ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

সিজারিয়ান ডেলিভারি নিয়ে ৬ ভুল ধারণা

এস এম ইকবাল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১৪, ১৭ জুলাই ২০২২  
সিজারিয়ান ডেলিভারি নিয়ে ৬ ভুল ধারণা

বিশ্বজুড়ে সি-সেকশন বা সিজারিয়ান ডেলিভারির (অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব) হার বাড়ছে। চিকিৎসকেরা মা ও শিশুর ঝুঁকি বিবেচনায় সিজারিয়ান পদ্ধতি সুপারিশ করে থাকেন। 

তবে মেডিক্যাল কারণ ছাড়াও একজন নারীর সিজারিয়ান পদ্ধতি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা আছে। বাচ্চা জন্মদানের এই পদ্ধতি সম্পর্কে প্রচুর ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে ছয়টি ভুল ধারণার ইতি টানা হলো।

ভুল ধারণা: সিজার হলে মা ও নবজাতকের ত্বকের সংস্পর্শ সম্ভব হয় না।

সত্য: জন্মানোর পর নবজাতককে মায়ের খালি বুকে ঘন্টাখানেক রেখে দেয়াকে স্কিন-টু-স্কিন কনটাক্ট (ত্বকের সংস্পর্শ) বলে। এর চমকপ্রদ উপকারিতা আছে। এটা সত্য যে, সিজারের পর শরীরের কিছু অংশ খুবই সংবেদনশীল হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে মায়ের সঙ্গে নবজাতকের ত্বকের সংস্পর্শ সম্ভব হয় না এমনটা নয়। উভয়ের জন্য স্বস্তিকর অবস্থান পেতে কিছু সময় লাগে মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বাসে অবস্থিত দ্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ওয়েক্সনার মেডিক্যাল সেন্টারের প্রসব ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জোনাথন স্কাফির বলেন, ‘যেখানে পেট কাটা হয় সেখানে অল্প ব্যথা হয়, কিন্তু মা ও বাচ্চার ত্বকের সংস্পর্শের জন্য শরীরে আরো প্রচুর ত্বক রয়েছে।’

ভুল ধারণা: সিজার হলে বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করানো কঠিন।

সত্য: সিজারিয়ান ডেলিভারির পর বুকের দুধ পান করান অথবা বোতলের দুধ খাওয়ান, যেটাই করেন না- বাচ্চার স্বাস্থ্যবিধিতে অবশ্যই গুরুত্বারোপ করতে হবে। আপনি চাইলে বুকের দুধ পান করাতে পারবেন, কারণ বাচ্চা জন্মানোর এই পদ্ধতি বুকের দুধ পান করানোর ওপর বড় প্রভাব ফেলে না। সিজারিয়ান ডেলিভারির বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করানো খুবই সম্ভব একটি বিষয়, তবে একটু ধৈর্যশীল হতে হবে। এটা সত্য যে, সিজারে জন্মানো বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করানো শুরু করতে নরমাল ডেলিভারির তুলনায় একটু বেশি সময় লাগে। আমেরিকান কনগ্রেস অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনিকোলজিস্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিজার ও নরমাল ডেলিভারি উভয় পদ্ধতিতে জন্ম নেয়া বাচ্চাদেরকে বুকের দুধ পান করানোর হার প্রায় একই রকম।

সিজারের পর ব্যথা অনুভূত হলে বাচ্চাকে বিভিন্ন অবস্থানে বুকের দুধ পান করানোর চেষ্টা করুন। ডা. স্কাফির ফুটবল হোল্ডকে স্বস্তিকর অবস্থান হিসেবে সুপারিশ করেছেন।

ভুল ধারণা: একবার সিজার হলে আর কখনো নরমাল ডেলিভারি সম্ভব নয়।

সত্য: সিজারিয়ান ডেলিভারি হলেই যে পরের বার নরমাল ডেলিভারির প্রচেষ্টা চালাতে পারবেন না তা নয়। সিজারিয়ান ডেলিভারির পর নরমাল ডেলিভারির প্রচেষ্টা চালানোকে ভ্যাজাইনাল বার্থ আফটার সি-সেকশন (ভিবিএসি) বলা হয়। তবে এর জন্য ট্রায়াল অব লেবার আফটার সিজারিয়ান (টিওএলএসি) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কোনো নারীর জন্য ভিবিএসি নিরাপদ কিনা তা ট্রায়ালটির মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। আমেরিকান কনগ্রেস অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনিকোলজিস্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিওএলএসি’র মধ্য দিয়ে যান এমন নারীদের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশই নরমাল ডেলিভারিতে সফলভাবে বাচ্চা জন্ম দিতে পারেন। আগের সিজার হলেও তা ভবিষ্যতে নরমাল ডেলিভারির ওপর খুব কমই প্রভাব ফেলে।

