ঢাকা     বুধবার   ২৯ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪৩১

প্রকৃতির সান্নিধ্যে লাটাগুড়ি সিটং পাহাড়ে

কেএমএ হাসনাত ও নির্মাল্য রায় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২৩, ১৬ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ১৮:২৪, ১৬ এপ্রিল ২০২৪
প্রকৃতির সান্নিধ্যে লাটাগুড়ি সিটং পাহাড়ে

সমুদ্র টানে না কিন্তু পাহাড় আর বন টানে, বিশেষ করে যারা ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করেন তাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ডুয়ার্স, লাটাগুড়ি, গরুমারা এবং এর আশপাশের এলাকা খুবই জনপ্রিয়। গাছ থেকে নিজ হাতে কমলা ছিঁড়ে খেতে চাইলে সিটং পাহাড়েও যেতে হবে। একবার হলেও ঘুড়ে আসার অনুরোধ করবো। 

গত জানুয়ারির শেষ দিকে হিলি বর্ডার দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। বাংলাদেশ ও ভারতীয় বর্ডার কর্তৃপক্ষকে শুরুতেই ধন্যবাদ জানাতে হয় তাদের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বর্ডার ক্রস করে এনবিএসটিসি বাসে রায়গঞ্জ চলে যাই। সেখানে একদিন বিশ্রাম নিয়ে রায়গঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর অভিজিৎ সাহা বাপ্পী, রায়গঞ্জের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গৌতম ঘোষ ও নবাই দত্তসহ আমরা চারজন রাতে শিলিগুড়ি হয়ে কমলাবাগান খ্যাত সিটংয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। নবাই দত্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে লাটাগুড়ি বনের ভেতর দিয়ে যান। রাতের বেলায় বনের পথে নানা ধরনের বন্য জীবের দেখা পাই। তবে ভয়ের বিষয় ছিল- বনের অনেকগুলো জায়গায় বন্য হাতির রাস্তা পাড়াপাড়ের সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড দেখা গেল। বাপ্পী জানাল, এই পথে বন্য হাতির দল যাতায়াত করে। সাবধান না হলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এদিন হাতির পাল আমাদের নজরে পড়েনি।

আমাদের যাত্রার প্রথম লক্ষ্যস্থান সিটং। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে এই পাহাড়ি অফবিটের দূরত্ব ৫৭ কিলোমিটার। কাছেই রয়েছে মংপু। সেখান থেকে এই গ্রামের দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। আর এই পাহাড়ি গ্রামের নাম হলো সিটং। ছবির মত সাজানো পাহাড়ি গ্রাম। পাহাড়ের গায়ে মহানন্দা স্যাঞ্চুয়ারির অরণ্য ভূমি। পাহাড়ি পথ বেয়ে সিটং গ্রামে ঢুকতেই কংক্রিকেটের সেতুর নিচে বড় বড় পাথরের বোল্ডার। আর তারই ফাঁক দিয়ে বয়ে চলেছে তিরতিরে পাহাড়ি নদী। এই পাহাড়ি নদীর নাম রিয়াং। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সাজানো বাড়ি। দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন বাক্স রাখা। এগুলোকে ‘বাক্স বাড়ি’ বললেও খুব একটা ভুল হবে না। আর বাড়ির আনাচে-কানাচে রয়েছে ফুলে ভরা গাছ। প্রতিটি বাড়ির লাগোয়া জমিতে অরগ্যানিক ফসলের বাহার। আর এই অঞ্চলের বাসিন্দা মূলত লেপচারাই।

এই গ্রামে আপনার চোখ জুড়াতে পারে কমলালেবু। আর এই কারণেই এই গ্রামকে অনেকেই বলে অরেঞ্জ ভিলেজ। দার্জিলিংয়ের যে কমলালেবু জগত বিখ্যাত তার অর্ধেক উৎপাদিত হয় এই সিটংয়ে। পায়ে হেঁটে নিজের মত করে ঘুরে বেড়াতে পারেন এই গ্রামে। গ্রামে পাহাড়ের মাথায় মুকুটের মত শোভা পায় সুপ্রাচীন সুন্দর গির্জা। হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে পারেন সিটং পাহাড়ের ভিউ পয়েন্টে। সেখানেই রয়েছে সুন্দর চার্চ। ১২০ বছরের প্রাচীন এই গির্জা। এক সময় বাঁশের তৈরি গির্জাটি পুড়ে যায়। সম্প্রতি সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পাহাড়ের এই ওপর থেকে সিটং গ্রামের দৃশ্য আরও অপরূপ।

