ঢাকা     সোমবার   ২২ জুলাই ২০২৪ ||  শ্রাবণ ৭ ১৪৩১

সংবাদ পাঠিকা থেকে ‘শাড়িওয়ালি’

রাশিদা খাতুন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৫, ৭ জুলাই ২০২৪   আপডেট: ১২:৪৬, ৭ জুলাই ২০২৪
সংবাদ পাঠিকা থেকে ‘শাড়িওয়ালি’

শ্রাবণী জলি, আঁখি ভদ্র

দুইজনেই ছিলেন সংবাদ পাঠিকা। দুইজনেই ছায়ানট থেকে গান শিখেছেন। তারা নাচে পারদর্শী। দুইজনই চাকরি ছেড়েছেন এখন দুইজনই উদ্যোক্তা। লোকে বলে শাড়িওয়ালি। এই শব্দটি কেউ ভালোবেসে বলেন আবার কেউ অবহেলা করেও বলেন। অনেকেই মানতেই চান না যে সাংবাদ পাঠিকার মতো মর্যাদাশীল চাকরি ছেড়ে শাড়ির ব্যাবসা করা যায়! কেউ মানুক আর মানুক, ভালোবাসুক অথবা না বাসুক তারা কিন্তু অদম্য। একটু একটু করে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘ত্রিভো’। ‘অনলাইন’ আর ‘অফলাইন’ দুই মাধ্যমেই এগিয়ে চলছে ত্রিভোর কার্যক্রম। ত্রিভোর প্রতিষ্ঠাতা যে দুই নারী তারা হলেন শ্রাবণী জলি এবং আঁখি ভদ্র।

এই দুইজনকে সামনে থেকে দেখলে যমজ বোনও মনে হতে পারে। দেখতে প্রায় একরকম, কথাও বলেন একইরকম ভাবে। যারা ত্রিভোর ফেসবুক পেইজ (trivo) দেখেছেন তারা তাদের নাচ দেখেছেন এবং গানও শুনেছেন। ত্রিভোর পরিচিতি ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে গেছে তাদের নাচ আর গানের জন্যই। যদিও শুরুতে খুব ভেবে চিন্তে তারা এই কাজটি শুরু করেননি। বর্তমানে যারা পোশাক বিক্রি করেন তারা ফেসবুকে লাইভ করে পণ্যের প্রচারণা চালান। শ্রাবণী এবং আঁখিও সেইরমভাবেই একদিন লাইভ করার সিদ্ধান্ত নেন। যেহেতু দুইজইন নাচ এবং গান জানেন ছন্দে ছন্দ মেলাতে আর তালে তাল মেলাতে তাদের সময় লাগেনি। 
পুরনো বাংলা গানের সঙ্গে নেচে ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিও সম্পাদনা করে ত্রিভোর ফেসবুক পেজে আপলোড দেন। তাদের একটি নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়। গানটি কিংবদন্তী শিল্পী রুনা লায়লা এবং আবিদা সুলতানার গাওয়া ‘আমরাতো বানজারান’।

তাদের এই নাচ স্বয়ং রুনা লায়লাও দেখেছেন, এই শিল্পীর প্রশংসাবার্তাও পেয়েছেন এই দুই উদ্যোক্তা। সেই বার্তা দেন রুনা লায়লার ভাগনি। এতে দুইজনেই অনেক বেশি অনুপ্রেরণা পেয়ে যান। নেচে-গেয়ে শাড়ির প্রচারণাকে মার্কেটিংয়ের নিয়মিত অংশে পরিণত করেন। ক্রেতারা ত্রিভোতে এসে বলতে শুরু করেন ‘যে শাড়ি পরে আপনারা নেচেছেন সেই শাড়ি লাগবে’। অনলাইনেও সেই শাড়ির অর্ডার বেশি আসতে শুরু করে। এরপর একগানে অনেক শাড়ি পরার সিদ্ধান্ত নেন তারা। ক্যামেরা ট্রাইপডে রেখে নাচের দৃশ্যধারণ করেন, তারপর নিজেরাই সম্পাদনা করে ত্রিভোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে থাকেন।
প্রচার বাড়ে, প্রসার বাড়ে। তারাও শাড়ির নকশায় নিজস্ব একটা ধারা যুক্ত করার মনোযোগ দেন। একটু একটু করে তৈরি হতে থাকে ত্রিভোর নিজস্বতা। 

এখানে মূলত নারী এবং মেয়েশিশুদের পোশাক পাওয়া যায়। নানারকম পোশাকের ভিড়ে শাড়ির সংগ্রই বেশি। এসব শাড়ি মূলত তাঁতের। কখনো টাঙ্গাইল কখনো নরসিংদি থেকে আনা হয় দেশীয় তাঁতশিল্পীদের বানানো এসব শাড়ি। 

