ঢাকা, রবিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

দুই শিশুর কান্নায় হাইকোর্টে আবেগঘন পরিবেশ

মেহেদী হাসান ডালিম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২৫ ৬:১১:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-২৭ ১২:২২:২১ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাবা-মায়ের সংসার জোড়া লাগাতে ১২ বছরের শিশু ধ্রুব ও ৯ বছরের শিশু লুব্ধক  অঝোরে কাঁদছে। তাদের কান্না দেখে কাঁদছেন স্বয়ং বিচারপতি ও এজলাস কক্ষে উপস্থিত শতাধিক আইনজীবী ও সাংবাদিক।

সোমবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ দৃশ্যের অবতারণা হয়।

জানা যায়, শিশু দুটির মা কামরুন্নাহার মল্লিকা রাজশাহীর মেয়ে, বাবা মেহেদী হাসান মাগুরার এক গ্রামের ছেলে। মল্লিকা ঢাকায় গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে এবং  মেহেদী ঢাকা কলেজে পড়েছেন। পড়ালেখা করা অবস্থায় দুজনের পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেম। অতঃপর দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে। এরপর তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন শুরু। দুজনের ঘর আলোকিত করে আসে দুটি ফুটফুটে সন্তান। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ায় হয় দুই ছেলেকে।  পড়ালেখা শেষ করে বাবা একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, মা একটি প্রাইভেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকতা করেন।

মল্লিকা ও মেহেদী দম্পতি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। ভালোই চলছিল  সংসার জীবন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য ঘটে। এর পরিণতিতে ২০১৭ সালের ১২ মে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। মেহেদী হাসান স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার এক সপ্তাহ আগে দুই সন্তানকে গ্রামের বাড়ি মাগুরাতে পাঠিয়ে দেন। শিশু দুটিকে তাদের ফুফুর তত্ত্বাবধানে মাগুরার জেলা শহরের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়।  বাবা ঢাকার উত্তরায় থাকলেও তার ব্যক্তিগত গাড়ি সন্তানদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেন।

মাগুরাতে বড় হচ্ছিল শিশু দুটি। এই এক বছর মা ও সন্তানের মধ্যে দেখা হয়নি। মা কামরুন্নাহার মল্লিকার অভিযোগ, সব রকম চেষ্টা করেও শিশু দুটির ফুফুর কারণে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিজের হেফাজতে নেওয়ার জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন তিনি।

কামরুন্নাহার মল্লিকা তার দুই সন্তানকে নিজ হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে গত ২৯ মে আদালত শিশু দুটিকে হাইকোর্টের হাজির করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও শিশু দুটির বাবাকে নির্দেশ দেন। ২৫ জুন তাদের হাজির করতে বলা হয়।  একই সঙ্গে সন্তানকে কেন মায়ের হেফাজতে দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত। সেই নির্দেশ মোতাবেক শিশু দুটিকে আজ আদালতে হাজির করে পুলিশ। এছাড়া শিশু দুটির বাবা-মা, মামা, নানি ও ফুফুসহ আত্মীয়-স্বজনরা আদালতে হাজির হন।

সকালে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। শুনানির এক পর্যায়ে শিশু দুটির বক্তব্য শুনতে চান আদালত। দুই শিশুর মধ্যে বড়জন সালিম সাদমান ধ্রুব আদালতকে বলেন, আমরা আর কিছু চাই না, বাবা-মাকে একত্রে দেখতে চাই।

শিশু দুটির বক্তব্য শুনে আদালত ফের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। এ সময় মায়ের পক্ষের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে বলেন, একটা বছর ধরে মা তার সন্তানকে দেখতে পাচ্ছেন না। আজকে যখন কোর্টে হাজির করা হয়েছে তখনো শিশুর ফুফু মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বাধা দিয়েছে। এ সময় তিনি সন্তানদের সঙ্গে মায়ের কথা বলার সুযোগ চান। পরে আদালতের অনুমতি পেয়ে ছেলেদের কাছে এগিয়ে যেতেই মা দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করেন। এ সময় ছেলেরাও দীর্ঘদিন পর মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। বড় ছেলে তখন হাত বাড়িয়ে বাবাকেও  ডাকতে থাকে। ছেলে বলতে থাকে, বাবা, তুমি এসো। তুমি আমার কাছে এসো। আম্মুকে সরি বলো। এ সময় বাবাও এগিয়ে এলে আদালতের ভিতর এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। বাবা-মা এবং তাদের সন্তানদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্য দেখে বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ সকলের চোখে পানি চলে আসে। দীর্ঘ এক বছর পর বাবা-মাকে একসঙ্গে পেয়ে ছেলেদের কান্না সকলের বিবেককে নাড়া দেয়।

এ সময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক আবার ওই শিশুদের ডেকে নেন। সঙ্গে মাকেও কাছে ডাকেন। আদালত বলেন, এ দৃশ্য দেখেও কি আপনাদের মন গলে না? আপনারা কি সন্তানের জন্যও নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারবেন না? সামনে তাকিয়ে দেখেন, আপনাদের এ দৃশ্য দেখে সকলের চোখেই পানি  চলে আসছে।

এ সময় আদালতে উভয় পক্ষের আইনজীবীসহ শতাধিক আইনজীবী দাঁড়িয়ে সমস্বরে সন্তানদের বিষয়টি চিন্তা করে বাবা-মাকে মেনে নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে সন্তানদের চাওয়া অনুযায়ী তাদের দাম্পত্য জীবন যাতে বজায় থাকে এ সেরকম একটি আদেশ দেওয়ার দাবি জানান। 

পরে আদালত দুই শিশু এবং তাদের বাবা-মা, নানি ও ফুফুকে আদালতের এজলাসের কাছে ডেকে নেন। এ সময় একে একে প্রত্যেকের বক্তব্য শোনেন। পরে আরো বিস্তারিত জানতে চেম্বারে ডেকে নিয়ে বাবা ও মা’র একান্ত বক্তব্য শোনেন। তাদের বক্তব্য শুনে আদালত মধ্যাহ্ন বিরতির পর আদেশ দেন।

আদালত আদেশে বলেন, আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত শিশু দুটি মায়ের হেফাজতে থাকবে। তবে এই সময়ে পিতা শিশু দুটির দেখাশোনা করার অবারিত সুযোগ পাবেন। আগামী ৪ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করে শিশু দুটিকে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি মুলতবি করেন।

আদালতে শিশু দুটির বাবার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল। মায়ের পক্ষে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। সঙ্গে ছিলেন এ কে এম রিয়াদ সলিমুল্লাহ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ জুন ২০১৮/মেহেদী/রফিক

Walton Laptop
 
     
Walton