ঢাকা     রোববার   ০৩ মার্চ ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১৯ ১৪৩০

মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক মিরাজ

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩  
মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক মিরাজ

‘মিরাজ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ উপরে আরোহণের বাহন। পরিভাষায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাতে ভ্রমণকে ইসরা এবং সেখান থেকে সিদরাতুল মুনতাহা ও আরও উপরের ভ্রমণকে মিরাজ বলা হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার এক বা দেড় বছর আগে রজব মাসে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়। 

স্বশরীরে হয়েছিল মহানবীর এই মিরাজ। তিনি ছাড়া অন্য কোনো নবী-রাসুলের মিরাজ হয়নি। মিরাজের মাধ্যমে মহানবীকে বিশেষভাবে সম্মানিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা হয়। এটা ছিল তাঁর অন্যতম বড় মুজিযা। মিরাজের ঘটনা কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের কিছু অংশে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশকে আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য।’ [সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ১]

প্রসিদ্ধ মতানুসারে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল নবুওয়তের দশম বছর রজব মাসের ২৭ তারিখ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৫০ বছর বয়সে। নবীজী উম্মে হানির ঘরে তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। এমন সময় তাঁর কাছে হযরত জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.) এলেন। তাঁরা তাঁকে ঘর থেকে বের করে বায়তুল্লাহর কাছে হাতিমের ভেতরে নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে তাঁকে যমযম কূপের কাছে নিলেন। সেখানে তাঁর সিনা চাক বা বক্ষ বিদারণ করা হয়। তাঁর সিনা ফেঁড়ে এর মধ্য থেকে কলব বা হার্ট বের করা হয়। এরপর যমযমের পানি দিয়ে কলব ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেওয়া হয়। এরপর বোরাক নামের একটি কুদরতি বাহন আনা হয়। এটা একটা সাদা রঙের প্রাণী, যা গাধার চেয়ে বড়, খচ্চরের চেয়ে ছোট। দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত তার গতি। এতে আরোহন করে তিনি চলতে লাগলেন।

যাওয়ার সময় জিবরাইল (আ.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর হিজরতের স্থান মদিনাসহ বিগত বিভিন্ন নবী-রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই স্থানগুলোতে নেমে দুই রাকাত করে নামাজ পড়ে নেন। এভাবে চলতে চলতে এক সময় বায়তুল মোকাদ্দাসে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে তিনি সব নবী-রাসুলকে নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। তিনি সেই নামাজের ইমামতি করেন। মসজিদে হারাম থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ হলো ইসরা বা রাতের ভ্রমণ। 

এরপর বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে আসমানের দিকে আরোহনের সময় একটা চলন্ত সিঁড়ি আসে। তিনি বোরাকসহ সেই চলন্ত সিঁড়িতে করে ঊর্ধ্বজগতে আরোহন করেন। এজন্যই মিরাজকে মিরাজ বলা হয়। যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সাত আসমানে বিশিষ্ট নবীগণকে রাখা হয়। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.) তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। দ্বিতীয় আসমানে হযরত ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.), তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হযরত মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইবরাহিম (আ.) তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। 

সপ্তম আসমানে হুবহু বায়তুল্লাহর মতো বায়তুল মামুর নামে একটা ঘর আছে। ফেরেশতারা সর্বক্ষণ বায়তুল মামুরে তাওয়াফ করেন। প্রতিদিন সেখানে এমন ৭০ হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের জন্য আসেন, যারা ভবিষ্যতে আর কোনো দিন এখানে আসবেন না। এই বায়তুল মামুরের পাশে আছে সিদরাতুল মুনতাহা বা সর্বশেষ স্টেশন। এখান থেকে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরও উপরে আল্লাহর দরবার পর্যন্ত নেওয়া হয়, তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘এবার আপনি একাই যাবেন, আমার পক্ষে আর উপরে যাওয়া সম্ভব নয়।’ এখানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর নিজের রূপে দেখেছিলেন। জিবরাইল (আ.)-এর ছয়শ ডানা আছে। তিনি এত বড়, যেন মহাকাশের দুই প্রান্ত ভরে গেছে।

সিদরাতুল মুনতাহার পাশে আছে জান্নাত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জান্নাতের সব শ্রেণি ঘুরিয়ে দেখানো হয়। একটা ঘর দেখিয়ে জিবরাইল (আ.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ‘এই ঘরটা হবে আপনার’। নবীজি বললেন, ‘আমাকে এতে একটু প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হোক’। সঙ্গী ফেরেশতা বললেন, ‘এখনও আপনার সময় হয়নি, দুনিয়ায় আপনার হায়াত বাকি আছে।’ নবীজীকে কলমে লেখার খসখস আওয়াজও শোনানো হয়। দুনিয়ার শুরু থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে এবং ঘটবে, এসব কিছু লওহে মাহফুজে লিখে রাখা হয়েছে। 

এভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক কিছু দেখানো হয়, অনেক কিছু জানানো হয়। যত বিষয়ে আমরা না দেখে ঈমান রাখি, সেসব কিছু তাঁকে দেখানো হয়। আল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দেন। আবার ওই রাতেই তিনি দুনিয়ায় ফিরে আসেন। এসে ফজরের নামাজ আদায় করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজের পর সাহাবায়ে কেরামকে মিরাজের বিস্তারিত ঘটনা শোনান।

মক্কার কাফের নেতৃবৃন্দ এটা শুনে চরমভাবে অস্বীকার করে এবং উপহাস শুরু করে। কাফেররা ছুটে যায় হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কাছে। তিনি সেদিন ফজরের জামাতে ছিলেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে তখনও তিনি শোনেননি। কাফেররা তাঁর কাছে গিয়ে বলল, যদি কোনো লোক বলে যে, সে রাতের অল্প সময়ের মধ্যে সাত আসমানের উপর পর্যন্ত গিয়েছে, আবার ফজরের আগে দুনিয়ায় ফিরে এসেছে, তুমি কি তা বিশ্বাস করবে? আবু বকর (রা.) জানতে চাইলেন, কে বলেছেন? তারা বলল, তোমাদের নবী! আবু বকর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, তাহলে আমি বিশ্বাস করি। তিনি সত্য বলেছেন। এখান থেকেই আবু বকর (রা.)-কে ‘সিদ্দিক’ বলা হয়। সিদ্দিক মানে পরম বিশ্বাসী।  (হাকেম, তৃতীয় খণ্ড)

হযরত আবু বকর (রা.)-এর মতো আমাদেরও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐতিহাসিক মিরাজকে বিশ্বাস করতে হবে। কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মিরাজের ঘটনা কেউ অস্বীকার করলে তার ঈমান থাকবে না।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম
 

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়