Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ১০ ১৪২৮ ||  ০৯ রমজান ১৪৪২

চাঁদপুরের ১২ হিমাগারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঢুকছে আলু

অমরেশ দত্ত জয় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৩:০১, ৫ মার্চ ২০২১  
চাঁদপুরের ১২ হিমাগারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঢুকছে আলু

চাঁদপুরের ১২ হিমাগারে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাজার হাজার বস্তা আলু ঢুকছে। আর এতে করে প্রায় ২৮ হাজার অসহায় আলু চাষী এসব সিন্ডিকের কাছে জিম্মি হয়ে কম দামে আলু দিতে বাধ্য হচ্ছে। আর এই সুযোগে হিমাগারগুলোও যে যা পারছে ভাড়া হাঁকাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃষকরা অধিকাংশ হিমাগারে সরাসরি আলু রাখতে পারছে না। কেননা হিমাগারগুলোতে ভাড়া রাখা হচ্ছে তুলনামূলক বেশি। আর তাই আলু চাষীরা সিন্ডিকেট চক্র বা দালালদের কাছে জীম্মি হয়েই আলু রাখতে হচ্ছে। পরে ওই সিন্ডিকেট বা দালালরা হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ করছে।

গেল ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবরও নানা অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসন থেকে এ্যাপোলো কোল্ড স্টোরেজকে ৩ হাজার এবং মনোহার খাদী কোল্ড স্টোরজকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, হিমাগারগুলোতে ১৫ দিন পর পর নিচের আলুর বস্তা উপরে এবং উপরের আলুর বস্তা নীচে রাখার নিয়ম। যাতে করে আলু পচন থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু হিমাগার কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এই কাজটি করতে প্রায় হিমাগারগুলোতেই দেখা যাচ্ছে না। 

এদিকে সচেতন কৃষক মহল জানান, ট্রাক থেকে আলু এনে সরাসরি হিমাগারে ঢুকানো হচ্ছে। আর এতে করে অল্প সময়েই আলু পচন ধরছে। এক্ষেত্রে আলু ট্রাক থেকে নামিয়ে বাহিরে ঠাণ্ডা স্থানে কমপক্ষে ৬ ঘন্টা রেখে তারপর হিমাগারে ঢুকানোর কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এছাড়াও যেই পরিমাণ বিদ্যুতের লোডে হিমাগারে আলু রাখার কথা সে পরিমাণ লোডিংয়ে আলু রাখা হচ্ছে না। এমনকি কোন কোন হিমাগারে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি আলু রাখা হয় কিনা সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত!

জেলা মার্কেটিং কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার চাঁদপুর সদরে ৬টি, মতলব দক্ষিণে ৪টি, কচুয়ায় ২টি এবং হাজীগঞ্জে ১টি হিমাগার রয়েছে। তবে চাঁদপুর সদরের ১৫০০ মে. টন ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন ইচুলী রোডের আইচ এন্ড কোল্ড স্টোরটি বন্ধ রয়েছে।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান মিয়াজী জানান, ২০২০-২১ অর্থবছরে জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিলে ৮ হাজার হেক্টর। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লক্ষ ৭৬ হাজার মেট্রিক টন। যার হেক্টর প্রতি ফলন ২২ মেট্রিক টন ধরা হবে। তবে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৩৫ হেক্টর। এই হিসেবে এবার ২ লক্ষ ২০ হাজার ৭'শ ৭০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচাকল মো. জালাল উদ্দিন জানান, জেলা কৃষি অধিদপ্তর হতে কৃষকরা যথা সময়ে সার ও বীজ পাওয়ায় এবার আলুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এবার জেলায় মাল্টা, কার্ডিনাল, পেট্রোনিক, এস্টোরিক্স এবং ডায়মন্ট জাতের আলুর মধ্যে ডায়মন্ট আলুটির ফলন বেশি ভালো হচ্ছে। জেলায় মতলব দক্ষিণে এবছর সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হবে বলেও আশা রাখছি। 

এদিকে সরজমিনে বেসরকারিভাবে পরিচালিত বেশ কয়েকটি হিমাগার ঘুরে জানা গেছে, হিমাগারগুলোতে সর্বমোট ৮০ হাজার ৫'শ মেট্রিক টন আলু রাখার জায়গা রয়েছে। ইতিমধ্যে খাওয়ার আলু ও বীজ আলু হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ শুরু হয়েছে। যা ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হলেও চলবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। 

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মান্নান কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক দিলীপ কুমার সাহা জানান, তাদের হিমাগারে ৭ হাজার মেট্রিক টন আলু ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এখানে কোন অনিয়ম নেই। এমনকি ধারণ ক্ষমতার বেশি আলুও রাখা হয় না। 

চাঁদপুর পৌরসভা এলাকার মোনহর খাদি কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার রুহুল আমিন সিদ্দিক জানান, ৮ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন তাদের হিমাগারটি। যা ৫০ কেজির পাটের বস্তায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার বস্তা। গেল বছর ৯৩ হাজার বস্তা আলু পেয়েছিলাম। গেল ২৬ ফেব্রুয়ারি হতে আলু উঠতে শুরু করেছে। এবার ১ লক্ষ ৩০ হাজার বস্তা পাবো বলে আশা করছি। তবে লোক সংকটে কিছু ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে। 

চাঁদপুর পৌর এলাকার বীজ আলু সংরক্ষণের জন্য বিখ্যাত এ্যাপোলো কোল্ড ষ্টোরেজের ম্যানেজার মাহমুদ আলী শেখ, পরিচালক আব্দুল ওহাব মিয়া এবং শাখাওয়াত হোসেন শাকিল জানান, তাদের হিমাগারটি ১০ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন। যা ৫০ কেজির পাটের বস্তায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার বস্তা। ২৫শে ফেব্রুয়ারী হতে আলু উঠানো শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণের জন্য উঠানো হয়েছে। আর এই হিমাগারে কোন অনিয়মের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক কমিটি চাঁদপুরের সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা অজিত সাহাসহ আরো অনেকে বলেন, চাঁদপুরে আলু সংরক্ষণের হিমাগার আরো কয়েকটি বাড়ানো দরকার। সেই সাথে সবজি হিমাগার তৈরি হলে আরও ভালো হয়। কেননা শাহরাস্তি, হাইমচর, মতলব উত্তর ও ফরিদগঞ্জে সম্ভবত এখনো কোন হিমাগারই নেই। অতচ ১ মালিকেরই ৩/৪টি হিমাগার রয়েছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। তাই বলবো, কৃষকরা যাতে সরাসরি হিমাগারে আলু রাখতে পারে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

৪ঠা মর্চ বৃহস্পতিবার এ ব্যপারে জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এন এম রেজাউল ইসলাম জানান, জেলায় আলু উৎপাদনের হার অনুযায়ী পর্যাপ্ত হিমাগার নেই। তবুও আলু কি দামে ক্রয় করছে এবং কি দামে বিক্রি হচ্ছে সেদিকে নজর রাখছি। বাজারে আলুসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। 

চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দাউদ হোসেন চৌধুরী বলেন, হিমাগারগুলোর অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা/আমিনুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়