করে দেই।

তবে তার কাজ সময় সাপেক্ষ হলেও সে অনুপাতে মজুরি নেন না। কারণ তিনি সবকিছু কাস্টমারের সাধ্যের মধ্যে রাখতে চান। আর তিনি একাই সবকিছু করার কারণে অল্প টাকা নিয়ে কাজগুলো সম্পন্ন করে দিতে পারেন।

আইভির স্বামী একজন কম্পিউটার হার্ডওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। তিনি এ কাজে আইভিকে খুবই সহযোগিতা করেন। আইভি বলেন, ও (স্বামী) আমাকে খুব সমর্থন করে। কাজের জন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে সেখানে নিয়ে যায়, কোনোকিছু প্রয়োজন হলে এনে দেয়। এক কথায়, আমার কাজে অনেক সহযোগিতা করে।

যারা উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে এ নারী উদ্যোক্তা বলেন, অনলাইনে কাজ করতে হলে সবারই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। তাই প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে অনলাইন-অফলাইন যেভাবেই হোক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এতে তাদের কাজে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভবিষ্যতে কল্যাণ বয়ে আনবে।

তিনি মনে করেন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য ফেসবুক একটি সেরা মাধ্যমে। কারণ এর মাধ্যমে সহজেই যেকোনো পণ্যের প্রচার ও প্রসার করা যায়। ফেসবুক পেজ ‘দেশি পোশাক’-এর মাধ্যমে তার সব পণ্য একদিন সবার কাছে পৌঁছে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়