ঢাকা     মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৭ ১৪২৭ ||  ০৪ সফর ১৪৪২

হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান: পঞ্চম পর্ব

ইকরামুল হাসান শাকিল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৩, ২২ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান: পঞ্চম পর্ব

ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা অসানবাজারের উদ্দেশ্যে বের হলাম। অসানবাজার থামেলের ভেতরেই ছোট একটি বাজার। এখানে ভোরবেলা বাজার শুরু হয়। স্থানীয়রা প্রয়োজনীয় সদাই এখান থেকেই করেন। অনেকটা ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোর মতো। শাকসবজি, মাছ-মাংস, ফল, পূজার ফুল, বিভিন্ন মনিহারির দোকানসহ ইত্যাদি কেনাবেচা হয় এখানে।

আমরা যে হোটেলে উঠেছি সেখান থেকে অসানবাজারের দূরত্ব পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। হোটেল থেকে বেরিয়ে গলিপথ ধরে হেঁটে চললাম। এখনো পথে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়নি। স্থানীয় কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে। এই গলিপথ অনেকটা পুরনো ঢাকার মতোই। বাড়িগুলো গায়ের সঙ্গে গা লাগানো, সরু গলিপথ, বাড়িগুলোতে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তবে একটা বিষয় বলতেই হয়- ভোরে এই গলিপথগুলো বেশ নোংরা থাকে! হাঁটার সময় ভালোভাবে লক্ষ্য করে না হাঁটলে পা গিয়ে পড়বে মানুষের মলে বা পঁচা-বাসি ময়লায়। গলির ফাঁকে ছোট ছোট পূজার স্থান। সেখানে দেবদেবীর মূর্তি শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সি নারীরা পূজা দিচ্ছে। আমরা হেঁটে চলেছি আর থামেলের সকাল দেখছি। গলিপথেই চোখে পড়ছে মাংসের দোকান। শূকর আর মুরগির মাংস বেশি দেখতে পেলাম। তবে কয়েকটি দোকানে খাসির মাংসও বিক্রি হচ্ছে। মানুষের ভিড় ঠেলে বাজারের ভেতরে ঢুকে চা পান করে কিছু ফল কিনে আবার হোটেলে ফিরে এলাম।

হোটেলের ক্যান্টিনেই সকালের খাবার খেতে চলে এলাম। অন্য অতিথিরাও এসেছে। প্রায় সব টেবিলেই মানুষ আছে। এক পাশের একটি ছোট টেবিলে আমার দু’জন বসেছি। এখানে বুফে খাবার রাখা আছে। যার যেটা পছন্দ সে নিয়ে খাচ্ছে। আমরাও আমাদের পছন্দমতো খাবার নিয়ে খেলাম। ক্যান্টিনটা বেশ গুছানো। এই হোটেলের মালিক মুহিত ভাইয়ের বন্ধু। তার সঙ্গে কিছু সময় গল্প হলো। গল্প শেষে আমরা আমাদের রুমে চলে এলাম।

আজকের দিনটি কেনাকাটার জন্য পাচ্ছি। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় সব কেনাকাটা শেষ করতে হবে। সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম। এটাই আমার সাত হাজার মিটারের পর্বতে প্রথম অভিযান। আগে যে কয়টি অভিযান করেছি সবগুলোই ছিল ছয় হাজার মিটারের পর্বত। আমার যেসব পোশাক ও ক্লাইম্বিং গিয়ার কেনা ছিল আগে সেগুলো ছয় হাজার মিটারের পর্বতের জন্য। এবার সেগুলোতে হবে না। তাই ভালো মানের অতি-উচ্চতার পোশাক ও গিয়ার কিনতে হচ্ছে। নর্থফেস, মাউন্টেইন হার্ডওয়্যার, শেরপা, ব্ল্যাক ইয়াকসহ নামকরা ব্র্যান্ডশপগুলো থেকে জিনিসপত্র কেনাকাটা শেষ করলাম। অতি-উচ্চতায় সামান্য অবহেলারও সুযোগ নেই। তাই ব্র্যান্ডের জিনিসপত্রই কিনতে হয়। দাওয়া শেরপা জানালেন কটু পর্যন্ত যে যাবো সেজন্য কোনো গাড়ি ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ পূজার ছুটি। আমাদের কাঠমান্ডুতেই অপেক্ষা করা লাগতে পারে। তবে তারা চেষ্টা করছে, যদি গাড়ি ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে রওনা হবো।

রাত ১১টার দিকে দাওয়া শেরপা জানালো গাড়ি পাওয়া গেছে। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বললেন। ভোর ৪টার সময় আমাদের রওনা হতে হবে। রাতেই আমরা সব গুছিয়ে ফেললাম। বাড়তি জিনিসপত্র গুছিয়ে আলাদা ব্যাগে রাখলাম। এখানেই এগুলো রেখে যাবো। আমাদের দু’জনের যে জিনিসগুলো বেসক্যাম্পের আগে প্রয়োজন নেই সেগুলো আলাদা দু’টি ডাফলব্যাগে নিয়েছি। বাকি জিনিসগুলো ব্যাকপ্যাকে নিয়েছি। যেন সহজেই প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতে পারি। ভোর ৪টার মধ্যেই আমরা প্রস্তুতি নিয়ে ক্যান্টিনে চলে এলাম। মিংমা শেরপা ও গাইড ড্যান্ডি শেরপাও চলে এসেছে। আমরা নাস্তা সেরে নিলাম।

