Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০৪ আগস্ট ২০২১ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৮ ||  ২৩ জিলহজ ১৪৪২

অসহায়দের মধ্যে কোরবানির গোশত বণ্টনের নিয়ম

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:১১, ২১ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৭:০৭, ২১ জুলাই ২০২১
অসহায়দের মধ্যে কোরবানির গোশত বণ্টনের নিয়ম

আজ পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ঈদের নামাজের পর মহান আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করবে সামর্থ্যবান মুসলমানরা। তাদের ঘরে-বাইরে ছড়িয়ে পড়বে ঈদের আনন্দ। এটা অবশ্যই সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ, অনেক মুসলমান ঈদের জামাতে শরিক হতে পারলেও কোরবানিতে শরিক হতে পারবে না। এই সামর্থ্য তাদের নেই। তারা দীনহীন অসহায়। এজন্য ইসলাম ধনীদের কোরবানির গোশত বণ্টনের একটা ঐচ্ছিক বিধান দিয়েছে। এই বিধান মানলে গরিব অসহায় মানুষেরা কোরবানি না দিয়েও গোশতের অংশ পাবে। ভাগাভাগি করে নিতে পারবে ঈদের পবিত্র আনন্দ।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘এরপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও’ (সুরা হজ : আয়াত ২৮)। ‘তোমরা খাও এবং খাওয়াও যেসব অভাবগ্রস্ত চায় এবং যেসব অভাবগ্রস্ত চায় না- তাদেরকে। এমনভাবে আমি এগুলোকে [প্রাণীসমূহকে] তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৬)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করো।’ (বুখারি, হাদিস ৫৫৬৯; মুসলিম, হাদিস ১৯৭১)

বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কোরবানির গোশত তিনভাগ করে একভাগ নিজেরা খেতেন, একভাগ যাকে চাইতেন তাকে খাওয়াতেন এবং একভাগ ফকির-মিসকিনকে দিতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোরবানির গোশত বণ্টন সম্পর্কে বলেন, তিনি একভাগ নিজের পরিবারকে খাওয়াতেন, একভাগ গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন এবং একভাগ ভিক্ষুক-ফকিরদের দিতেন। (মির‘আত হাদিস ১৪৯৩-এর ব্যাখ্যা, ৫/১২০ পৃষ্ঠা)

কুরআন ও হাদিস গবেষণা করে মাজহাবের ইমাম এবং ইসলামি আইনবেত্তা ফকিহরা বলেছেন, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনকে, এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে এবং এক তৃতীয়াংশ নিজের জন্য রাখা উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। আবার সামান্য কিছু নিজের জন্য রেখে পুরোটা দান করে দিলেও কোনো অসুবিধা নেই। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, ফতোয়া আলমগীরি ৫/৩০০)। তাঁরা কোরবানির গোশত তিনভাগ করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। (সুবুলুস সালাম শরহে বুলুগুল মারাম ৪/১৮৮ পৃষ্ঠা)

কোরবানির গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয। (ইলাউস সুনান ৭/২৮৩, ফতোয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০) সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ইহুদি প্রতিবেশীকে দিয়ে গোশত বণ্টন শুরু করেছিলেন। (বুখারি, আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ১২৮)

কোরবানির পশুর এক টুকরো গোশত কাউকে না দিয়ে সবটা নিজে ভোগ করলেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে- এটা ঠিক, কিন্তু মানবতা কী বলে? একজন মুমিন কোরবানিদাতা হিসেবে উত্তমটাই তো বেছে নেওয়া উচিত। একজন বিবেকবান কোরবানিদাতা সেটাই তো করবেন- তাই নয় কী? আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগে যত নবী-রাসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন, তাদের কারো উম্মতই কোরবানির গোশত খেতে পারতেন না। তাদের কোরবানি আকাশ থেকে আগুন এসে জ্বালিয়ে ফেলত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে আমাদের কোরবানির গোশত নিজেরা ভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছেন, ওই কৃতজ্ঞতায়ও কিছু অংশ দান করা উচিত।

