বর্ষবরণ উৎসব ঘিরে রঙিন পাহাড়
রাঙামাটি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
বর্ষবরণ উৎসব ঘিরে পাহাড়ি জনপদ এখন উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে
বর্ষবরণ উৎসব ঘিরে পাহাড়ি জনপদ এখন রঙিন ও উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা, বিহু উদযাপনকে কেন্দ্র করে পাহাড়জুড়ে বইছে আনন্দের আমেজ। ফুল ভাসানো, পাঁজন রান্না, প্রার্থনা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণে করছে পাহাড়ের মানুষ।
চৈত্র মাসের শেষ দুইদিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন অনুষ্ঠান পালন করেন তারা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তিনদিন মূল অনুষ্ঠান উদযাপন হলেও পক্ষকালব্যাপী পাহাড়ে উৎসবের রেশ থাকে।
কাপ্তাই হ্রদ ছাড়াও বিভিন্ন নদীতে এবং পাহাড়ি ছড়ায় ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে রবিবার (১২ এপ্রিল) রাঙামাটিতে শুরু হচ্ছে এই উৎসবের মূল আয়োজন। পুরোনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণের এই উৎসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কাছে প্রাণের উৎসব হিসেবেই পরিচিত।
উৎসবের প্রথম দিন রবিবার পানিতে ফুল ভাসানোর পর বাসায় গিয়ে ফুল ও নিমপাতা দিয়ে ঘর সাজান পাহাড়ের তরুণ-তরুণীরা। তারা বৃদ্ধ ঠাকুরদা-ঠাকুরমাকে স্নান করিয়ে তাদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেন। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল পালন করা হয় মূল বিজু। এদিন সকালে বুদ্ধমূর্তি স্নান করিয়ে পূজা করেন চাকমারা।
চাকমাদের বিজুর প্রথম দিনের নাম ফুল বিজু। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ চৈত্রের শেষ দিন থেকে শুরু হয় খাওয়াদাওয়া, অতিথি আপ্যায়নের মূল পর্ব। এদিন, ঘরে ঘরে চলে পাঁজন আতিথেয়তা। বিজু আর পাঁজন এই দুটি শব্দ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিভিন্ন ধরনের সবজি আলু, পেঁপে, গাজর, বরবটি, কচু, লাউ, কাঁচকলা, কচি কাঁঠাল, সজনে ডাটা, বন থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর নানা প্রকারের সবজি কেটে ধুয়ে নিয়ে শুটকি বা চিংড়ি মাছ দিয়ে ঐতিহ্যবাহী পাঁজন তোন বা তরকারি রান্না করেন চাকমা নারীরা। ১১টি পদ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪১টি পদ দিয়ে রান্না করা হয় পাঁজন। এই পাঁজন খেলে শারীরিকভাবে সুস্থ ও রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় বলে বিশ্বাস করেন পাহাড়ের অধিবাসীরা। তাই বছর শেষে নতুন বছরে সুস্থ থাকার প্রত্যয়ে পাঁজন খাওয়া হয়। বিজুর দিনে সাতটি বাসায় পাঁজন খাওয়া শুভ বলে বিশ্বাস করেন চাকমারা।
নতুন বছর বিহারে গিয়ে প্রার্থনা করেন চাকমারা। এদিন ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন থাকে, তেমনি থাকে বিভিন্ন ধরনের পিঠাও। বিন্নি চালের বড়া পিঠা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা-এই তিন জনগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান প্রায় একই ধরনের হলেও মারমা জনগোষ্ঠী নববর্ষে পানিখেলা উৎসবে মেতে উঠেন। মূলত তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে এ পানিখেলা হয়। এসময় বড় কোনো গাছের নিচে প্রদীপ জ্বালিয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়। গৃহপালিত পশুদের বিশ্রাম দেওয়ার রেওয়াজও রয়েছে এদিন। বিজু উৎসব চলাকালে চাকমারা কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করেন না।
১২ এপ্রিল থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা হলেও পাহাড়ে এই উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও মেলাসহ নানা আয়োজন চলতে থাকে এসময়।
বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু-সাংক্রাই-চাংক্রান-পাতা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, “পাহাড়ের বিভিন্ন ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত মেলবন্ধন আছে সেটি তুলে ধরার জন্যই আমরা প্রতিবছর এই আয়োজন করি। প্রতিবছর আমাদের একটি প্রতিপাদ্য থাকে। আমরা আমাদের দাবিগুলোও সরকারের কাছে তুলে ধরি। আমি মনে করি, আমাদের দাবি পূরণের মাধ্যমে পাহাড়ে বসবাসকারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে এবং সরকারেরও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান বলেন, “বাঙালির নববর্ষ এবং পাহাড়ের এই প্রাণের উৎসবগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে পাহাড়ের বুকে এক অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহোৎসব তৈরি করেছে।” তিনি এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
ঢাকা/শংকর হোড়/ইভা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা থমকে গেলেও হাল ছাড়ছে না পাকিস্তান