ঢাকা     শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

স্মৃতিকথা লেখার দায় লেখকের নিজস্ব: ইসহাক খান

স্বরলিপি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩২, ২৯ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৩:৫০, ২৯ জানুয়ারি ২০২৪
স্মৃতিকথা লেখার দায় লেখকের নিজস্ব: ইসহাক খান

কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান। ২০২৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার লেখার মূল উপজীব্য নিজস্ব বয়ানে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী নানা বিষয়। সম্প্রতি লেখালেখির নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাতকার গ্রহণে স্বরলিপি।

স্বরলিপি: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩ এর জন্য মনোনীত হওয়ার জন্য আপনাকে অভিনন্দন। পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাই।

ইসহাক খান: ধন্যবাদ। আমার প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালী ফোন করে জানালেন, আপনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথমে বিশ্বাস করিনি। পরে তিনি আমাকে একাডেমির বিজ্ঞপ্তিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনবক্সে পাঠিয়ে দেন। আমি তখন নিশ্চিত হই। যা ছিল আমার অপ্রত্যাশিত। স্বাভাবিক ভাবে আমার মধ্যে আনন্দের নিরব স্রোত বয়ে যায়। উল্লেখ্য , যেকোন পুরস্কারই আনন্দ ও প্রেরণাদায়ী। সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার একজন লেখকের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আমার দায়িত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি আরও নিবেদিত হবো সাহিত্য চর্চায়। রাষ্ট্র আমাকে সম্মানিত করেছে আমারও দায় আছে রাষ্ট্রের প্রতি।

স্বরলিপি: আপনার লেখায় স্মৃতিকথা প্রধান হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হচ্ছে স্মৃতিকথা রচনায় লেখকের দায় কার প্রতি বলে মনে করেন?

ইসহাক খান: স্মৃতিকথা লেখার দায় লেখকের নিজস্ব। যেমন ধরুন, আমি কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছি- তারা আমার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় জানার পর আমাকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বলতে অনুরোধ করতেন। এইভাবে আর কত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বলবো। এক সময় সিদ্ধান্ত নেই ছাপার অক্ষরে স্মৃতিগুলো ধরে রাখা  নতুন প্রজন্মের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। তারপর নিজের দায়িত্ববোধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি লিখে ফেলি।

স্বরলিপি: আপনার লেখা ‘তালিকায় নাম নেই’ এই গ্রন্থের প্রেক্ষাপট এবং নামকরণের গল্প জানতে চাই।

ইসহাক খান: 'তালিকায় নাম নেই' এই গল্পটি মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের প্রকল্প গ্রহণ করে। আমাকে তখন অনেকেই তালিকায় আম তোলার জন্য দরখাস্ত করতে বলে। তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি,। এখন দরখাস্ত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার ইচ্ছে নেই। তবু আমার গৃহবন্ধু নাছোড় বান্দা। দরখাস্ত দিতেই হবে। তখন আমার গল্পের নায়ক বলে, সয়দাবাদ যুদ্ধে সারাদিন যুদ্ধ করার পর যখন সবায় ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিল তখন একজন অচেনা কিশোর আমাদের জন্য রুটি আর গুড় নিয়ে এসে আমাদের জীবন বাঁচিয়ে ছিল। সেই কিশোরের নাম কী ওই তালিকায় আছে? প্রশ্নকর্তারা জবাবে বলেছে, তার নাম কেন থাকবে? সে কী যুদ্ধ করেছে? আমার নায়কের জবাব ছিল, যে আমাদের জীবন বাঁচালো তার নাম যদি ওই তালিকায় না থাকে তাহলে আমারও নাম থাকার দরকার নেই। এই প্রেক্ষাপটে লেখা গল্পটি। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অনেক অমুক্তিযোদ্ধার নাম আছে আবার অনেক প্রকৃত মুক্তিযদ্ধার নাম নেই।  যে কারণে গল্পের নাম 'তালিকায় নাম নেই।' যদিও আমার নামটি তালিকায় আছে। ভারত থেকে ৭৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা উদ্ধার করতে পেরেছে সরকার। সেই তালিকায় আমার নাম আছে।

স্বরলিপি: আপনিতো মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস সমগ্র লিখেছেন। কিশোরদের জন্য লিখতে ইতিহাস এবং ভাষা প্রবণতা উপস্থাপন কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

ইসহাক খান: কিশোর উপন্যাস লেখাটা আমার চেতনার দায় থেকে লেখা। ২০১৭ সালে কিশোর উপন্যাস 'বিচ্ছু গেরিলা' প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া ফেলে গ্রন্থটি। বইমেলায় একজন কিশোর এসে আমাকে বলে, আপনার লেখা পড়ে আমি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। ওই কিশোরের এই উক্তি আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করে। সেই থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি প্রতিবছর আমি অন্তত একটি মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস লিখবো। এটা আমার অঙ্গিকার। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতেই আমার এই উদ্যোগ। কিশোরদের জন্য লেখা সবচেয়ে কঠিন। লেখককেও কিশোর হতে হয়। একজন কিশোরের মন মানসিকতা নিজের মধ্যে ধারণ করে তার বোধগম্য করে লিখতে হয়। সেটা সবাই পারে না। কিশোরদের উপযোগী ভাষা ও বিষয় উপস্থাপন অত্যন্ত জটিল কাজ। তার জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। শিশুতোষ লেখার জন্য শিশু উপযোগী মন ও মানসিকতার দরকার। সেই মানসিকতার তৈরি খুবই শক্ত কাজ। আমি নিজেও বিষয়টি পুরোপুরি আয়ত্ব করতে পারিনি। চেষ্টা করে যাচ্ছি অবিরাম।

স্বরলিপি: লেখক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য কেমন সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশ পেয়েছেন?

ইসহাক খান: আমার পরিবারে আমিই প্রথম সাহিত্যের এই কঠিন পথে নেমেছি। আমার বাড়িতে বই পড়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না। ঘুম থেকে উঠে দেখেছি লাঙ্গল এবং জোয়াল। বাবা ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী কিন্তু তিনি আমাকে কখনও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দেন নি। যখন লেখালিখি শুরু করি দেখেছি বাবা লোকজনকে বলতেন, আমার ছেলে লেখক। ধর্মীয় গোঁড়া আমার পরিবার। এক চাচা আমাকে লিখতে নিষেধ করে বলতেন, এসব হাবিজাবি কেন লিখিস। এই লেখার কারণে তোর দাদা-দাদীর কবরে আজাব হবে। উনি আমার লেখা নিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে চাইতেন। তার ভয়ে আমি লেখা লুকিয়ে রাখতাম। বলতে গেলে লেখক হিসেবে গড়ে ওঠার সহায়ক কোন পরিবেশ পাইনি।

/লিপি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়