সিটংয়ের অরণ্যে অচিন পাখিদের অবাধ আনাগোনা। বার্ডওয়াচাদের কাছে এক অনবদ্য ঠিকানা এটি। অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীরা রিয়াং নদীর পাড় ধরে সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন জঙ্গলের মধ্যে। পাহাড় ধাপে ধাপে বয়ে যাচ্ছে ঝরনা। সিটংয়ের লেপচা অধ্যুষিত গ্রামে থাকার জন্য রয়েছে হোমস্টে। তাদের আতিথেয়তা আর অরগ্যানিক খাবারের স্বাদ অনেকদিন থেকে যেতে পারে আপনার মনে। উদার প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের মধ্যে সিটংয়ের সেরা উপহার সহজ সরল এই সকল মানুষজনের আন্তরিক আতিথেয়তা।

সিটং থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে নামথিং পোখরি। চাইলে সেখানেও ঘুরে নিতে পারেন। এই পুকুরেই রয়েছে হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডারদের বাস। এগুলো গিরগিটির মত দেখতে লুপ্তপ্রায় প্রাণী। আজও এদের এখানে দেখতে পাওয়া যায়। খুব কাছেই ৩৫০ বছরের প্রাচীন লেপচাদের মাটির বৌদ্ধ গোম্ফা। সুতরাং দু দিনের জন্য অনায়াসে ঘুরে আসতে পারেন এই গ্রামে।

জলপাইগুড়ি জেলার গরুমারা অভয়ারণ্য ডুয়ার্সের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এই বন আয়তনে বেশ ছোট। তার বেশিরভাগ এলাকাটাই আবার মূর্তি, জলঢাকা, ইংডং ও গরাতি নদী দ্বারা প্লাবিত নিম্নভূমি। এই সীমিত পরিসরের মধ্যেও তৃণভোজী বন্যপ্রাণীর বিপুল সম্ভার গরুমারার অহঙ্কার। উপরন্তু বিশ্বে লুপ্তপ্রায় প্রাণী একশৃঙ্গ গন্ডারের এটাই অন্যতম নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল। সর্বশেষ গন্ডার-শুমার থেকে জানা গিয়েছে, তাদের সংখ্যা ১৪। এছাড়াও আছে হাতি, তিন শতাধিক গৌর, হগ ডিয়ার, সাম্বর, বার্কিং ডিয়ার, চিতল, বন্য শূকর, চিতা, সিভেট, বাঁদর, বেজি, মালয়ান জায়েন্ট স্কুইরেল ইত্যাদি। গাছে গাছে সংসার গুছিয়ে বসেছে হরেক প্রজাতির পাখি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধনেশ, হরিয়াল ইত্যাদি। শীতকালে আসে পরিযায়ী পাখির দল। যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় ময়ূর আর বনমোরগ।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৯ সালে গরুমারা প্রথম অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষিত হয়েছিল। তবে সরকারিভাবে অভয়ারণ্যের মর্যাদা পেয়েছে ১৯৭৬ সালে। প্রথম দিকে আয়তন ছিল মাত্র ৮ বর্গ কি.মি.। বর্তমানে আয়তন বেড়ে হয়েছে ৭৯ বর্গ কি.মি.। প্রাণী বৈচিত্রের মতো বৃক্ষ বৈচিত্রেও গরুমারা মৌলিকত্ব দাবি করতে পারে। একদিকে যেমন আছে হাতির বাস উপযোগী বড় বড় গাছের অরণ্য, তেমনই অন্যদিকে গন্ডারের বিচরণক্ষেত্র বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। বনভূমির অপেক্ষাকৃত উচ্চাংশে শালের সঙ্গে চিলৌনি, বহেড়া, ওদাল, জিওর, কাটুস, চিকরাশি, লালি, সিধা ইত্যাদি বৃক্ষ চোখে পড়ে। নদীবিধৌত নিম্নভূমিতে গড়ে উঠেছে নদীভিত্তিক অরণ্য, তার বেশিরভাগ অংশজুড়ে শিমূল, শিরীষ আর খয়ের গাছের রাজত্ব। বাকি অংশে নলখাগড়া আর উলুঘাস। বনভূমির বুক চিরে বয়ে গিয়েছে মূর্তি, গরাতি, ইংডং ইত্যাদি নদী।

