ঢাকা     সোমবার   ২৮ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪২৯ ||  ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

প্রধান শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ

শাহীন আনোয়ার, মাগুরা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১১, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৭:৪৪, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
প্রধান শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ

প্রতীকী ছবি

মাগুরায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী, আয়া, অফিস সহায়ক ও ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ চলছে।

এসব নিয়োগে একটি পদের জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণ না হলেও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেছে শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।

গত ২৬ আগস্ট জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল রাইজিংবিডি ডট কমে ‘মাগুরায় স্কুলের নিয়োগ পরীক্ষায় ৪৯ লাখ টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউনিয়নের ধুলজোড়া চুড়ারগাতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

চাকরিপ্রার্থীরা জানান, নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার আগেই জানা যাচ্ছে, কে কোন পদে চাকরি পেতে যাচ্ছে। আবার কখনো টাকা দিয়ে চাকরি না পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করছেন প্রার্থীরা। সাধারণত স্কুল কর্তৃপক্ষ যেসব নিয়োগ দিচ্ছে, সেগুলোতেই এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠছে।

সম্প্রতি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার কাজলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪ জন কর্মচারী নিয়োগে ৩৩ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে। নিয়োগ পরীক্ষার আগেই অভিযোগ তুলেছিলেন স্থানীয় এক ব্যক্তি।

ফল প্রকাশের পর দেখা যায় সেই চার ব্যক্তি নিয়োগ পেয়েছেন। যদিও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও চাকরি পাওয়া ব্যক্তিরা।

মাগুরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযোগ উঠলেও নিয়োগ বাতিল বা স্থগিত হয়নি। বরং নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতনের (এমপিও) জন্য আবেদন করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

গত ১৮ জুন অধ্যক্ষ, সহকারী শিক্ষকসহ ছয় জন নিয়োগ পান শ্রীপুর উপজেলার কাদিরপাড়া সম্মিলনী ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায়। ওই পরীক্ষার পর কাদিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা পরান হোসেন ও তুষার মোল্লা নামের দুই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তাদের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনার কমিটির সভাপতি ৮ লাখ করে টাকা নিলেও চাকরি পাননি তাদের প্রার্থী।

মাদ্রাসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অফিসে দেওয়া চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, পরান হোসেনের স্ত্রী তৃষা বেগমকে আয়া পদে ও তুষার মোল্লাকে নৈশপ্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত রমজানে ৮ লাখ করে টাকা নেন মাদ্রাসার সভাপতি কাদিরপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বিশ্বাস।

যদিও অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন লিয়াকত আলী বিশ্বাস। নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেন মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য আজিজুর রহমান। অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোনও সমাধান পাননি ভুক্তভোগীরা।

আরও পড়ুন: রাইজিংবিডিতে সংবাদ প্রকাশের পর সেই স্কুলের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে আমাদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ খুবই কম। কেবল মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধির জন্য আবেদন করেন, আমরা সেটা মনোনীত করে দেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে অভিযোগ পেলে আমরা কেবল মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধিকে প্রত্যাহার করতে পারি। আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই এসব অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। কারণ, যিনি ঘুষ দেন তিনিও স্বীকার করেন না।’

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বেশ কিছু বিদ্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- বগুড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ধুলজোড়া চুড়ারগাতি পিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পলাশবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রধান শিক্ষক বা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী, আয়া, অফিস সহায়ক ও ল্যাব সহকারী পদের নিয়োগ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

পাঁচ জনের নিয়োগ বোর্ডে থাকেন বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য, মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধি ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। মাদ্রাসার ক্ষেত্রে মাউশির জায়গায় মাদ্রাসা অধিদপ্তরের একজন এবং কলেজের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি থাকেন।

বিভিন্ন নিয়োগ বোর্ডে মাউশির মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে সাধারণত বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি যাদের চায়, তারাই নিয়োগ পান। কারণ, বোর্ডে তারাই তিনজন থাকেন। প্রশ্ন সবাই মিলে করলেও তারা (ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য) কোনও প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দিতে চাইলে তা ঠেকানো যায় না।’

মাগুরা জেলা প্রশাসক আশরাফুল আলম বলেন, ‘সব অভিযোগ শেষ মুহূর্তে আসে। কিছু পরীক্ষা স্থগিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু যতদিন এই নিয়োগ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে, এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের মতো একটা কাঠামো দাঁড় করাতে পারলে এই সংকট দূর হয়ে একটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া আসতে পারে।’

কেআই

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়