Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২১ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ৭ ১৪২৮ ||  ০৯ জিলক্বদ ১৪৪২

রবীন্দ্র-ছোটগল্পের সূতিকাগার শাহজাদপুর

ড. মাহফুজা হিলালী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:২০, ৭ মে ২০২১  
রবীন্দ্র-ছোটগল্পের সূতিকাগার শাহজাদপুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) হাতে বাংলা ছোটগল্প প্রাণ পেয়েছে। আর বাংলাদেশ ছোটগল্প লেখার প্রেরণা দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। বিশেষ করে শাহজাদপুরের প্রকৃতি এবং মানুষ রবীন্দ্র-মানস গঠনে প্রভাব ফেলেছে অনেকাংশে। তাঁর অনেক গল্প-কবিতা-নাটকের নেপথ্যে রয়েছে শাহজাদপুরের প্রকৃতি-মাটি-মানুষের বিভিন্ন ঘটনা। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় তাঁর ছোটগল্প লেখায় শাহজাদপুরের ভূমিকা অনেক বেশি। তিনি নিজে এ কথা বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখও করেছেন।

প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প লেখা সম্পর্কে একটু আলোচনা করা জরুরি। তাঁর প্রথম গল্প ‘ভিখারিনী’। এটি বড়গল্প। লেখেন ১৯৭৭ সালে। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৮৯১ সালে ৩০ মে থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত তিনি ৬টি ছোটগল্প লেখেন- দেনাপাওনা, পোস্টমাস্টার, গিন্নি, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারাপ্রসন্নের কীর্তি। এ বছরেই তিনি লিখেছিলেন ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’। উল্লেখ্য ১৮৮৯ সালে তিনি আসেন শিলাইদহে, ১৮৯০ সালে আসেন শাহজাদপুর। আর ১৮৯১ সালেই লিখতে শুরু করলেন ছোটগল্প। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরই রবীন্দ্র-ছোটগল্পের জন্মস্থান। তবে, শাহজাদপুরকে রবীন্দ্রনাথ গল্প লেখার স্থান বলে উল্লেখ করেছেন। শাহজাদপুরের দুপুরকে তিনি বলেছেন ‘গল্পের দুপুর’। ছিন্নপত্রাবলীর ১৪৯ নম্বর চিঠিতে তিনি লিখেছেন:

‘আমার এই সাজাদপুরের দুপুর বেলা গল্পের দুপুর বেলা- মনে আছে ঠিক এই সময়ে এই টেবিলে বসে আপনার মনে ভোর হয়ে পোস্টমাস্টার গল্পটা লিখেছিলুম। আমিও লিখছিলুম এবং আমার চার দিকের আলো এবং বাতাস এবং তরুশাখার কম্পন তাদের ভাষা যোগ করে দিচ্ছিল। এই রকম চতুর্দিকের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিশে গিয়ে নিজের মনের মতো একটা-কিছু রচনা করে যাওয়ার যে সুখ তেমন সুখ জগতে খুব অল্পই আছে।

এই চিঠির প্রথম দিকে তিনি লিখেছেন: ‘এখানে (সাজাদপুরে) যেমন আমার মনে লেখবার ভাব এবং লেখবার ইচ্ছা আসে এমন আর কোথাও না।’ 

শাহজাদপুর সম্পর্কে ১৫০ নম্বর চিঠিতে তিনি আরো লিখেছেন: ‘... আমি এর মোহ থেকে কিছুতেই আপনাকে ছাড়াতে পারি নে। এই আলো, এই বাতাস, এই স্তব্ধতা আমার রোমকূপের মধ্যে প্রবেশ করে আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে- এ আমার প্রতিদিনকার নতুন নেশা, এর ব্যাকুলতা আমি নিঃশেষ করে বলে উঠতে পারি নে।’