                             
১০০ জন তাঁতশিল্পী ত্রিভোর সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করছেন
ত্রিভোর শাড়ি ডিজাইন করেন আঁখি ভদ্র এবং শ্রাবণী জলি দুজনে মিলে। এরপর ছুটে যান টাঙ্গাইল কুটিরের খ্যাতিমান তাঁতশিল্পী রতন বসাকের কাছে। যিনি তাঁতগুরু নামেও পরিচিত। তার তত্ত্বাবধানে তাঁতশিল্পীদের সুতা, রং, নকশা ঠিক রেখে তৈরি হয় এক একটি শাড়ি। প্রায় ১০০জন তাঁতশিল্পীর তৈরি শাড়ি স্থান পেয়েছে ত্রিভোর অন্দরে। অনেক সময় তাঁতশিল্পীরাও তাদের করা ডিজাইন আঁখি-শ্রবণীদের দেখান। ডিজাইন পছন্দ হলে সেগুলো নিয়ে কাজ করে ত্রিভো।

ব্যাক টু দ্যা রুটস বা শেকড়ে ফেরা
ত্রিভোর একটি ড্রিম প্রোজেক্ট হচ্ছে ব্যাক টু দ্যা রুট। এই প্রজেক্টের আওতায় তারা পুরনো দিনের অর্থাৎ আশি-একশো বছরের পুরনো কোনো ডিজাইনে নতুন শাড়ি তৈরি করেন। অনেকে তার মায়ের পুরনো শাড়ির অনুরূপ নতুন একটি শাড়ি পাওয়ার আশায় ত্রিভোতে যোগাযোগ করেন। রং, নকশা ঠিক রেখে একইরকম আরেকটি শাড়ি তৈরি করে দেয় ত্রিভো। একই শাড়ি রংয়ে সামান্য পরিবর্তন বা ফেব্রিকে সামান্য পরিবর্তন এনে আরও শাড়ি তৈরি করেন। সেক্ষেত্রে যার শাড়ির নকশা অবলম্বণে নতুন শাড়ি তৈরি হয়-তার নামে নাম রাখা হয় নতুন শাড়িগুলোর।

শ্রাবণী জলি পড়ালেখা করেছেন ক্লোদিং অ্যান্ড টেক্সাটাইল-এ। আঁখি ভদ্র পড়ালেখা করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে। পড়ালেখা আলাদা বিষয়ে হলেও তাঁতের শাড়ির প্রতি দুজনেরই রয়েছে সমান ভালোবাসা। 

আঁখি ভদ্র বলেন, এটিএন নিউজের সিইও মুন্নী সাহা একদিন নির্দেশ দিলেন— সংবাদ পাঠিকাদের তাঁতের শাড়ি পরতে হবে। কোনো শাড়ির দাম ৮০০ টাকার বেশি হওয়া চলবে না। কম দামের শাড়ি পরবেন। যাতে অন্যরা আপনাদের দেখে তাঁতের শাড়ি কেনা এবং পরার উদ্বুদ্ধ হয়। তাঁতিভাইদের জন্য এটুকু করা দরকার, তাঁত শিল্প বিকাশ হওয়া দরকার।– এরপর থেকে সবাই তাঁতের শাড়ি পরতে শুরু করে। আমিও তাই। যেখানে যেতাম তাঁতের শাড়ি সংগ্রহ করতাম। অনেক সময় ভ্যান থেকেও তাঁতের শাড়ি কেনা হতো। ৩০০টাকায় কেনা তাঁতের শাড়ি পরেও নিউজ পাঠ করেছি। পরে এই শাড়ি শুধু অফিসে নয় বাড়িতে কিংবা বেড়াতে গিয়েও পরাতাম। সেই থেকে তাঁতের শাড়ির প্রতি ভালোবাসা গভীর হয়েছে। আমরাও মনে করেছি তাঁতের শাড়ি প্রোমোট করা দরকার। 

ত্রিভোর শাড়ির দরদাম
ত্রিভোতে কটন, সিল্ক, হাফসিল্ক, কোটা— সব ধরনের শাড়িই পাওয়া যায়। কম দামের শাড়ি যেমন আছে তেমনি বেশি দামের শাড়িও আছে। 

ত্রিভোর ম্যানেজার স্বর্ণামনি বলেন, এখানে শাড়ির দরদাম শুরু হয়েছে ১০০০টাকা থেকে। সব্বোচ্চ ২০,০০০ টাকা দামের শাড়িও আছে। তবে বেশিরভাগ শাড়ির দাম ১,০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা।

তিনি আরও বলেন,  এখানে শুধু নারী ক্রেতারাই নন পুরুষ ক্রেতাও আসেন। তারা এসে লাইভের শাড়িটি দেখিয়ে শাড়ি কেনেন অথবা পছন্দ করে শাড়ি কিনে নিয়ে যান। কেউ কেউ শাড়ি কেনার পরে ত্রিপিস, ওয়ান পিস, ব্লাউস, গয়না এগুলোর খোঁজ করেন। চাহিদার কথা মাথায় রেখে এখানে ত্রিভ্রো কিছু ওয়ান পিস, কাফতান, এবং কুর্তি রেখেছে। এছাড়া মেয়েশিশুদের জন্য আছে শাড়ি আর ফ্রক। মেয়েশিশুদের পোশাকের দাম ৫০০টাকা থেকে শুরু হয়েছে।এছাড়া, আলাদা আলাদা তিনটি কর্নারে আলাদা তিনটি প্রতিষ্ঠানের থ্রি-পিস, গয়না এবং ব্লাউস রাখা হয়েছে। এগুলো কেউ নিতে চাইলে গায়ের মূল্য পরিশোধ করে নিতে পারেন।