এরপর দ্রুত পায়ে রুম থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে বেরিয়ে এলাম। অতিরিক্ত ব্যাগটি মিংমা শেরপাকে দিয়ে দিলাম রেখে দেওয়ার জন্য। যে গাড়ি আমাদের নিয়ে যাবে সেটিও চলে এসেছে। আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। আমাদের সঙ্গে ড্যান্ডি শেরপা যাচ্ছে। সে আমাদের সঙ্গে পুরোটা সময় থাকবে। হিমলুং বেসক্যাম্পে অন্যরা আগেই চলে গেছে। আমরা এখন গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেব। দিনের আলো ফুটে ওঠার আগেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। থামেলের পথে ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলো পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চলছি। কাঠমান্ডু শহর থেকে বেরিয়ে আসতে বেশি সময় লাগেনি। রাস্তা ফাঁকা, নেই কোনো ট্রাফিক জ্যাম। এদিকে দিনের আলোও চারদিক আলোকিত করে দিচ্ছে তার নিজস্ব গতিতে।

আমাদের গাড়ি কাঠমান্ডু-পোখারা হাইওয়েতে এগিয়ে চলছে। শহরের কোলাহল ছেড়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। আমরা যে এখন উচ্চ হিমালয়ান অঞ্চলের পথে সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। যেহেতু আমার দীর্ঘপথ পাড়ি দেব, সেহেতু রাস্তার পাশের ফুয়েল স্টেশন থেকে গাড়িতে তেল নিয়ে নিলেন ড্রাইভার। তরুণ এই ড্রাইভার বেশ হাসিখুশি ও মিশুক। গাড়িতে বসেই গাইড ড্যান্ডি শেরপার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিলাম। তেল নেওয়া শেষ করে আবার গাড়ি চলতে শুরু করলো। এখান থেকেই চোখে পড়ছে মেঘের উপর দিয়ে শ্বেতশুভ্র বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ। যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। পাহাড়ের ঢালে ঢালে গ্রামগুলো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের গা কেটে হাইওয়ে রাস্তা করা হয়েছে। রাস্তার একপাশে সবুজ পাহাড়, আরেক পাশে পাহাড়ি খরস্রোতা ত্রিশুলী নদী। নদীর ওপারে আবার উঁচু পাহাড়। আমরা যে দিকে যাচ্ছি নদীর খরস্রোত সেদিকেই ছুটে চলছে। এই ত্রিশুলী নদীতেই রাফটিং করে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ। আগে একবার এই নদীর মাছ খেয়েছিলাম। এবারো মুহিত ভাইয়ের কাছে মাছ খাওয়ার বায়না করে ফেললাম। ভাই জানালেন যাত্রা বিরতিতে আমার বায়না পূরণ করবেন। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে আমি শীতল বাতাসে শরীর ও মন সতেজ করে নিচ্ছি। ঘণ্টাখানেক পর রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে গাড়ি থামানো হলো। এখানেই আমাদের যাত্রার প্রথম চা বিরতি।

সবুজ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও চড়াই উতরাই পার করে দুপুর ১২টার দিকে আমরা চলে এলাম বেসিশহর। এখান থেকেই আমরা কটুর দিকে চলে যাবো। এই পথটা ভীষণ ভয়ানক! তাই বেসিশহর থেকে টু-হুইলার জিপে যেতে হয়। যে গাড়িতে আমরা এসেছি সেটা ছেড়ে দিলাম। নতুন একটি টু-হুইলার জিপ নেওয়া হলো। দুপুরের খাবার এখানেই খেতে হবে। সামনে আর খাবারের হোটেল নেই। তাই হোটেল গঙ্গাপূর্ণাতে  খাবারের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই সুযোগে আমি বেসিশহরটা ঘুরে দেখে নিলাম। নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে এই বেসিশহর। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে বেসিশহরের দূরত্ব ১৭৯ কিলোমিটার। কাঠমান্ডু থেকে এখানে আসতে বাস, মাইক্রোবাস, ট্যাক্সি, জিপ পাবেন। বেসিশহর হলো নেপালের লামজুং জেলার জেলা সদর ও পৌরসভা। এখানে বিভিন্ন জাতি এবং ধর্মের মানুষ বসবাস করে। তাই তাদের সংস্কৃতিও আলাদা। বেসিশহরের উত্তর পাশ থেকে অন্নপূর্ণা-২, মাছাপুচ্ছ এবং লামজুং দেখা যায়। গন্দাকী নদীর শাখা নদী মার্শিয়ান্দি। এই মার্শিয়ান্দি নদী বেসিশহরের পূর্ব পাশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত। জার্মান ও নেপাল সরকারের যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে মধ্য মার্শিয়ান্দি নদীতে ৭০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এটি নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ২০০৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কামাল দহাল প্রকল্পটি উদ্বোধন করেছিলেন। (চলবে)

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়