অর্থাৎ শাহজাদপুর রবীন্দ্রনাথকে মোহাচ্ছন্ন করেছিল। উপরের উদ্ধৃতিগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়, শাহজাদপুরের আলো-বাতাস-গাছ-পাখি-ঘাস-প্রতিধূলিকণা রবীন্দ্রনাথ অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন। তাই এরা সবাই মিলে রবীন্দ্রনাথকে ভাষা যুগিয়েছে অর্থাৎ এই পরিবেশ তাঁকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এখানে না এলে রবীন্দ্রনাথের মানসগঠন অপূর্ণ থেকে যেতো; আমরা যে রবীন্দ্রনাথকে চিনি তাঁকে পেতামই না। বাংলাদেশ তাঁকে ঋদ্ধ করেছে, পরিপূর্ণ করেছে, সম্পূর্ণ করেছে। এবং গল্পকার রবীন্দ্রনাথকে তৈরি করেছে। শাহজাদপুরে বসে তিনি লিখেছিলেন পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ এবং অতিথি ছোটগল্প। ২৮ জুন ১৮৯৫-এ শাহজাদপুরে বসে ‘অতিথি’ গল্প লেখার সময় তিনি ছিন্নপত্রে লিখেছেন:

‘বসে বসে সাধনার জন্যে একটা গল্প লিখছি, একটু আষাঢ়ে গোছের গল্প। ... আমি যে-সকল দৃশ্য এবং লোক এবং ঘটনা কল্পনা করছি তারই চারিদিকে এই রৌদ্রবৃষ্টি নদী স্রোতে এবং নদীতীরের শরবন, এই বর্ষার আকাশ, এই ছায়বেষ্টিত গ্রাম, এই জলধারাপ্রফুল্ল শস্যের ক্ষেত ঘিরে দাঁড়িয়ে তাদের সত্যে এবং সৌন্দর্যে সজীব করে তুলছে- আমার নিজের মনের কল্পনা আমার নিজের কাছে বেশ রমণীয় হয়ে উঠছে। কিন্তু পাঠকরা এর অর্ধেক জিনিষও পাবে না। তারা কেবল কাটা শস্য পায়, কিন্তু শস্যক্ষেত্রের আকাশ এবং বাতাস, শিশির এবং শ্যামলতা, সবুজ এবং সোনালি এবং নীল সে-সমস্তই বাদ দিয়ে পায়। আমার গল্পের সঙ্গে সঙ্গে যদি এই মেঘমুক্ত বর্ষাকালের স্নিগ্ধ রৌদ্ররঞ্জিত ছোটো নদীটি এবং নদীর তীরটি, এই গাছের ছায়া এবং গ্রামের শান্তিটি, এমনি অখণ্ডভাবে তুলে দিতে পারতুম তা হলে গল্পটি কেমন সুমিষ্ট সজীব হয়ে দেখা দিত! তাহলে সবাই তার মর্মের সত্যটুকু কেমন অতি সহজেই বুঝতে পারত!’

রবীন্দ্রনাথের সময় শাহজাদপুরে পোস্টমাস্টার ছিলেন মহেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। একবার আগুন লেগে শাহজাদপুরের পোস্ট অফিস পুড়ে গিয়েছিল, তখন সাময়িকভাবে পোস্ট অফিসটি পরিচালিত হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ির একতলায়। সে সময় চিঠিপত্র এলে পোস্টমাস্টার নিজেই রবীন্দ্রনাথকে দিতে আসতেন। আবার সময়ে-অসময়ে রবীন্দ্রনাথও গল্প করার জন্য ডেকে নিতেন পোস্টমাস্টারকে। পোস্টমাস্টার শাহজাদপুরে প্রচলিত বিভিন্ন আজগুবি গল্প গম্ভীরভাবে বলে যেতেন, রবীন্দ্রনাথও তা শুনে আনন্দ পেতেন। এভাবে দুজন খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। তাঁর ছিন্নপত্রের অনেক চিঠিতে এই পোস্টমাস্টার সম্পর্কে লেখা আছে। মহেন্দ্রলাল ছিলেন কলকাতার মানুষ। শাহজাদপুরে তার মন টিকছিল না। তার মনে হতো ছুটি নিয়ে অথবা চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলকাতা চলে যেতে। অবশেষে রবীন্দ্রনাথের চেষ্টাতেই মহেন্দ্রবাবুর বদলির ব্যবস্থা হয়েছিল। এই পোস্টমাস্টারকে নিয়েই তিনি লিখেছিলেন ‘পোস্টমাস্টার’ গল্প। আবার গল্পের রতনও শাহজাদপুরের নিকারিপাড়ার একটি মেয়ে। এই মেয়েটি সত্যিই পোস্টমাস্টারের ঘরের কাজ এবং রান্নাবান্না করে দিতো। পোস্টমাস্টারের জাত বিচারের বালাই ছিল না, তাই নিকারি মেয়ের রান্না খেতে তার বাধতো না।

