ঢাকা     বুধবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ১২ ১৪২৮ ||  ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিজয়ের শুরু পঞ্চগড় থেকেই

আবু নাঈম, পঞ্চগড় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০০:৫১, ৩ ডিসেম্বর ২০২১  
বিজয়ের শুরু পঞ্চগড় থেকেই

বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইখুল ইসলাম।

মানচিত্রের প্রথম জেলা পঞ্চগড়। স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রথম বিজয় অর্জন করে এই জেলাটিই। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর হলেও নভেম্বর মাসের ২৯ তারিখেই পাক হানাদাররা পরাজিত হয়ে পিছু হটে। সেদিনই মুক্ত হয় পঞ্চগড়।

বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) বিকেলে পঞ্চগড় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়ামে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মহাসমাবেশ হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ. ক. ম মোজাম্মেল হক।

মহাসমাবেশে পঞ্চগড় মুক্ত হওয়ার আগের সময়গুলোর স্মৃতিচারণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইখুল ইসলাম। তিনি সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার।

স্মৃতিচারণ করে সাইখুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর আমরা মরহুম অ্যাড. সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিই। তখন পঞ্চগড় কোন প্রশাসনিক জেলা ছিলো না। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করতে পঞ্চগড়কে সাংগঠনিক জেলা ঘোষণা করা হয়েছিলো। 

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত পঞ্চগড় মুক্ত থাকলেও ১৭ এপ্রিল পঞ্চগড়ের পতন হয়। এদিন পাক হানাদার বাহিনী সড়ক পথে পঞ্চগড়ের দিকে অগ্রসর হয় এবং পঞ্চগড় দখল করে নেয়। তখন আমরা মুক্তিকামী আপামর জনতা ছুটে যাই মু্ক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়ায়। পরে অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম তেঁতুলিয়ায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পথে হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করেন। 

১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হবার সঙ্গে সঙ্গেই এই জেলাটিকে ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে করা হয়। এই সেক্টরে অধিনায়ক ছিলেন এম. কে বাশার। এদিকে, ১৭ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনী গঠনের পর আমরা তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটা মেসেজ পাই। 
তিনি মিত্র বাহিনীকে হুকুম দিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একত্রিত হতে। দীর্ঘ সাত মাস যুদ্ধ চলার পর মুক্তি ও মিত্রবাহিনী পর্যায়ক্রমে পাক হানাদার বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে ২১ নভেম্বর অমরখানা, ২৪ নভেম্বর জগদল লাল স্কুল, ২৫ নভেম্বর জগদলহাট, ২৬ নভেম্বর শিংপাড়া, ২৭ নভেম্বর তালমা, ২৮ নভেম্বর পঞ্চগড় সিও অফিস এবং ওই একই দিনে আটোয়ারী ও মির্জাপুর মুক্ত করা হয়। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা সায়খুল ইসলাম বলেন, ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত পাকবাহিনীদের দখলে থাকা সব জায়গা মুক্ত করার পর বাকি ছিলি পঞ্চগড় সুগার মিল। এটা ছিলো পাকিস্তানী আর্মিদের একটি বড় ঘাটি। পরে ২৯ নভেম্বর এই সুগার মিল মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। সকাল ৬টা থেকে চেষ্টা চালিয়ে বিকেল ৩টার দিকে সুগার মিলকেও সম্পূর্ণ মুক্ত করা হয়। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, সুগার মিল মুক্ত হবার পরও সেখানে দেখা যায় একটি পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। এই পতাকা নামাতে গিয়ে আমাদের এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। তার হারুন অর রশিদ রবি। রবি যখন দেয়াল পার হয়ে পাকিস্তানি পতাকা নামানোর চেষ্টা করছিলো তখন সেখানে একজন খান সেনা নিহত অবস্থায় এবং দুই জন আহত অবস্থায় পড়ে ছিলো। যাদের পাশেই ছিলো চাইনিজ রাইফেল। 

রবি যখন পাকিস্তানি পতাকা অর্ধেক পর্যন্ত নামিয়েছে ঠিক তখনই আহত এক খান সেনা তাকে উদ্দেশ্য করে রাইফেলের গুলি ছুড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান রবি। কিন্তু আফসোস রবির লাশটি আমরা পঞ্চগড়ে দাফন করতে পারিনি। ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন মেজর শের্কী বলেছিলেন, রবি আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তাকে আমি আমাদের কোটগছে নিয়ে যাবো। সেখানেই তাকে দাফন করা হবে। 

এভাবেই মুক্ত হয় আমাদের পঞ্চগড়। পরে পাকিস্তানিরা পিছু হটে অবস্থান নেয় বোদা উপজেলার ময়দানদিঘীতে। পরে ১ ডিসেম্বর বোদা উপজেলাও মুক্ত করা হয়।

/এনএইচ/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়