ইরানের প্রখ্যাত লেখক-নির্মাতা মারজানে সাতরাপি মারা গেছেন
মারজানে সাতরাপি
ফরাসি-ইরানি লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মারজানে সাতরাপি মারা গেছেন। গতকাল (৩ জুন) তার মৃত্যুর খবর জানিয়ে ফ্রান্সের সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে একটি বিবৃতি পাঠায় এই শিল্পীর ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা’। তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।
গত বছরের ৮ এপ্রিল মারা যান মারজানের স্বামী, অভিনেতা-প্রযোজক ম্যাথিয়াস রিপা। এ তথ্য স্মরণ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “স্বামী ম্যাথিয়াস রিপার মৃত্যুর এক বছরের কিছু সময় পর মারজানে সাতরাপি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। অস্কার মনোনীত অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘পার্সেপোলিস’-এর স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত তিনি। কিন্তু তার পরিচয় কেবল একজন চলচ্চিত্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নির্ভীক কণ্ঠ।”
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর কার্যালয় একটি বিবৃতিতে মারজানে সাতরাপির মৃত্যুর খবর ঘোষণা করেছে। এ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “তার মৃত্যু ফরাসি সংস্কৃতির শীর্ষস্থানীয় এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণকে চিহ্নিত করে। তিনি ছিলেন স্বাধীনতাপ্রিয় একজন শিল্পী, যার কাজ সর্বজনীন বার্তা বহন করে। তার কাজ তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিপুল খ্যাতি এনে দিয়েছে।”
১৯৬৯ সালের ২২ নভেম্বর ইরানের রাজধানী তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন মারজানে সাতরাপি। তার শৈশবের শান্ত জীবন বদলে যায় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর। মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রত্যক্ষ করেন, কীভাবে একটি দেশ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। মেয়েদের পোশাক, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার—সবকিছুর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
মারজানে সাতরাপি পরবর্তীতে বহুবার বলেছেন, তার শিল্পীসত্তা মূলত এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে একজন নারীর মূল্য একজন পুরুষের অর্ধেক বলে ধরা হয়। কিন্তু আমি কখনো মনে করিনি যে আমি কম কিছু।”
কৈশোরে ইউরোপে পাড়ি জমান মারজানে সাতরাপি। কয়েক বছর অস্ট্রিয়ায় কাটানোর পর আবার ইরানে ফিরে আসেন। কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন, তার চিন্তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। ১৯৯৪ সালে ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে চলে যান তিনি। প্যারিসে নতুন জীবন শুরু করা সহজ ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয় সংকট তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে। কিন্তু এই সংগ্রামই পরবর্তীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির ভিত্তি হয়ে ওঠে।
গ্রাফিক নভেল পার্সেপোলিস দিয়ে বিশ্বব্যাপী সাতরাপি পরিচিতি পান মারজানে সাতরাপি। এই আত্মজৈবনিক লেখাটিতে নিজের শৈশব, ইরানি বিপ্লব, যুদ্ধ, নির্বাসন এবং পরিচয়ের সংকটকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেন তিনি। বইটি দ্রুত আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে ফরাসি নির্মাতা ভিনসেন্ট পারোনোর সঙ্গে যৌথভাবে বইটির অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র রূপ দেন। সাদা-কালো অ্যানিমেশনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কার জিতে নেয়।
‘পার্সেপোলিস’ সিনেমার সাফল্যের পর থেমে থাকেননি মারজানে সাতরাপি। ২০১১ সালে নির্মাণ করেন ‘চিকেন উইথ প্লামস’। চলচ্চিত্রটি এক সংগীতশিল্পীর জীবন নিয়ে, যে নিজের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র হারানোর পর বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন। ২০১৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘রেডিও–অ্যাকটিভ’। বিজ্ঞানী মেরি কুরির জীবনের ওপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন রোজামুন্ড পাইক।
চলচ্চিত্রের বাইরে সাতরাপি ছিলেন সক্রিয় একজন মানবাধিকারকর্মী। ইরানে নারীদের ওপর নিপীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট এবং রাজনৈতিক বন্দীদের বিষয়ে নিয়মিত সোচ্চার ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘লিজিওন দ’অনর’ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান মারজানে। কারণ হিসেবে ফ্রান্সের ইরান-নীতির সমালোচনা করেন তিনি।
*ভ্যারাইটি অবলম্বনে
ঢাকা/শান্ত
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই