Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৪ ১৪২৮ ||  ০৯ সফর ১৪৪৩

কোরবানি আমাদের যে শিক্ষা দেয়

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৬, ২০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৯, ২০ জুলাই ২০২১
কোরবানি আমাদের যে শিক্ষা দেয়

কোরবানি ইবাদত হিসেবে যদিও আদম (আ.)-এর যুগ থেকে হয়ে আসছে কিন্তু পরবর্তীকালে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর এক ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে শুরু হয়েছে। আমরা হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মিল্লাতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি। এই মিল্লাতের প্রতিষ্ঠাতা ও মুসলিম মিল্লাতের পিতা হচ্ছেন হযরত ইবরাহিম (আ.)।

আল্লাহ তায়ালার দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহান নবী হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন ধরনের কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষা করেছেন। তিনি প্রত্যেকটি পরীক্ষায় পূর্ণ সফল প্রমাণিত হয়েছেন। পরীক্ষাগুলোর কঠিন ধাপ পেরিয়ে আসার পর হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়, যা বিগত পরীক্ষাগুলোর চেয়েও বেশি কঠিন, হৃদয় বিদারক ও আল্লাহপ্রেমের কঠিন পরীক্ষা। স্বপ্নে তিনি একমাত্র প্রিয় ছেলে ইসমাইলকে কোরবানি করতে আদিষ্ট হন। প্রাণপ্রিয় ছেলেকে কোরবানি করার নির্দেশ তাঁকে এমন সময় দেওয়া হয়েছিল, যখন অনেক দোয়া কামনা করে পাওয়া সন্তানকে লালন-পালন করার পর ছেলে বাবার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারে এবং তাঁকে সাহায্য করার যোগ্য হয়েছে। তাফসিরে রুহুল বয়ানে আছে, তখন ইসমাঈল (আ.)-এর বয়স হয়েছিল ৯ বছর।

নবী-রাসুলদের স্বপ্ন ওহি বা আল্লাহর প্রত্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই স্বপ্নের অর্থ ছিল, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি একমাত্র ছেলেকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আ.) মহান প্রতিপালকের নির্দেশ দ্রুত পালনের জন্য সব প্রস্তুতি নিলেন। তিনি তার ছেলে ইসমাইলকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে প্রাণপ্রিয় ছেলে আমার! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবাই করছি। সুতরাং তুমি চিন্তাভাবনা করে দেখো এবং এই স্বপ্নের ব্যাপারে তোমার অভিমত কী বলো।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০২)।

হযরত ইসমাইল (আ.) ভবিষ্যৎ-নবী। তাই তৎক্ষণাৎ জবাবে বললেন, ‘হে আমার আব্বাজি! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ (সুরা সাফ্ফাত : আয়াত ১০২)।

পরামর্শ শেষে বাবা ও ছেলে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে কোরবানির নির্দেশ পালনের জন্য তৈরি হন এবং এই কাজ সমাধার জন্য তারা শয়তানের বাধা উপেক্ষা করে মিনা প্রান্তরে গমন করেন। এরপর তিনি ছেলেকে আদর করে চুম্বন করলেন এবং অশ্রুসজল নয়নে তাকে বেঁধে নিলেন। এরপর তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার যে, বারবার ছুরি চালানোর পরও গলা কাটছে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা নিজের কুদরতে পিতলের একটা টুকরা মাঝখানে অন্তরায় করে দিয়েছিলেন। তখন ছেলে নিজেই আবদার করে বললেন, আব্বাজি! আমাকে উপুড় করে শুইয়ে নিন। কারণ, আমার মুখমণ্ডল দেখে আপনার মধ্যে পিতৃস্নেহ উথলে উঠেছে। ফলে গলা কাটা যাচ্ছে না। এ ছাড়া ছুরি দেখে আমি ঘাবড়ে যাই।

তখন হযরত ইবরাহিম (আ.) তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন এবং আবার সজোরে ছুরি চালালেন। কিন্তু তখনও গলা কাটলো না। ইবরাহিম (আ.) চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। ইবরাহিম (আ.)-এর এই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা দেখে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত ইসমাইল জবাই হওয়া ছাড়াই তাঁর কোরবানি কবুল করে নিলেন। এ ব্যাপারে ইবরাহিম (আ.)-এর উপর ওহি নাজিল হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশেষে যখন বাবা-ছেলে দুজন আল্লাহর কাছে নিজেদের সঁপে দিলো এবং ইবরাহিম (আ.) ছেলেকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন (জবাই করার জন্য), তখন আমি তাকে সম্বোধন করে বললাম, হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি সৎকর্মশীলদের এমন প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্তুত এ এক সুস্পষ্ট কঠিন পরীক্ষা। আর আমি বিরাট কোরবানি ফিদিয়াস্বরূপ দিয়ে তাকে (ইসমাইলকে) উদ্ধার করেছি।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০২-১০৭)।