গরুমারা অরণ্যে বন্যজন্তু পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে কয়েকটা ওয়াচ টাওয়ার ও ভিউপয়েন্ট। গরুমারা দর্শনের জন্য জিপ ভাড়া করতে হবে নিকটবর্তী বড় জনপদ চালসা বা লাটাগুড়ি থেকে। ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে অবস্থিত জায়গা দু’টি থেকে অরণ্যের মধ্যস্থল মোটামুটিভাবে ১২ কিমির মধ্যে। বনে বেড়ানোর জন্য গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। রেলপথে সরাসরি মালবাজার পৌঁছে গরুমারা দর্শন করাই সব থেকে ভালো। গরুমারা দর্শনের অনুমতি ও গাইড নিতে হয় লাটাগুড়ি প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র থেকে। এটি একটি সংগ্রহশালাও বটে। বনবিভাগ পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে এই অরণ্য ও তার বাসিন্দাদের সাধারণ পরিচয়মূলক একটি প্রদর্শনী। ভোর ছ’টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সংগ্রহশালা খোলা থাকে। মাঝখানে বেলা দশটায় এক ঘণ্টা বন্ধ। বৃহস্পতিবার বনবিভাগের অফিস বন্ধ থাকে। অফিস থেকে অরণ্যে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় দিনে চারবার। আর একটা কথা মনে রাখবেন, গরুমারা জাতীয় উদ্যান ১৬ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে।

বনভ্রমণে বেরিয়ে প্রথমেই যাওয়া যায় যাত্রাপ্রসাদ ওয়াচ টাওয়ারে। এখান থেকে দেখা যায় খাদের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইংডং নদীর অপূর্ব দৃশ্য। ভোরবেলা কিংবা সন্ধের ঠিক আগে সেখানে বন্যপ্রাণীদের চরে বেড়াতে দেখা যায়। এই টাওয়ারের এক কি.মি.র মধ্যে গরুমারা বনবাংলো। উত্তরমুখী দোতলা বাংলোটি সুদৃশ্য। বাংলোর সামনে লন। তার একাংশে ফুলবাগান। বাংলো-চত্বরের শেষপ্রান্তে রাইনো পয়েন্ট। খাদের উপরে নাতিউচ্চ বেদির উপরে ছাউনিটা যেন ঝুলে রয়েছে। নিচে বহু দূর পর্যন্ত বনভূমি, খানিক দূরে মূর্তি নদী, দিগন্তের কাছাকাছি বালাসন। আর সামনেই ইংডং নদীর এক মনোরম বাঁক। নদী না বলে নালা বলাই ভালো। ইংডংয়ের ওপারে নুনের ঢিপি। রোজ বিকেল থেকেই সেখানে নুন চাটতে ভিড় জমায় বন্যপ্রাণীর দল। এর পাশেই বৈদ্যুতিক তারের বেড়া দেওয়া ঘাসজমি। মেঘহীন নীলাকাশের দিনে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ পূর্ব হিমালয়ের নামজাদা সব তুষারশৃঙ্গ পরিষ্কার দেখা যায়।

মূর্তি নদী পার হয়ে গরুমারা অরণ্যের আরও গভীরে প্রবেশ করা যায়। তার জন্য বনবিভাগের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। সেখানে গরাতি নদীর ধারে গরাতি ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে রাত্রিযাপন জীবনের এক বিরল অভিজ্ঞতা। গরাতি হলো একশৃঙ্গ গন্ডারের খাসতালুক। দিনের বেলাতেও তারা নির্ভয়ে মানুষের কাছাকাছি চলে আসে। জিপে টাওয়ারের নিচ পর্যন্ত চলে আসা যায় মূর্তি নদী পার হয়ে।

শিলিগুড়ির পিসি মিত্তাল বাসস্ট্যান্ড থেকে মালবাজার, চালসা হয়ে লাটাগুড়ি যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। দূরত্ব প্রায় ৭৫ কি.মি.। জলপাইগুড়ি থেকে চালসা, মালবাজারগামী বাসও লাটাগুড়ির উপর দিয়ে যায় এবং মালবাজারে স্টেশন থেকে সরাসরি গাড়ি পাওয়া যায়। তবে কয়েকজন সঙ্গী হলে রেন্ট-এ-কার নিয়ে ভ্রমণ করাই ভালো। এতে অনেক কিছু উপভোগ করা যায়। (আগামী পর্বে সমাপ্য)

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়