ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৮ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪৩১

কুমারখালীতে সড়কের ৩ হাজার গাছ কাটার প্রস্তুতি

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২৮, ২৫ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ১১:৩১, ২৫ এপ্রিল ২০২৪
কুমারখালীতে সড়কের ৩ হাজার গাছ কাটার প্রস্তুতি

তিন মাস আগেও সড়কের ধারে গাছগুলো ছিল চোখের সৌন্দর্য। ছায়াতলে বিশ্রাম নিতো মানুষ। আরামে চলাচল করতো পথচারীরা। এখন সেখানে ধূ ধূ মরুভূমি, তীব্র তাপদাহ। অল্প কিছু টাকার জন্য সরকার যেন আর গাছ না কাটে। 

আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের সাঁওতা গ্রামের মোস্তাক শাহরিয়ার। তিনি কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্র।

আলিমুজ্জামান রাজিব নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, যেহেতু গাছগুলো আমাদের ছায়া দিচ্ছে। সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করছে। সেহেতু গাছগুলো না কাটাই ভাল। 

তার দাবী, গাছপালা কমে যাওয়ার কারণেই বৃষ্টিপাত হচ্ছেনা, তীব্র তাপদাহ চলছে। 

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লাহিনীপাড়া থেকে সান্দিয়ারা পর্যন্ত পাউবোর জিকে খাল ঘেঁষে প্রায় ২০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে। সড়কে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সমিতির মাধ্যমে প্রায় ১০ বছর পূর্বে কয়েক হাজার ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করেছিল উপজেলা বনবিভাগ। 

জানা গেছে, দরপত্রের মাধ্যমে ২০২৩ সালে যদুবয়রা থেকে সান্দিয়ারা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কের আনুমানিক প্রায় ১০ হাজার গাছ কাটা হয়েছে। চলতি বছরেও ওই সড়কের লাহিনীপাড়া থেকে বাঁধবাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার সড়কের ৩ হাজার গাছ কাটা হয়েছে।

আরো জানা গেছে, সম্প্রতি বাঁধবাজার থেকে মাদুলিয়া পর্যন্ত আরও তিন কিলোমিটার সড়কের কয়েক হাজার গাছ কাটার জন্য গাছের গায় নম্বর বসিয়ে দরপত্র সম্পন্ন করেছেন বনবিভাগের কর্মকর্তারা। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য গাছগুলো না কেটে রক্ষার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও পথচারীরা।

বুধবার ( ২৪ এপ্রিল ) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জিকে খালের লাহিনীপাড়া এলাকায় সড়কের ধারে আর সবুজের নয়নাভিরাম দৃশ্য আর নেই। কাটা গাছগুলোর গোড়া ও কিছু অংশবিশেষ পড়ে আছে। চাঁপড়া বোর্ড অফিস এলাকার খালের পাকা ও কাঁচা সড়কের দুইপাশে মেহগনি, বাবলা, কড়ইসহ নানান জাতের কয়েক হাজার বড় বড় গাছ রয়েছে। সেগুলোর গায়ে নম্বর বসানো।

এসময় আব্দুল হাকিম নামে একজন ভ্যানচালক জানালেন, তিনি নিয়মিত ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি প্রায়ই সড়কে গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেন। গাছগুলো কাটা হলে আর বসা হবেনা তার। 

তার দাবী, গাছের কারণেই মানুষ স্বস্তিতে সড়কে চলাচল করতে পারে। অনেকেই বিশ্রাম নেয়।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন চাকরিজীবী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গাছগুলো যেহেতু সড়ক নির্মাণ ও চলাচলে সমস্যা করছেনা, সেহেতু শুধু টাকার জন্য কেন কাটা হবে?  নির্বিচারে গাছ কাটার কারণেই প্রকৃতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তিনি গাছ রক্ষার দাবি জানান।

উপজেলা বনবিভাগ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আর্থসামাজিক ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৪ সাল থেকে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বনবিভাগ। তারা প্রথমে স্থানীয়দের নিয়ে এলাকাভিত্তিক সমিতি গঠন করে। পরে বিভিন্ন সড়কের ধারে জ্বালানি কাঠের গাছের চারা রোপণ করে। গাছ দেখাশোনা করে সমিতির সদস্যরা। গাছের বয়স যখন ১০ বছর পূর্ণ হয়। তখন গাছ কাটা ও বিক্রির জন্য দরপত্র আহবান করে বনবিভাগ। গাছ বিক্রির ৫৫ ভাগ টাকা পায় সমিতির সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ পায় ৫ ভাগ। আর বনবিভাগ ও সড়ক সংশ্লিষ্ট বিভাগ পায় ২০ ভাগ টাকা।

জনগণের গাছ রক্ষার দাবির সাথে একমত পোষণ করেছেন চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. এনামুল হক মঞ্জু। 

তিনি বলেন, সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ছায়া ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে গাছগুলো থাকা দরকার। 

তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান। তবে কিছু গাছ ঝড়ে ভেঙে পড়লে মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের ক্ষতি হবে, সেগুলো কাটার কথাও জানান তিনি।

পরিবেশ নিয়ে প্রায় ৪১ বছর ধরে গবেষণা করছেন গৌতম কুমার রায়। এই গবেষক বলেন, ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী দেশে ২৫ ভাগ বনভূমি বা গাছপালা থাকা দরকার। কিন্তু সেই তুলনায় গাছ আছে মাত্র ৯ ভাগের কম। তবুও প্রতিদিনই গাছ উজাড় হচ্ছে, সৃজন হচ্ছেনা। এ মুহূর্তে প্রচণ্ড তাপদাহ চলছে। পানির মহা সংকট চলছে। গরমে মানুষের নাভিশ্বাস চলছে। পাখিকুল আশ্রয় পাচ্ছেনা। এ সময় গাছগুলো কাটার ঘটনা সত্যি অদ্ভুত ও দুঃখজনক।

উপজেলা বনবিভাগ কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, ১০ বছর পূর্ণ হলেই সমিতির নিয়ম অনুসারে গাছ কেটে পুনরায় নতুন চারা রোপণ করা হয়। ইতোমধ্যে ওই সড়কের ১৩ কিলোমিটার এলাকার গাছ কাটা হয়েছে। অন্যান্য গাছগুলো দরপত্রের মাধ্যমে কাটা হবে। গাছ রক্ষার কোনো সুযোগ নাই।

যেহেতু তাপদাহ চলছে, সেহেতু এই মুহূর্তে গাছগুলো থাকা দরকার বলে মনে করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম। তিনি বলেন, বনবিভাগের সঙ্গে আলাপ করে বিধিমতে কার্যকারী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

কাঞ্চন/টিপু

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়