ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৬ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৩ ১৪৩১

‘আমাকে বাঁচাও’, মায়ের সেই আকুতি এখনো ভোলেনি রায়ান

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪৪, ১৯ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৬:৩২, ৪ এপ্রিল ২০২৪
‘আমাকে বাঁচাও’, মায়ের সেই আকুতি এখনো ভোলেনি রায়ান

মৃত্যুর দুই বছর পরও শিশু সন্তানদের স্মৃতিতে জাগরুক রাইমা ইসলাম শিমু (সংগৃহীত ছবি)

২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি। অন্যান্য দিনের মতো মায়ের সঙ্গেই ঘুমিয়েছিল ৬ বছরের রায়ান। সকালে ধস্তাধ্বস্তির শব্দে ঘুম ভাঙে তার। একপলক তাকিয়ে দেখে, বাবা মাকে মারছে। বাবা রায়ানকে ধমক দিলে সে আবার চোখ বন্ধ করে থাকে। তখন মা বলেছিল, ‘রায়ান, আমাকে বাঁচাও’। মায়ের সেই আকুতি এখনো ভুলতে পারছে না সে। মাকে হারিয়ে খালার কাছে থাকছে রায়ান ও তার বোন ওজিহা। মায়ের কথা মনে পড়লে খালামনিকে জড়িয়ে ধরে ওজিহা বলে, ‘মাকে কোথায় পাবো?’

চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমুর ছেলে-মেয়ে রায়ান ও ওজিহা। মৃত্যুর দুই বছর পরও শিশু সন্তানদের স্মৃতিতে জাগরুক শিমু।

২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে শিমুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিমুকে হত্যার ঘটনায় তার ভাই হারুনুর রশীদ বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার করা হয় শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ফরহাদকে। মামলাটি তদন্ত করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম দুজনকে অভিযুক্ত করে ওই বছরের ২৯ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর তাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ শফিকুল আলমের আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে। এখন পর্যন্ত মামলাটিতে ৩৩ সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর আদালতে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু, ওই দিন সাক্ষ্য হয়নি। আগামী ২৫ জানুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ ধার্য রয়েছে।

মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রসিকিউটর আনোয়ার সরদার বলেছেন, মামলাটিতে ১২ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আশা করছি, তাদের সর্বোচ্চ সাজা হবে। ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে। এ বছরেই মামলার বিচার শেষ হবে বলে আশা করি। 

শিমুর বোন ফাতেমা বেগম বলেন, দুই বছর হয়েছে বোনকে হারিয়েছি। আমাদের সাথে যে ঘটনা ঘটেছে, মৃত্যুর আগপর্যন্ত ভুলব না। মামলায় সাক্ষ্য চলছে। আমরা আশাবাদী, ন্যায়বিচার পাবো। 

শিমুর মেয়ে ওজিহার কথা উল্লেখ করে ফাতেমা বেগম বলেন, ও তো বড়, বুঝতে পারে। ভীষণ কষ্ট পায়। ওর যেটা অনুভূতি— এমন ঘটনা ওর সাথে কেন হলো? মাকে অনেক মিস করে সে। বলতে থাকে, তার সাথে কেন এমন ঘটনা ঘটল? তার মাকে সে কোথায় পাবে? মায়ের কথা মনে পড়লে আমাকে জড়িয়ে ধরে, মাকে খোঁজে। কিন্তু, খুঁজলেও মাকে কই পাবে? আমরা কেউই তাকে আর পাবো না। আমরা সবাই তাকে খুঁজি। বোনকে হারিয়ে বুঝি, কী হারিয়েছি? এটা অন্যদের বোঝানোর ভাষা নেই।

রায়ানের বিষয়ে ফাতেমা বেগম বলেন, ছেলেটা তো ছোট, তেমন বোঝে না। তারপরও সে তার মাকে খোঁজে। যদিও সে আমাকে মা ডাকে। তারপরও রায়ান ওর মাকে খোঁজে। কথা বলে বুঝতে পারি। রায়ানের সামনে ওর মা বলেছে, আমাকে বাঁচাও। এ শব্দটা এখনো সে ভোলেনি। ও তো রুমে ছিল। একনজর দেখেছিল ওই ঘটনা। ঘুম থেকে উঠেছিল। ওর বাবা নোবেল ওকে ধমক দেয়। আবার শুয়ে পড়ে রায়ান। ওর মা বলেছিল, ‘রায়ান, আমাকে বাঁচাও।’ এই কথা ও ওর স্মৃতি থেকে মুছতে পারছে না। চেষ্টা করছি মোছানোর। বোঝাচ্ছি, তোমার মা আল্লাহর কাছে আছে। যতটুকু বুঝিয়েছি, ওর ধারণা, মাকে আল্লাহ নিয়ে গেছে। পরী বানিয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওকে নতুন মা দিয়েছে, এটা বলি। কিন্তু, আমি বুঝি, আমিও তো একটা মা, আমারও একটা সন্তান আছে। বুঝি, সে তার মাকে মিস করছে। 

ফাতেমা বেগম আরও বলেন, রায়ান আমাকে ছেড়ে কোথাও যায় না। মামার বাসায় গেলেও এক দিন পর বলে, মার কাছে যাবো। আমি যদি অসুস্থ হই, আমার বাচ্চার চেয়ে ও বেশি অস্থির হয়ে যায়। আমার মা বলে, তুমি এত অস্থির হচ্ছ কেন খালামনির জন্য? রায়ান বলে, আমি একটা মা হারিয়ে ফেলেছি; এই মার যদি কিছু হয়, তাহলে কোথায় পাবো? অনেক বুঝতে শিখেছে রায়ান। বুঝতে পারি, ওর মধ্যে ভীষণ একটা অভিমান, অভিযোগ আছে বাবার বিরুদ্ধে। এটাই স্বাভাবিক। চোখের সামনে দেখছে—বাবা মাকে মেরে ফেলছে। এর পর থেকে বাবাকে বাবা বলে ডাকে না। নোবেল বলে ডাকে। বলে নোবেল আমার মাকে মেরে ফেলেছে। এটা কোনো সন্তানের ভোলার কথা নয়।

শিমুর কথা উল্লেখ করে ফাতেমা বলেন, আপা যে খাবারগুলো পছন্ত করত, মা এখন সেটা খেতে পারে না। সে খাবারগুলো নিয়ে কান্না করে। মা তার মেয়েকে হারিয়েছে। আমি বোনকে হারিয়েছি, ওজিহা-রায়ান মাকে হারিয়েছে। যাই হোক, আমরা আশাবাদী, আল্লাহ ন্যায়বিচার দেবেন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে আমাদের।

মামুন/রফিক

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়