রবীন্দ্রনাথের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘ছুটি’। এই গল্পের ফটিককে তিনি পেয়েছিলেন শাহজাদপুরেই। বিকেলবেলা তিনি শাহজাদপুরের গ্রামের ঘাটের উপরে বোট লাগাতেন। ডাঙার উপর অনেকগুলো ছেলে মিলে খেলা করতো, তিনি তাই বসে বসে দেখতেন। ১৮৯১ সালের জুন মাসের একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন: 

‘ডাঙ্গার উপর একটা মস্ত নৌকার মাস্তুল পড়ে ছিল- গোটাকতক বিবস্ত্র ক্ষুদে ছেলে মিলে অনেক বিবেচনার পর ঠাওরালে যে, যদি যথোচিত কলরব-সহকারে সেইটেকে ঠেলে ঠেলে গড়ানো যেতে পারে তা হলে খুব একটা নতুন এবং আমোদজনক খেলার সৃষ্টি হয়। যেমন মনে আসা অমনি কার্যারম্ভ। ‘সাবাস জোয়ান হেঁইয়ো! মারো ঠেলা হেঁইয়ো!’ সব কটায় মিলে চিৎকার এবং ঠেলা। মাস্তুল যেমনি এক পাক ঘুরছে অমনি সকলের আনন্দের উচ্চহাস্য। কিন্তু এই ছেলেদের মধ্যে যে দুটি-একটি মেয়ে আছে, তাদের ভাব আর-এক রকম। সঙ্গী-অভাবে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু এইসকল শ্রমসাধ্য উৎকট খেলায় তাদের মনের যোগ নেই। একটি ছোটো মেয়ে বিনাবাক্যব্যয়ে গম্ভীর প্রশান্তভাবে সেই মাস্তুলটার উপর গিয়ে চেপে বসল। ... সর্বজ্যেষ্ঠ ছেলেটি এসে তাকে বিশ্রামের জন্যে অন্য স্থান নির্দেশ করে দিলে, সে তাতে সতেজ মাথা নেড়ে কোলের উপর দুটি হাত জড়ো করে নড়েচড়ে আবার বেশ গুছিয়ে বসল। তখন সেই ছেলেটা শারীরিক যুক্তি প্রয়োগ করতে আরম্ভ করলে এবং অবিলম্বে কৃতকার্য হল। ... এমন সময় আর-এক রকমের খেলা তাদের মনে এল, সেটাও খুব মজার। দুজন ছেলেতে মিলে একটা ছেলের হাত পা ধরে ঝুলিয়ে তাকে দোলা দেবে। এর ভিতরে খুব একটা রহস্য আছে সন্দেহ নেই; কারণ, ছেলেরা বেজায় উৎফুল্ল হয়ে উঠল। ... কিন্তু একটা দুর্ঘটনা ঘটল। যাকে দোলাচ্ছিল সে পড়ে গেল। ... বড়ো ছেলেটা তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে, কোলের উপর তার মাথাটা নিয়ে, সানুনয় স্বরে অনুতাপ প্রকাশ করে বলতে লাগল- ‘আয়-না ভাই, ওঠ-না ভাই! লেগেছে ভাই!’ অনতিকাল পরেই দুই কুকুরশাবকের মতো দুজনের হাত-কাড়াকাড়ি খেলা বেধে গেল।’