ভুল ধারণা: নরমাল ডেলিভারির তুলনায় সিজারিয়ান ডেলিভারির অসুবিধা কম।

সত্য: গর্ভবতী নারীদের নরমাল ডেলিভারির পরিবর্তে সিজারিয়ান ডেলিভারির মধ্য দিয়ে যাওয়ার অনেক কারণ আছে। চিকিৎসকদের মতে, ‘গর্ভে একাধিক বাচ্চার উপস্থিতি, প্রসববেদনা ও প্রসবের সময় জটিলতা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় সিজারিয়ান ডেলিভারির সুপারিশ করা হয়ে থাকে। এর বাইরেও কারণ আছে।' সিজারের অনেক বৈধ কারণ থাকলেও একজন নারী চাইলে নিজের ইচ্ছায় এই পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন। সিজারের মেডিক্যাল কারণ না থাকলে চিকিৎসকেরা একজন গর্ভবতী নারী কোন পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্ম দেবেন তা তার সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেন। অনেক নারী নরমাল ডেলিভারিকে এতটাই ভয় পান যে সিজারিয়ান ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সিজারিয়ান ডেলিভারি যে খুব একটা স্বস্তিদায়ক বা ঝুঁকিমুক্ত তা নয়। মনে রাখবেন, সাধারণত সিজারিয়ান ডেলিভারি নিরাপদ বিবেচনা করা হলেও এটি একটি বড় সার্জারি এবং এতেও ঝুঁকি আছে। ডা. স্কাফির বলেন, ‘পেটের যেকোনো সার্জারিতে অত্যধিক রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ অথবা মূত্রাশয়ের মতো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।’

ভুল ধারণা: সিজারের ধকল কাটাতে দীর্ঘসময় লাগে।

সত্য: নরমাল ডেলিভারিতে বাচ্চা প্রসবের কিছুক্ষণ পরই আপনি ওঠে দাঁড়ানোর জন্য মাটিতে পা রাখতে পারবেন। তবে সিজারের পর একটু বাড়তি বিশ্রাম ও শিথিলায়নের প্রয়োজন আছে। যেসব নারী সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা জন্ম দেন তারা সাধারণত তিন-পাঁচ দিনে ঘরে ফিরতে পারেন এবং তাদের সেরে ওঠতে সাধারণত চার সপ্তাহ লাগে। কারো কারো নিরাময়কাল ছয়-সাত সপ্তাহও হতে পারে। অন্যদিকে নরমাল ডেলিভারিতে বাচ্চা জন্ম দেয়া নারীরা সাধারণত এক-দুই দিন পর হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরতে পারেন এবং তাদের সেরে ওঠতে প্রায় এক-দুই সপ্তাহ সময় লাগে। দেখা যাচ্ছে- উভয় পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্মদানের পর সেরে ওঠতে দীর্ঘসময় লাগে না। যে পদ্ধতিতেই বাচ্চা জন্ম দেন না কেন, নিরাময়কালে শ্রমসাধ্য শরীরচর্চা ও ভারী কিছু উত্তোলন বা বহন থেকে বিরত থাকতে হবে। কিছুদিন সহবাস করাও উচিত নয়। নিরাময়কালে পরিবারের সাহায্য নিতে মোটেও সংকোচ করবেন না।

ভুল ধারণা: সিজারিয়ান অপারেশনের নির্দিষ্ট সীমা আছে।

সত্য: কতবার পর্যন্ত সিজার নিরাপদ তার কোনো সীমানির্ধারক সংখ্যা নেই। আপনার জীবনকালে অনেকবার সিজারের মধ্য দিয়ে যেতে পারেন অথবা একবার সিজারিয়ান ডেলিভারি হলেই পদ্ধতিটিতে দ্বিতীয়বার বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম হতে পারেন। এটা নির্ভর করে প্রত্যেক নারীর নিজস্ব গর্ভাবস্থার ওপর। নিরাপদ সিজারের সীমানির্ধারক সংখ্যা না থাকলেও যত সিজারিয়ান ডেলিভারি হবে, ঝুঁকি তত বাড়তে পারে। মায়ো ক্লিনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার বার সিজারে জরায়ু-মূত্রাশয়ে আঘাত, রক্তক্ষরণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি।

/ফিরোজ/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়