ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ৯ ১৪৩০

বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন পিতৃহারা হয়ে গেলো

সন্দীপন ধর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪৭, ১৮ মার্চ ২০২৩  
বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন পিতৃহারা হয়ে গেলো

নিজ গ্রন্থাগারে সন্দীপ দত্ত

১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের ২১ বছর বয়সী বাংলা বিভাগের ছাত্র সন্দীপ দত্ত কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে পত্র-পত্রিকা সন্ধান করতে গিয়ে সেগুলোর প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাব লক্ষ করেন। কলকাতার সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগারে পত্র-পত্রিকার এই অবস্থা দেখে সন্দীপ দত্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুধু পত্র-পত্রিকার পঠন-পাঠন ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। সেই বছর ২৭ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, তিনি নিজের বাড়িতে ৭৫০টি পত্র-পত্রিকা নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বইমেলায় সন্দীপ দত্ত তার পত্র-পত্রিকার সংগ্রহ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন কলকাতার ১৮/এম টেমার লেনে তার পৈতৃক বাড়ির একতলায় তিনি ‘বাংলা সাময়িকপত্র পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র’ নামে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে গ্রন্থাগারটির সদস্য পদ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিষ্ঠানকে নথিভুক্ত করা হয় এবং নতুন নামকরণ হয় ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’। বর্তমানে এই গ্রন্থাগারের প্রায় ১৫০ জন সক্রিয় সদস্য আছেন।

সন্দীপ দত্ত দেড় হাজার সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা নিয়ে তার গ্রন্থাগার শুরু করেন। বর্তমানে এই গ্রন্থগারে বাংলা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় ৬ হাজারের অধিক সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা ও ২ হাজারের অধিক কাব্যগ্রন্থ আছে। ওই পাঠাগারে সবুজপত্র, কল্লোল, লাঙ্গল, সংহতি, প্রগতি, ময়ুখ, কালি-কলম, পরিচয়, বঙ্গলক্ষ্মী, নবযুগ, ধুমকেতু, নাচঘর, পূর্বাশা, কবিতা, চতুরঙ্গ, অরণি, সমসাময়িক, গল্পভারতী ইত্যাদি দুর্লভ ও বিখ্যাত পত্রপত্রিকা রয়েছে। হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন, ম্যানিফেস্টো, পত্রিকা ইত্যাদি কেবল এই গবেষণাগারে সংরক্ষিত আছে।

২০০০ সালে থেকে তিনি প্রকাশ করেন তার লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা, স্ল্যাঙ্গুয়েজ, ভুবনেশ্বরী, বিবাহ মঙ্গল; ২০০৪ সালে ভাটা, ২০০৫ সালে  বাংলা ভাষা বিতর্ক, ২০০৮ সালে জন্মদিন, ২০০৯ সালে লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা। তার হাত ধরেই আসে একগুচ্ছ লিটল ম্যাগাজিন—পত্রপুট, উজ্জ্বল উদ্ধার, অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন ভয়েস।

তবে শুধু এই লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা বলা হলে অবমূল্যায়ন করা হবে তাকে। আসলে তাকে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম ধারক, পৃষ্ঠপোষক এবং অভিভাবক বলা হলেও অত্যুক্তি করা হয় না এতটুকু। লিটল ম্যাগাজিনের অধিকার, সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্যও যে আজীবন লড়াই করে গেছেন তিনি।

১৯৮২ সাল সেটা। লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে তার গবেষণার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। হতাশ হননি সন্দীপ বাবু। বরং বছরখানেক বাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই আয়োজন করেছিলেন লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও আলোচনা সভার। হাজির করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, পবিত্র সরকার, শুদ্ধসত্ত্ব বসু, বার্ণিক রায়, দেবকুমার বসুর মতো ব্যক্তিত্বদের। না, সকলে সাদরে গ্রহণ করেননি তার এই উদ্যোগ। সুকুমার সেন সাফ জানিয়েছিলেন, লিটল ম্যাগাজিন আসলে জঞ্জাল।

সুকুমারের এই কটূক্তিকেই পরবর্তীতে হাতিয়ার করেন সেন সন্দীপ দত্ত। ‘পত্রপুট’-এর বইমেলা সংখ্যায় বড়ো বড়ো করে ছাপা হয়েছিল ‘জঞ্জাল রাবিশকে প্রশ্রয় দেবেন না’। সঙ্গে ‘লিটল ম্যাগাজিন কিনুন/ লিটল ম্যাগাজিন পড়ুন’ স্লোগানে সাজানো টুপি পরে, বইমেলায় প্রচার শুরু করেন তিনি। বলতে গেলে তার এই অক্লান্ত লড়াই লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদের এনে দিয়েছে দাঁড়াবার প্ল্যাটফর্ম। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া আজকের লিটল ম্যাগাজিন মেলাগুলোও তার আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনীর এক বিবর্তিত রূপ নয় কি?