তাছাড়া দান করার সুযোগ সবসময় আসে না। নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে দানের আয়োজন করা সুকঠিন। এখন যেহেতু একদিকে আমরা কোরবানি দিচ্ছি, অপরদিকে দেড় বছরের বৈশ্বিক করোনায় এক শ্রেণীর মানুষ অসহায় বিপর্যস্ত, তাই গরিব অসহায় মানুষদের হাতে কোরবানির গোশত তুলে দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব। তাছাড়া দানের মাধ্যমে মানুষের বালা-মসিবত দূর হয়। তবে ওই দানটা হতে হবে সাধ্যানুসারে তৃপ্তিদায়ক। অসহায় মানুষের মেলে ধরা পাত্রে পড়তে হবে বলার মতো গোশতের টুকরোÑ যা দেখে ছুঁয়ে যাবে অসহায় মানুষের হৃদয় হয়ে আল্লাহর আরশে আজিম পর্যন্ত। আর তাদের থালায় যদি আমাদের দেওয়া এক-দুই টুকরো হাড্ডি আঘাত করে, ওই আঘাত অসহায়দের হৃদয় হয়ে গিয়ে লাগবে আল্লাহর আরশে আজিমেও। তাই দানের সময় এই বিষয়টি আমাদের মাথায় খুব বেশি রাখতে হবে।

ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো, বিপদ মুক্তির জন্য সাহায্য করা ইসলামের শিক্ষা। তাদের দুর্দিনে আর্থিক সহায়তা, খাবার-দাবার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং চিকিৎসাসেবায় এগিয়ে আসা ঈমানের দাবি। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো অসহায়-দুর্গত মানুষদের সাহায্য করাও ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা পুরো মুমিনজাতিকে একটি দেহের মতো বানিয়েছেন। দেহের কোনো অংশ আক্রান্ত হওয়া মানে পুরো দেহ আক্রান্ত হওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিনদের উদাহরণ তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দিক থেকে একটি মানবদেহের মতো; যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার পুরো দেহ ডেকে আনে তাপ ও অনিদ্রা।’ (মুসলিম : হাদিস ৬৪৮০)

এজন্য যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের প্রতি অসহায়-দুর্গত মানুষদের সাহায্য করতে পবিত্র কুরআনে নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! আমি তোমাদের যে জীবনের উপকরণ দিয়েছি, তা থেকে তোমরা ব্যয় করো সেদিন আসার পূর্বেই যেদিন কোনো বেচাকেনা, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২৫৪)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীকে দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদেরকে দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ : হাদিস ৪৯৪১)

তবে এই ব্যয়, দান ও দয়া হতে হবে নিঃস্বার্থভাবে, অভাবী ও বিপন্ন মানুষের কাছ থেকে কোনোরকম প্রতিদানের আশা ছাড়া, কেবল আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। যেমন আল্লাহ তায়ালা সেদিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। তারা বলে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের খাবার দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা দাহর : আয়াত ৮-৯)।

হজরত আবু হুরায়রা ও হজরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যখন অন্য মুসলমানের উপকারের জন্য অগ্রসর হয় এবং উপকারটি সম্পন্ন করে, তখন তার মাথার ওপর ৭৫ হাজার ফেরেশতা ছায়া সৃষ্টি করে দেন। এই ফেরেশতারা তার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করতে থাকেন। উপকারটা সকালে করা হলে বিকাল পর্যন্ত দোয়া চলতে থাকে, আর বিকালে করা হলে সকাল পর্যন্ত দোয়া চলতে থাকে। আর ওই ব্যক্তির প্রত্যেক কদমে একটি করে গোনাহ মাফ হয় এবং একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। (ইবনে হিব্বান মুনজিরি : হাদিস ৩৮৬৮)। তাছাড়া আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত মুসলিম শরিফের ২৫৬৯ নম্বর হাদিসে এসেছে, অসহায় মানুষকে খাওয়ালে পরালে সেবা করলে তা আল্লাহ তায়ালা পেয়ে থাকেন।

মানবতার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সবসময় অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, তাদের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন আল্লাহর রাসুলের এই আদর্শ লালন ও পালন করেছেন। আসুন আমরাও পালন করে দুনিয়া ও আখেরাতে অফুরন্ত কল্যাণ লাভ করি। আমাদের কোরবানির গোশত তুলে দিই অসহায় মানুষের পাতে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়