শ্রাবণী জলি বলেন, আমরা শাড়ি পরলেই অনেকে প্রশ্ন করেন ‘আজকি বিশেষ আয়োজন কিনা’ এমন কেন হবে? শাড়ি পরা এখন আর অকেশনালি থাকছে না। মেয়েরা শাড়ি পরছে। শাড়ি পরেই ঘরে-বাইরে কাজ করছে। আমাদের মায়েরা, দিদারা শাড়ি পরেই সব সামলেছেন। শাড়ি আমাদের পোশাক। বরং উল্টো প্রশ্ন করা যেতে পারে ‘শাড়ি নয় কেন?’। যেহেতু আমরা মনে করি শাড়ি প্রত্যেক দিনের পোশাক, সেইজন্যই অল্প দামের শাড়ি সরবরাহ করার চেষ্টা করছি। তবে অনেক সময় শাড়ির ম্যাটেরিয়ালগুলো বেশি দামের হওয়ায় শাড়ির দামও বেড়ে যায়। আমি বলবো বাংলাদেশের তাঁতশিল্পীদের বোনা শাড়ি যেকোন শাড়িই সুন্দর, যেকোন শাড়িই আমাদের শাড়ি।

নেচে-গেয়ে শাড়ির প্রচারণার উল্টো ফল
অনলাইন অনেকেই বুলিং করেন। শুরুতে শ্রাবণী জলি এসব বুলিং নিতে পারছিলেন না। হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং বলেছিলেন নেচে-গেয়ে লাইভ না করি। আঁখি বললেন, এগুলো উড়িয়ে দিতে হবে। সময় এগিয়েছে তারাও এগুলো উড়িয়ে দিতে শিখেছেন। ব্যবসায়ের অনেকগুলো রিস্ক ম্যানেজমেন্টের এটিও একটি অংশ তাদের কাছে। এখন কেউ খুব কড় কথা বললে ফান হিসেবে নেন। অথবা মন্তব্য ডিলিট করে দেন। 

এখানেই শেষ নয়
চলার পথে সহযোগিতা যেমন পাওয়া যায় প্রতিযোগিতারও কমতি থাকে না। শ্রাবণী জলির হাসবেন্ড ধনঞ্জয় কুমার দাস ত্রিভোর কাজ এগিয়ে নিতে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মাঠে লড়তে হচ্ছে এই দুই জনকেই। জানা গেল, অনেক সময় কারিগররা কথা রাখেন না। ত্রিভোতে যে ডিজাইনের শাড়ি সরবরাহ করেন একই ডিজাইনের শাড়ি অন্য প্রতিষ্ঠানকেও দিয়ে দেন। অথচ চুক্তি থাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে এই ডিজাইন কাউকে দেওয়া যাবে না। প্রতিদিন অনলাইনে শাড়ি-কাপড় বিক্রিতে নতুন নতুন অনেকেই আসছেন। কেউ কেউ চাকরিও করছেন আবার অনলাইন ব্যবসাও চালু রেখেছেন। নতুন পুরোন সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হচ্ছে। তবে টিকে থাকার আনন্দ— সফলতার দিকে নিয়ে যায়। আর সফলতা নতুন করে কাজ করার শক্তি যোগায়।

শাড়ি যখন মনের মতো হয় না
তাঁতশিল্পীকে সব নির্দেশনা দিয়ে আসার পরেও অনেক সময় মনের মতো শাড়ি পাওয়া যায় না। আবার কোনো কোনো ডিজাইনের শাড়িতে ক্রেতারা আগ্রহ দেখান না। এসব শাড়ি রি-মেক করা হয়। দেখা যায় যে হাতে বোনা তাঁতের শাড়িটিতে ব্লক-বাটিকে কাজ করানোর পরেই দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ঠেকে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আনন্দ আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে ত্রিভো। বেশ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ত্রিভোর কাজ, এগিয়ে যাচ্ছেন শ্রাবণী জলি এবং আঁখি ভদ্র।

শ্রাবণী জলি বলেন, শুরুতে ৫০ হাজার টাকার পুুঁজি নিয়ে ত্রিভোর কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ টাকার ব্যবসা রানিং আছে। লভ্যাংশ থেকেই বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। আমাদের কোনো ব্যাংক লোন নিতে হয়নি।

বনানী ডি ব্লকের ১৩/এ রোডে ৮৮ নম্বর হাউজ। এই হাউজের দ্বিতীয় তলায় ত্রিভোর শো-রুম। এখানে নারীরা শুধু শাড়ি কিনতেই আসেন না, অনেক সময় আড্ডা দিতেও আসেন। আঁখি ভদ্র ও শ্রাবণী জলি তাদের স্বাগত জানান।

/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়