অবশ্য শুধু পত্রিকাই নয়। একইসঙ্গে লোকশিল্পেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সৃজনশিল্পী সন্দীপ রায়। তার লাইব্রেরিতে গেলেই আন্দাজ পাওয়া যাবে শিল্পরুচির। তাছাড়াও কলকাতার বুকে লেখকব্যাঙ্ক তৈরি, একাধিক ছোটো পত্রিকা ও গ্রন্থের সম্পাদনা, শিক্ষকতা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরব উপস্থিতি তার। অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ বয়সে হাজির হতেন বাংলার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন মেলা, বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের টেবিলে টেবিলে। কাঁপা হাতেই সংগ্রহ করতেন পত্রিকার নতুন সংখ্যা। ইতিহাস, আঞ্চলিক সাহিত্য ও বাংলা ভাষা সংরক্ষণের প্রতি এ এক অকৃত্রিম ভালোবাসাই বটে। এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ অভিভাবকহীন করে তুলল দুই বাংলার সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদের। ছাদ হারালেন ছোটো পত্রিকার সম্পাদক, কর্মী, লেখক ও গবেষকরা।

বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে যদি একটি প্রতীক দিয়ে চিহ্নিত করতে হয়, সেই প্রতীক সন্দীপ দা। জীবন্ত কিংবদন্তি—মৃত্যুর পরেও ‘জীবন্ত’ শব্দটায় জোর না দিয়ে উপায় নেই। কেন-না, তার বিপুল সংগ্রহের আয়ু ফুরোবে না কোনোদিন। যতদিন এই বাংলায় ‘লিটল ম্যাগাজিন’ শব্দদ্বয় উচ্চারিত হবে, নেপথ্যে ওই মানুষটির মুখ ভেসে উঠবে বারবার। বাংলা ছোটো পত্রিকা—নামিদামি বইপত্র থেকে দূরে, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গ্রহের খনিজ নিয়েও যে আর্কাইভ গড়ে তোলা যায়, পাঁচটি দশক আগে টের পেয়েছিলেন সন্দীপ দত্ত। এ আসলে একক মানুষের লড়াইকাহিনি। তিলে-তিলে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছেন একের পর এক দুষ্প্রাপ্য ও সমসাময়িক পত্রিকা। ছোট্ট লাইব্রেরিটি ভরে উঠেছে দিনে-দিনে। যেসব লিটল ম্যাগাজিন স্বল্পায়ু ও অখ্যাত, সেগুলোকেও অমরত্ব দিয়েছেন সন্দীপ দা। আজও তার লাইব্রেরি ঘাঁটলে কোনো-না-কোনো কোণে পাওয়া যাবে অজানা অজস্র পত্রিকার হদিশ। প্রশ্ন হলো, চিনিয়ে দেবেন কে? কে বলবেন সেসব পত্রিকার ইতিহাস?

আমাদের মতো যাদের বাৎসরিক ওঠা-বসা-খাওয়া-আড্ডা ওরফে দিন কাটানোর ঠিকানা নন্দন ও বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন চত্ত্বর, সন্দীপ দা তাদের আত্মার আত্মীয়। কখনো অভিভাবকের মতো পরামর্শ দিয়েছেন, কখনো বন্ধুর মতো মিশেছেন। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, ব্যাকব্রাশ চুল, পরনে প্যান্ট আর টি-শার্ট, কাঁধে ঝোলাব্যাগ—সন্দীপ দাকে একা একা হেঁটে বেড়াতে দেখেছি বিভিন্ন পত্রিকার টেবিলে। থামছেন, পত্রিকা উল্টেপাল্টে দেখছেন, সম্পাদকের থেকে সংগ্রহ করছেন নয়তো কিনে নিচ্ছেন নিজেই। বেশিরভাগ সময়েই সন্দীপ দার সঙ্গী থাকত না কেউ। একমেবাদ্বিতীয়ম তিনি— প্রৌঢ় বয়সেও অদম্য শক্তি। দেখেছি— শিখেছি কি কিছু? লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি তার দায়িত্ব ও শ্রমের উত্তরাধিকার কি আমরা বহন করতে পারব কেউই?

সময় বদলে গেছে। সন্দীপ দত্তের মতো লিটল ম্যাগাজিনের জন্য জীবনপাত করার লোক চারপাশে আর দেখি কই! টেমার লেনের লাইব্রেরিটির ভবিষ্যৎও অজানা। বিপুল ও দুর্লভ সব পত্রিকার দেখভাল করবেন কে এবার? সন্দীপ দত্ত চলে গেলেন। আমাদের কাছে রেখে গেলেন স্মৃতি ও প্রশ্ন। বেশকিছু দায়ও, যা হয়ত পালন করতে পারব না কোনোদিনই। শুধু গর্বের সুযোগ ফিরে ফিরে আসবে— ‘আমরা সন্দীপ দত্তকে চিনতাম।’ এ-ও কি কম প্রাপ্তি?

