ঢাকা     রোববার   ১৬ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ২ ১৪৩১

১৪ দলীয় জোট

‘অভিমান’ ভাঙবে শরিকদের, পাবে ‘অনুকম্পা’?

এসকে রেজা পারভেজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১০, ২২ মে ২০২৪   আপডেট: ২২:২১, ২২ মে ২০২৪
‘অভিমান’ ভাঙবে শরিকদের, পাবে ‘অনুকম্পা’?

ছবি: গ্রাফিক্স

প্রত্যাশা-প্রাপ্তির বিস্তর ফাঁরাকে অভিমানের ‘পাহাড়’ জমেছে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মাঝে। ‘ক্ষয়িঞ্ঝু শক্তির’ শরিকরা মাঠের রাজনীতিতে প্রভাব না বাড়াতে পারায় আওয়ামী লীগের কাছে যেমন কমেছে গুরুত্ব, তেমনি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ায় শরিকরাও নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে শঙ্কায় পড়েছেন। এজন্য প্রকাশ্যে জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগে অস্বস্তি বাড়িয়ে ‘অনুকম্পা’ পেতে চাইছে দলগুলো। আর জোটের শরিকরা বিষয়টিকে বলছেন ‘মূল্যায়ন’।

জোটের টানাপড়েনের মাঝে দীর্ঘ পাঁচ মাস পর শরিকদের গণভবনে ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং জোটপ্রধান শেখ হাসিনা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন বণ্টন নিয়ে সর্বশেষ গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বৈঠকে বসেছিলেন জোটনেতারা। এরপর কেটে গেছে অনেকদিন। পানিও গড়িয়েছে বেশ। আর জোটের অভিমান, ক্ষোভ ও হতাশা বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। গত কয়েকদিনে জোটের কার্যকারিতা এবং জোট থাকা না থাকা নিয়ে তিক্ত ভাষায় কথা বলেছেন জোটনেতারা। কয়েকজন তো বলেই দিয়েছেন, ‘১৪ দল এখন আর সক্রিয় নেই। এ জোটের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আমরা জানি না।’ এমন অবস্থায় শরিকরা ভাবনা, জোটনেত্রী তাদের সব কথা শুনবেন এবং মূল্যায়ন করবেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘একসঙ্গে থাকতে হলে পারস্পরিক সম্মানটুকু থাকতে হবে। বেশি কিছু চাওয়া-পাওয়ার তো কিছু নেই। এখানে মানসম্মানের ব্যাপার। বলা হয় শরিকদের ভোট নেই। ভোট কী আছে, সেগুলো জেনে-শুনেই তো জোট করা হয়েছে। নতুন করে এসব বলার তো কোনও কারণ নেই।’  

তবে, জোটের বিকল্প কোনও পথ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলবেন আমরা শুনবো। এরপর আমাদের কথা আমরা বলবো। সম্প্রতি সামসময়িক বিষয় ও রাজনৈতিক বিষয় আলোচনায় থাকবে।’

গত নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে ছয়টি আসনে সমঝোতা করে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় নেতা এ কে এম রেজাউল করিম জয়ী হয়েছেন। ওই নির্বাচনে শরিকরা তাদের ছেড়ে দেওয়া ছয়টি আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তা আমলে নেয়নি আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে জোটের মধ্যে এক ধরনের তিক্ততা তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে শরিকদের ১৩টি আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে সাতটিতে জয়ী হন তারা। পরে উপনির্বাচনে আরেকটি আসন পায় ১৪ দলের শরিকেরা। গত সংসদে ১৪ দলের শরিকদের দুজন নারী সংসদ সদস্যও ছিলেন। এবার সংরক্ষিত নারী সদস্য একজন।

শরিকদের বিভিন্ন দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের অনেক দলের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে। সেসব দলের দলীয় প্রধানের কাছে নেতারা প্রশ্ন করছেন, জোটে তাদের গুরুত্ব কমেছে কেন? রাজপথে একসঙ্গে থাকলে সংসদে একসঙ্গে নেই কেন? দলীয় কর্মসূচি নিয়ে শরিকদের অনেকে মাঠে না থাকায়ও নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন দলীয় প্রধানরা। শরিক দলগুলোর নেতাদের মতে, ১৪ দলে থেকে মাঠের রাজনীতিতে শক্তি কমেছে দলগুলোর। এখন আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্ব হারিয়ে অনেকটাই বিপাকে শরিক দলগুলো। তারা এখন দলীয় কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