এই বড়ো ছেলেটি ছিল দ্বারিয়াপুরের চক্রবর্তীদের বাড়ির ছেলে হারাণ চক্রবর্তী৭, যে কিনা রবীন্দ্রনাথের ‘ফটিক চক্রবর্তী’ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির এই সন্তানরা কলকাতার পরিবেশে যে বৃন্তচ্যুত ফুলের মতো প্রাণ হারাবে রবীন্দ্রনাথ তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই কলকাতা থেকে ফটিকের আর ফিরে আসা হয় নি প্রকৃতির কোলে।
‘সমাপ্তি’ গল্পের মৃন্ময়ীকেও রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন এক সকালে গোপাল সাহার ঘাটে লাগানো বোট থেকে। ৪ জুলাই ১৮৯১ তারিখে তিনি লিখেছেন:

‘... বোধ হয় একজন কে কোথায় যাচ্ছে এবং তাকে বিদায় দিতে সবাই এসেছে। ...ওদের মধ্যে একটি মেয়ে আছে, তার প্রতিই আমার মনোযোগটা সর্বাপেক্ষা আকৃষ্ট হচ্ছে। বোধ হয় বয়েস বারো-তেরো হবে, কিন্তু একটু হৃষ্টপুষ্ট হওয়াতে চোদ্দ-পনেরো দেখাচ্ছে। মুখখানি বেড়ে। বেশ কালো অথচ বেশ দেখতে। ছেলেদের মতো চুল ছাঁটা, তাতে মুখটি বেশ দেখাচ্ছে। এমন বুদ্ধিমান এবং সপ্রতিভ এবং পরিষ্কার সরল ভাব। একটা ছেলে কোলে করে এমন নিঃসংকোচ কৌতূহলের সঙ্গে আমাকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। ... ছেলেদের মতো আত্মসম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন ভাব এবং তার সঙ্গে মাধুরী মিশে ভারী নতুন রকমের একটি মেয়ে তৈরি হয়েছে।’

কিছুক্ষণ পর এই মেয়েটিকেই শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে জোর করে নৌকোয় তুলে দিয়েছিল জনপদবধূরা। শাহজাদপুরের গোপাল সাহার এই মেয়েটির ধাঁচেই অঙ্কিত হয়েছে মৃন্ময়ী। সমাপ্তি গল্পে মৃন্ময়ীর বর্ণনা এ রকম: 

‘মৃন্ময়ী দেখিতে শ্যামবর্ণ; ছোটো কোঁকড়া চুল পিঠ পর্যন্ত পড়িয়াছে। ঠিক যেন বালকের মতো মুখের ভাব। মস্ত মস্ত দুটি কালো চক্ষুতে না আছে লজ্জা, না আছে ভয়, না আছে হাবভাবলীলার লেশমাত্র। শরীর দীর্ঘ, পরিপুষ্ট, সুস্থ, সবল, কিন্তু তাহার বয়স অধিক কি অল্প সে প্রশ্ন কাহারও মনে উদয় হয় না।’

এই মৃন্ময়ী সমাপ্তিতে একটি দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে সম্পূর্ণ নারীতে পরিণত হয়েছে। ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পে মৃণাল নারী থেকে মানুষ-চরিত্রে উন্নীত। মৃণাল স্বামীর কাছে লেখা চিঠির প্রথমে লিখেছে: ‘আমি তোমাদের মেজোবউ। আজ পনেরো বছরের পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি, আমার জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই চিঠিখানি লিখছি, এ তোমাদের মেজোবউয়ের চিঠি নয়।’

চিঠির অর্থাৎ গল্পের শেষে বলেছে, ‘তুমি ভাবছ আমি মরতে যাচ্ছি-  ভয় নেই, অমন পুরোনো ঠাট্টা তোমাদের সঙ্গে আমি করব না। মীরাবাঈও তো আমারই মতো মেয়েমানুষ ছিল- তার শিকলও তো কম ভারী ছিল না, তাকে তো বাঁচবার জন্যে মরতে হয় নি। মীরাবাঈ তার গানে বলেছিল, ‘ছাড়ুক বাপ, ছাড়ুক মা, ছাড়ুক যে যেখানে আছে, মীরা কিন্তু লেগেই রইল, প্রভু- তাতে তার যা হবার তা হোক। এই লেগে থাকাই তো বেঁচে থাকো। আমিও বাঁচব। আমি বাঁচলুম।’১১

