ঢাকা, শুক্রবার, ১ পৌষ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

লালমনিরহাটে শুধু পানি আর পানি

মোয়াজ্জেম হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-১৩ ১:১৯:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১৩ ৭:২৬:২৭ পিএম

লালমনিরহাট প্রতিনিধি : চারদিকে পানি আর পানি। ৪টি বাঁধ ভেঙে ইতিমধ্যেই পানিতে গ্রাস করেছে লালমনিরহাটের অধিকাংশ এলাকা। আর মাত্র তিন কিলোমিটার এলাকা তলিয়ে গেলেই পুরো লালমনিরহাট তলিয়ে যাবে ।

বাঁধ ভেঙে যাওয়া এলাকাগুলো হচ্ছে, ধরলার মোগলহাটের বুমকা, ইটাপোতা, কুলাঘাটের শিবের কুটি ও তিস্তা ব্যারাজের আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন ‘ফ্লাড বাইস’ মহাসড়ক।

লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। আজ সকাল থেকে তিস্তা ব্যারাজের উজানে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তায় সর্বোচ্চ পানি প্রবাহ ৫২ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার। কিন্তু বিপদসীমার ৫২ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার ছাড়িয়ে বর্তমানে ৫৩ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। যা সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহের তুলনায় ১০ সেন্টিমিটার বেশি। পানি আরো বাড়তে পারে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে। ফলে সার্বিক হুমকির মুখে পড়েছে তিস্তা ব্যারাজ।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় লালমনিরহাট সদর, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। এছাড়াও আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, কালীগঞ্জের ভোটমারী, তুষভান্ডার ও কাকিনা ইউনিয়নেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এই অবস্থা তিস্তা ব্যারাজ স্থাপনকাল থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পানি পরিমাপক) উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশীদ।

তিনি বলেন, ‘তিস্তা ব্যারাজের সামান্য ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া বড় ধরনের কোন আশঙ্কা নেই। তবে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী বাজার থেকে তিস্তা ব্যারাজের আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন ‘ফ্লাড বাইস’মহাসড়কটি ভেঙে গেছে। ফলে নীলফামারীর সাথে লালমনিরহাটের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে লালমনিরহাট পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হকের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টসহ সর্বত্র ২৪ ঘন্টার জন্য পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বন্যা এলাকায় মেডিকেল টিম কোথাও চোখে পড়েনি। 

সরজমিনে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ী ঢলে লালমনিরহাটের ধরলা, তিস্তা ও সানিয়াজান নদীসহ ছোট-বড় নদ-নদীতে পানি অনেক বেড়েছে। বিগত ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানালেন স্থানীয় কয়েকজন বৃদ্ধ । গত তিন-চারদিন ধরেই রোপা আমন ক্ষেত পানির নিচে রয়েছে। লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকার পুকুরের মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে। সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে।

লালমনিরহাটের স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি আবদুর রব সুজন বলেন, ‘ধরলা নদীর মোগলহাটের বুমকা, ইটাপোতা ও কুলাঘাটের শিবের কুটি এলাকা ভেঙে শহরে পানি ঢুকে পড়েছে। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল অবস্থা তার চেয়েও খারাপের দিকে যাচ্ছে। শিশুরা অভুক্ত ও ভেজা কাপড়ে বসবাস করছে।’

হাতীবান্ধা উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন জানান, ‘তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণকাল থেকে এমন বন্যা আর কখনো হয়নি।’

 



তিনি বলেন, ‘শনিবার সারারাত ঘুমাতে পারিনি। তিস্তা পাড়েই ছিলাম। চোখের সামনে স্থানীয় লোকজনের ঘরবাড়ি-গাছপালা নদী গর্ভে বিলীন হতে দেখেছি। এমনকি রাতের মধ্যে তিস্তা ফ্লাড বাইপাস মহাসড়কটি ভেঙে গেছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার ক্যাম্প ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। নীলফামারীর সাথে লালমনিরহাটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চারদিকে পানি আর পানি এবং অনাহারী লোকজন। কী হবে আর কী করবো বলতে পারছি না। বিষয়টি স্থানীয় স্থানীয় সাংসদ মোতাহার হোসেন এমপিকে অবহিত করা হয়েছে। তিনিও ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পথে রওয়ানা হয়েছেন।’

তিস্তা ব্যারাজ অবস্থিত হাতীবান্ধার গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান বলেন, ‘অনাহারে থাকা লোকজনের আশা যেন তিস্তার বানের পানিতে মিশে গেছে। টানা বৃষ্টিপাতে এসব লোকজন ভেজা কাপড়েই দিন-রাত কাটাচ্ছে। খোলা আকাশের নিচে থাকা লোকজনের অবস্থা আরো বেশি খারাপ। কোথাও মেডিকেল টিম নেই। এসব লোকজন নিয়ে কী করবো বুঝতে পারছি না। প্রশাসনের দু’ একজন কর্মকর্তাকে দেখা গেলেও তারা খালি হাতে চুপি চুপি চলছেন।’

এদিকে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম জানান, ‘ধরলার প্রবেশপথ বুড়িমারী ও তিস্তার প্রবেশপথ দহগ্রাম ইউনিয়নসহ গোটা উপজেলা বন্যায় তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু পানি কোথাও কোমর পানির মধ্যে লোকজন বসবাস করছেন। বিষয়টি লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সাংসদ মোতাহার হোসেন এমপিকে অবহিত করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণের প্রচেষ্টা চলছে।’

লালমনিরহাট জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান বলেন, ‘বন্যা কবলিত লোকজনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন এমপি, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী লালমনিরহাট-২ আসনের সাংসদ নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি এবং লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনের সাংসদ আবু সাঈদ মোঃ দুলালকে বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। তারাও বিষয়টি নিয়ে ঢাকায়  মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ করছেন।’

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক সফিউল আরিফ বলেন, ‘ত্রাণ বিতরণের চেয়ে এখন বন্যা কবলিত এলাকার জনসাধারনকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়াই জরুরী হয়ে পড়েছে। এ কাজটিও চলছে, ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্যগণকেও অবহতি করা হয়েছে।’



রাইজিংবিডি/লালমনিরহাট/১৩ আগস্ট, ২০১৭/মোয়াজ্জেম হোসেন/শাহ মতিন টিপু 

Walton
 
   
Marcel