শরিক দলগুলোর বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে শরিকদের। বিশেষ করে জোটের দায়িত্বে যারা রয়েছেন। এ ছাড়া জোটের অন্য শরিকরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন। আগামী দিনে নিজেদের করণীয় বিষয়ে আলোচনা করছেন। মঙ্গলবার (২১ মে) ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের রাজধানীর বাসায় বৈঠক করেন শরিক দলগুলো নেতার। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, তরিকত ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মোহাম্মদ আলী ফারুক প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কী কী বিষয়ে আলোচনা হবে— এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, বৈঠক বলতে কিছু বিষয়ে নিজেরা পরামর্শ করেছি।

১৪ দলের শরিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, ২০০৫ সালে ১৪ দলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর আগে দলগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল— একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন, সরকার গঠন। সে অনুযায়ী ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং সরকার গঠন হলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তার ব্যত্যয় ঘটে। তখন থেকেই মূলত জোটে টানাপড়েন শুরু হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত জোটের শরিকরা আশায় ছিলেন, তাদের কাউকে না কাউকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হবে। কিন্তু সেটা হয়নি।

জোটের অন্যতম নেতা বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান মনে করেন, যে লক্ষ্য নিয়ে জোট গঠন করা হয়েছিল সেখান থেকে সরে যাওয়া হয়েছে।

রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘১৪ দলীয় জোট যে প্রত্যাশায় আমরা গঠন করেছিলাম এবং যে লক্ষ্য ছিলো, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আন্দোলন, সংগ্রাম করেছি। জোটের শরিকদেরও সরকারের অংশ হওয়া উচিত। এটা আমরা সবাই মনে করি।’

‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডেকেছেন, উনার কথা শুনবো আগে। তারপর আমরা বলবো। ১৪ দলীয় জোটের সরকার বলা হয়, কিন্তু সরকার এখন আ.লীগের। সরকারের মধ্যে ১৪ দলের কেউই নেই। জোট গঠনের সময় যে কথা বলা হয়েছিল যে- আন্দোলন, নির্বাচন, সরকার গঠন আমরা শেয়ারের মাধ্যমে মিলেমিশে করবো। সেই বিষয়টিই আমরা এখনও আশা করি’—বলেন তিনি।

তবে, সম্প্রতি জোটের অস্তিত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জোটনেতারা যে ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন, তারও বিরোধিতা করেছেন কয়েকজন শরিক। যদিও এসব বক্তব্য সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য বলা হয়েছে বলেও মনে করেন তারা। তারা বলছেন, জোটের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো প্রাসঙ্গিক। বিএনপি-জামায়াত কোণঠাসা হলেও শেষ হয়ে যায়নি। জোটের প্রয়োজন নেই— এমন পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। তবে, বিষয়টি নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ কীভাবে জোটের ভবিষ্যৎ দেখতে চাইছে। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (২৩ মে) গণভবনে আ.লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে জোটের শরিক দলগুলোর প্রধানদের বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘জোটনেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কীভাবে ১৪ দলকে পরিচালনা করবেন, এটাই আমরা শুনবো। আমাদের এটাই প্রত্যাশা। তবে, আকাশের চাঁদ চাইলে তো হবে না। উনি ১৪ দলকে কতোটুকু সক্রিয় করবেন, কী করবেন, তা বলবেন। জোটনেত্রী হিসেবে আমরা আশা করি, উনি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য একটি ফর্মুলা দেবেন, যাতে রাজনৈতিকভাবে আমরা অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে পারি।’  

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল দুজন নেতা বলছেন, শরিকরা যদি মনে করেন তাদের গুরুত্ব কম দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি ঠিক নয়। কিন্তু তারা যখন যেভাবে চাইবে বা যে অবস্থানে দেখতে চাইবে— কোনও কোনও পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব না-ও হতে পারে। এজন্য জোট থাকবে না, জোট রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে কি-না, এগুলো বলা শোভনীয় নয়। তাছাড়া গত কয়েক বছরের মাঠের রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কী? ভোট কিংবা রাজপথে তাদের অবস্থান কেমন? খুবই দুর্বল। বারবার জোটের শরিকদের মাঠে অবস্থান তৈরির তাগিদ দেওয়া হলেও তারা গুরুত্ব দেননি। এখন তারা যদি নিজেদের এভাবে গুরুত্বহীনভাবে উপস্থাপন করেন, বিষয়টি দুঃখজনক।

জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘জোট কীভাবে থাকবে, এই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী কীভাবে দেখতে চান; তার বক্তব্য শুনে আমরা নিজেদের বক্তব্য দেব।’

/এনএইচ/

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়