এই বোধ বাঙালি নারীর জন্য নতুন। যে সময় নারীর কোনো মানবিক সত্তা ছিল না, সেই সময় মৃণাল অস্তিত্ববাদী নারীতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো রবীন্দ্রনাথ এই বোধ কোথায় পেলেন? শাহজাদপুর থেকে লেখা একটি চিঠি এখানে উদ্ধৃত করতে পারি:

‘... একদল বেদে বাখারির উপর খানকতক দর্মা এবং কাপড় টাঙিয়ে দিয়ে তারই মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ... বেদে-আশ্রমের  সম্মুখে লোক জড়ো হয়েছে এবং ওরই মধ্যে একটু ভদ্রগোছের একজন লাঠি আস্ফালন করে বিষম গালমন্দ দিচ্ছে- কর্তা বেদে দাঁড়িয়ে নিতান্ত ভীত কম্পিত ভাবে কৈফিয়ত দেবার চেষ্টা করছে। বুঝতে পারলুম কী-একটা সন্দেহের কারণ হয়েছে, তাই পুলিশের দারোগা এসে উপদ্রব বাধিয়ে দিয়েছে। মেয়েটা বসে বসে আপন-মনে বাখারি ছুলে যাচ্ছে, যেন সে একলা বসে আছে- এবং কোথাও কিছু গোলমাল নেই। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়িয়ে পরমনির্ভীক চিত্তে দারোগার মুখের সামনে বারবার বাহু আন্দোলন করে উচ্চৈঃস্বরে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলে। দেখতে দেখতে দারোগার তেজ প্রায় বারো আনা পরিমাণ কমে গেল- অত্যন্ত মৃদুভাবে দুটো-একটা কথা বলবার চেষ্টা করলে, কিন্তু একটুও অবসর পেলে না।’১০ 

রবীন্দ্রনাথ দেখলেন, বেদেপরিবারের ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সাহস বেশি। তাদেরকে নির্ভীক চিত্তে দারোগার সামনে দাঁড়াতে দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ। ভারতবর্ষে পারিবারিক এই কনসেপ্ট তাঁর মানসজগতে নতুন সংযোজন। তিনি আরও লক্ষ্য করেছেন গ্রামের মেয়েদের সাহস একটু বেশি। তাঁর নিজের দরবারেও কোনো মেয়ে নালিশ করতে এলে ঘোমটায় আচ্ছন্ন হয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু তার কণ্ঠে ভয়-সংকোচ বা কাকুতি-মিনতি থাকে না- পরিষ্কার তর্ক করে। নারীদের এই নিঃসংকোচ তাঁকে অভিভূত করে। তিনি উপলব্ধি করেন, নারীর মধ্যে এক ধরনের শক্তি আছে যার জন্য তারা সংকুচিত নয়, বোধ করি, এখানেই মৃণালের মানবিক বোধের শেকর।

শাহজাদপুরের একজন খানসামার কাছে তিনি জীবনের চরম সত্য শিখেছিলেন। একদিন খানসামা দেরি করে আসাতে তিনি রাগ করেছিলেন। কিন্তু খানসামা জানালো গতরাত্রে তার আট বছরের মেয়ে মারা গেছে। এ কথা বলেই সে ঝাড়ন নিয়ে বিছানাপত্র ঝাড়তে শুরু করে। এ ঘটনায় তিনি অনুভব করেন, কর্মই পারে বৃথা অনুশোচনার বন্ধন থেকে মুক্ত করে সম্মুখে প্রবাহিত করতে। তিনি আরো অনুভব করেন, যে মেয়ে মরে গেছে তার জন্যে শোক ছাড়া আর কিছুই করার নেই, কিন্তু যে ছেলে বেঁচে আছে তার জন্যে রীতিমতো খাটতে হবে। মানুষ তাই মৃত্যু, শোক, দুঃখ, নৈরাশ্যকে গোপন করে চাকরি করে, ব্যবসা করে, চাষ করে, মজুরি করে। তাই পৃথিবীর কর্মচক্র বন্ধ হয় না। রবীন্দ্র-সাহিত্যের ছত্রে ছত্রে এই বোধ স্পষ্ট। কঙ্কাল, মুক্তির উপায়, একরাত্রি, জীবিত ও মৃত, কাবুলিওয়ালা, ছুটি, মধ্যবর্তিনী, শাস্তি, মেঘ ও রৌদ্র, দিদি, নষ্টনীড়, মাল্যদান, হৈমন্তী, স্ত্রীর পত্র, পয়লা নম্বর ইত্যাদি ছোটগল্পগুলোতে এই বোধ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। 