আসলে লিটল ম্যাগাজিন তার মতো করে কাজ করে, প্রকাশ পায়— তার উচ্চারণে, তার সক্ষমতায় বা নিজস্ব জগতকে কেন্দ্র করে। সেখানে সে সতত স্বাধীন। তথাকথিত প্রতিষ্ঠান ব্যাপারটা এসেছে কিন্তু অনেক পরে। বিশেষ করে সাতের দশকে প্রাতিষ্ঠানিকতা এলো এই জন্যে যে, তখন একটি নির্দিষ্ট বাজারি কাগজ দাপট দেখাতে আরম্ভ করল। যেমন: আমরা যাদের লেখক বলব, তারাই লেখক। এর বাইরে লিটল ম্যাগাজিনের যে সৃজনশীল ধারা, স্বতঃস্ফূর্ত ধারা, সেটা যে ওই গা-জোয়ারিতে খুব একটা প্রভাবিত হয়েছে, তা নয়। কিন্তু, প্রতিষ্ঠানের এই দালালিটা, এই যে সোচ্চারে কণ্ঠস্বরটা তোলা, তার বিরুদ্ধে একটা উচ্চারণ করার জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। আমি বলছি না যে, লিটল ম্যাগাজিনকে ঘোষণা বা উচ্চারণের মাধ্যমে বলতে হবে যে, আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী, তার কাজের মধ্যে দিয়েই সে তার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা প্রকাশ করবে। অর্থাৎ তার কাজগুলোই হবে এমনই। তার মধ্যে তো প্রতিষ্ঠানবিরোধী সত্তা ছিলই, এই অর্থে যে, যদি আমরা ধরে নিই প্রতিষ্ঠান মানে একটা কাগজ, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো একটা অবয়ব, একটা বিশ্ববিদ্যালয় বা এই স্তরের কোনকিছু বা একটা রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশ… যেকোনোভাবে প্রতিষ্ঠানকে যদি আমরা একটা প্রতীক রূপে ধরি, তাহলে তার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিন তার নিজস্ব স্বাধীন সত্তায় থেকে কাজ করে। সে কখনও নতজানু নয়। আমি বলতে চাইছি যে, প্রতিষ্ঠানবিরোধী সত্তা মানেই সব সময় প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে চেয়ে থাকা নয়, বরং এই যে সে তার মতো করে অনেক লেখাকে প্রশ্রয় দিলো, যে লেখাগুলো ওই তথাকথিত বড় কাগজ, বাণিজ্যিক কাগজ কোনোদিনই ছাপতে সাহস করত না। আমি অন্তত সাতের দশকের কথা বলতে পারি, আটের দশকের কথাও বলতে পারি। তারা কতগুলো লেখক, সেই হাউসের লেখক, তারা তো টাকা ঢেলে লেখা ছাপত। কিন্তু তার বাইরে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জায়গা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। যেমন ছয়ের দশকে হাংরি জেনারেশন, বা শাস্ত্রবিরোধী বা ধ্বংসকালীন বা ধরো অটো রাইটিংস…। এরা নিজেদের মতো করে বলতে চাইল যে, এতদিন প্রতিষ্ঠান যা বলছে, তা আর নয়। আমরা প্রাতিষ্ঠানিকতা মানি না। আমরা ছুৎমার্গতা মানি না। আমরা নিজের মতো করে চলি। আমরা বরং তার বিরোধিতা করি। হাংরি জেনারেশন বা এই ধরনের যে আন্দোলনগুলো, সেটা লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে দিয়ে হয়ে গেছে। লিটল ম্যাগাজিন তার মতো কাজ করে, প্রতিষ্ঠান তার মতো কাজ করে। প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একটা বাণিজ্যিক নিজস্ব ধারা, লিটল ম্যাগাজিন একেবারে উলটো দিকে থাকা বিপরীত ধারা, যারা সাহিত্যের জায়গা থেকে নিজস্বতা নিয়ে কাজ করছে। সেখানে কোনো বাণিজ্যিকতার প্রলোভন নেই, সেখানে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক যশপ্রার্থী হওয়ার প্রলোভন নেই, বরঞ্চ সেখানে তার দায় হচ্ছে নতুনভাবে পাঠককে দীক্ষিত করা। ওইভাবে ভাড়াটে লেখক দিয়ে বানানো লেখাকে প্রচারিত করার যে জায়গা, লিটল ম্যাগাজিন তাতে কোনোদিন ছিল না। সেই অর্থে আমি বলতে পারি, লিটল ম্যাগাজিন এবং প্রতিষ্ঠানের যে লেখালেখি সম্পূর্ণ আলাদা… প্যারালাল… এটা আলাদা জায়গা। বিরোধিতা শুধু ওই অর্থে নয়, বিরোধিতার এক অর্থ যে পৃথক সত্তার মধ্যে দিয়েই লিটল ম্যাগ তার কাজ করে চলেছে।

ঢাকা/রফিক

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়