এরপর আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন, এখন ছেলেকে ছেড়ে দিন এবং আপনার পাশে যে দুম্বাটি দাঁড়িয়ে আছে, ছেলের পরিবর্তে সেটা জবাই করুন। তখন ইবরাহিম (আ.) পার্শ্ব ফিরে দেখেন, একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা দাঁড়ানো আছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তিনি সেই দুম্বাটি জবাই করলেন।

হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর এই কোরবানিতে আল্লাহ তায়ালা এতই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তিনি পরবর্তী সব উম্মতের মধ্যে তা অবিস্মরণীয় হিসেবে বিরাজমান রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন। সে জন্য ইসলামে এক মহান ইবাদত ও প্রতীক হিসেবে তা আজও পালিত হয়ে আসছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত পালিত হতে থাকবে। তাই মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি ভবিষ্যতের উম্মতের মধ্যে ইবরাহিমের এ আদর্শ স্মরণীয় করে রাখলাম।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০৮)

প্রতি বছর ঈদুল আজহা ও কোরবানি এসে আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে যায়, আমরা তা সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে পারলে সারাটি বছর ইসলামের ওপর অটল-অবিচল থাকা সহজ হবে। এই কোরবানির উদ্দেশ্য নিছক পশু জবেহ আর গোশত খাওয়া নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয়তম বস্তুকে আল্লাহর পথে সমর্পণ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের কোরবানির পশুর সাইজ দেখেন না, তিনি দেখেন আমাদের মনের তাকওয়া ও ঈমানের সাইজ। আমরা আল্লাহর প্রতি কতটুকু ভালোবাসা রেখে কোরবানি দিচ্ছি সেটা দেখেন তিনি। এছাড়া লোক দেখানো কিংবা এলাকায় সুনাম অর্জনের জন্য বড়সড় দামি পশু জবাই করলেও আল্লাহ খুশি হবেন না। 

পবিত্র কুরআনে রয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত পৌঁছায় না; বরং তাঁর কাছে কেবল তোমাদের তাকওয়া পৌঁছায়।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৭)
আল্লাহ তায়ালার যে কোনো হুকুম যে কোনো সময় মাথা পেতে নেওয়া হচ্ছে কোরবানির শিক্ষা। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) এই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাই আল্লাহ তায়ালার যে কোনো আদেশ-নিষেধ আমাদের খুশি মনে মেনে নিতে হবে। এ ব্যাপারে কোনোরকম আপত্তি তোলার সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা মহাজ্ঞানী। তাঁর জ্ঞানের কাছে আমাদের জ্ঞান বিশাল বালুকণাময় প্রান্তরে ক্ষুদ্র এক বালুকণার মতোও নয়। তাই ইসলামের কোনো বিধান আমাদের সীমিত জ্ঞানে বুঝে না এলেও তা অবনতচিত্তে মেনে নিতে হবে। মহান আল্লাহ কোরবানি ও জীবনদানের প্রেরণা ও চেতনা সারাটি জীবনে জাগ্রত রাখার জন্য রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘বলুন হে মুহাম্মদ! আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমাকে তাঁরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি সবার আগে তাঁর অনুগত ও নির্দেশ পালনকারী। (সুরা আনআম : আয়াত ১৬২)

কোরবানি শব্দের অর্থ ত্যাগ স্বীকার করা। আত্মত্যাগের উৎকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে কোরবানি। হজরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আল্লাহর রাসুলের (সা.) রেখে যাওয়া ইসলামকে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিজেদের মাতৃভূমি ও প্রিয়জনদের মায়া ত্যাগ করে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাইতো তাঁদের কবর পৃথিবীর এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তাঁদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমাদের কাছে ইসলামের আওয়াজ পৌঁছেছে। যার কারণে আমরা মুসলমান। এভাবে তাঁরা ইসলামের জন্য কোরবানি করেছিলেন। তাই আমাদের আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহিম এবং ইসমাইল (আ.)-এর চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির পথে নিজেদেরকে পরিচালিত করতে হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম  
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়