রবীন্দ্র-গল্পে প্রকৃতি বারবার চরিত্র হয়ে উঠেছে। প্রকৃতি যেমন মানব মনের উপর প্রভাব ফেলেছে, তেমনি হয়েছে মানবচরিত্র। পোস্টমাস্টার, একরাত্রি, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, মেঘ ও রৌদ্র, ছুটি, সমাপ্তি ইত্যাদি গল্পে প্রকৃতির এই রূপ দেখা গেছে সম্পূর্ণভাবে। এই প্রকৃতিকে রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন জমিদারী জনপদেই। প্রকৃতি সম্পর্কে শাহজাদপুর থেকে লেখা একটি চিঠিতে লিখেছেন:

‘যেন প্রকৃতি কৌতূহলী পাড়াগেঁয়ে মেয়ের মতো সর্বদাই আমার জানলা-দরজার কাছে উঁকি মারছে।’১১

রবীন্দ্রনাথের প্রিয় জায়গাগুলোর একটি ছিল শাহজাদপুর। কিন্তু শাহজাদপুরকে ছেড়ে গিয়েছিলেন তিনি; ছেড়েছিলেন সংসারেরই নিয়মে। ১৮৯৭ সালে ঠাকুর পরিবারের যৌথ জমিদারি ভাগ হয়ে শাহজাদপুর অংশ রবীন্দ্রনাথের মেজকাকা গিরীন্দ্রনাথের বংশধরদের হাতে গেলে তখন থেকে রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরে আসা ছেড়ে দেন। ১২ শাহজাদপুর কাছারি বাড়িতে সংরক্ষিত রবীন্দ্রনাথের জমিদারি সংক্রান্ত একটি অর্ডার বুক বা হুকুমনামায় রবীন্দ্রনাথের শেষ হুকুমের তারিখ পাওয়া যায় ১১ ফাল্গুন ১৩০৩ অর্থাৎ ১৮৯৭ সালের ২ রা ফেব্রুয়ারি। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, ১৮৯০ সালের জানুয়ারি থেকে ১৮৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুর নিয়মিত এসেছেন। এরপর আর এসেছেন কি-না তা জানা যায় না। তবে, গোপালচন্দ্র রায় তাঁর লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রাবলী’ গ্রন্থে এ সম্বন্ধে বলেছেন, পতিসর যাওয়ার পথে ১৩০৪ সালের ৮ আশ্বিন রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরে এসেছিলেন এবং শাহজাদপুর বিচ্ছেদ স্মরণ করেই তিনি ‘যাচনা’ (প্রথমে কবিতা) গানটি লিখেছিলেন।১৩

এ গানে তিনি পরম আকূতি নিয়েই শাহজাদপুরকে বলেছেন: 
‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখিয়ো- তোমার 
মনের মন্দিরে।’১৪


তথ্যনির্দেশ ও টীকা
১.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্রাবলী, ১৪১১, বিশ্বভারতী, কলকাতা, পৃষ্ঠা-২২৫
২.    প্রাগুক্ত
৩.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২২৬
৪.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩১১
৫.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪৯
৬.    নরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ, ১৪১১, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, পৃষ্ঠা-৪৬
৭.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫৩
৮.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী, ৯ম খ-, ১৪১০, বিশ্বভারতী, কলকাতা, পৃষ্ঠা-৩৮৬
৯.    প্রাগুক্ত, ১২শ খ-, ১৪১০, বিশ্বভারতী, কলকাতা, পৃষ্ঠা-৩২৯
১০.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্রাবলী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৮
১১.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩১২
১২.    নরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৬
১৩.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৭
১৪.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী, ৪র্থ খ-, ১৪১০, বিশ্বভারতী, কলকাতা, পৃষ্ঠা-১৩৩ 


লেখক : গবেষক, নাট্যকার  

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়