ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

প্রতিদিন সড়কে মৃত্যুর দায় কে নেবে?

গোপাল অধিকারী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:০৪, ১ আগস্ট ২০২২  
প্রতিদিন সড়কে মৃত্যুর দায় কে নেবে?

গত শুক্রবার আমার পড়া সবচেয়ে মর্মান্তিক শিরোনাম ‘ছুটির দিনে ঘুরতে বেরিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন ১১ জন’। তারা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী। কি মর্মান্তিক ঘটনা!

সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে ভ্রমণের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা কি পারি না নিজের জীবনকে নিরাপদ রাখতে? সড়ক নিরাপদ রাখতে আমরা কি ব্যর্থ? এক সেকেন্ডে চলে গেল ১১টি প্রাণ।  তাদের সামনে ছিল সীমাহীন ভবিষ্যৎ। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের সম্পদ। 

এখানেই শেষ নয় গত বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই) রাত ৯টার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা গোপালগঞ্জগামী টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মিক্সার মেশিন ও শ্রমিকবাহী ভটভটির সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ভটভটিতে থাকা ৫ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। উপরের দুটি ঘটনাই ঘটেছে রেল ক্রসিংয়ে।   

রেলসূত্রে জানা গেছে সারা দেশে রেলপথে মোট ক্রসিং আছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টির অনুমোদন নেই। আবার ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টি ক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই। 

জানা গেছে, গত প্রায় ৪ বছরে সারা দেশে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১ হাজার মানুষ। আহত ও পঙ্গু হয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ। রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয়, তার ৮৯ শতাংশই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে। রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংগুলোর (বৈধ-অবৈধ) প্রায় ৮৪ শতাংশই অরক্ষিত। আর এসব ক্রসিংয়ে প্রায়ই ঝরছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। অথচ এসব ক্রসিং নিরাপদ করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকারে নেই। 

সড়ক দুর্ঘটনায় গত জুন মাসে নিহত হয়েছেন ৫২৪ জন। এর মধ্যে ২০৪ জন নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন শিশু এবং ৭৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগের মাসে (মে ২০২২) সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। 

সড়ক দুর্ঘটনায় গত জুন মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৭ দশমিক ৪৬ জন নিহত হয়েছে। মে মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ২১ জন। সুতরাং বলা যায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারান, তাদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সক্ষম (১৫-৬৪ বছর বয়সী)। আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ, ধরন, স্থান ও সমাধানের উপায় সবই দেখছি কিন্তু তার বাস্তবায়ন কেন হচ্ছে না প্রশ্নটা হয়তো আমার মতো সবারই। রেল তথ্যমতে, বিগত এক যুগে রেলওয়েতে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা রোধকল্পে তেমন কোনো বড় অঙ্কের অর্থের প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখা যায় না। রেলে এ পর্যন্ত যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে এবং চলমান যে বরাদ্দ আছে এর ১ শতাংশের কম বিনিয়োগ করলেও রেলপথ নিরাপদ হয়ে যায়। কিন্তু রেল কর্মকর্তাদের এসব প্রকল্পের দিকে মনোযোগ নেই। যে কারণে একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরো একটি দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ছোট একটি সতর্কীকরণ নোটিশ টাঙিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় সারে। দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ী ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

আমরা জানি, অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেলের আধিক্য এবং ছোট যানবাহনের চলাচল বেড়ে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা আরও বাড়ছে। মহাসড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ছোট অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধের ঘোষণা সরকার দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া গত এক দশকে কোনো রকম বাছবিচার না করেই মোটরসাইকেলের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। অথচ মোটরসাইকেলে হেলমেট নিশ্চিত করা, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং চালকের লাইসেন্স থাকার বিষয়ে সেভাবে নজরদারি করা হয় না। আজকাল স্কুলপড়ুয়া কিশোররাও রেস করে মোটরসাইকেল চালায়! 

মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দায় ঘটনা ভেদে ভিন্ন। তবে মর্মান্তিক ঘটনায় সরকারের দায়িত্ব অভিন্ন। কারণ সরকারকে রেলপথ, সড়কপথ ও পথচারী- সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হয়। দুর্ঘটনারোধে তাই  সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এবং অবশ্যই সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। মলাটবদ্ধ সিদ্ধান্ত কোনো কাজে আসে না। বিশেষ করে সড়কে গাড়ির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। প্রয়োজন চালকের লাইসেন্স প্রদানে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ অদক্ষ চালককে লাইসেন্স দেওয়ার অর্থ মরণযন্ত্র তার হাতে তুলে দেওয়া। প্রয়োজন গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদানেও কোনো আপোস করা যাবে না। 

অনিরাপদ সড়কে নিরাপদ থাকতে পথচারীদের সড়ক আইন মান্য ও সচেতন করতে, সড়ক ও রেলপথের অনিরাপদ দিকগুলো নিরাপদ করতে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক সচেতনতা। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়