ঢাকা     শনিবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩০

দূষিত বুড়িগঙ্গার নতুন আতঙ্ক সাকার মাছ

মুজাহিদ বিল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২৫, ২২ নভেম্বর ২০২৩  
দূষিত বুড়িগঙ্গার নতুন আতঙ্ক সাকার মাছ

নানা ধরনের বর্জ্য ও আবর্জনার কারণে অনেক আগেই প্রাণ হারিয়েছে ঢাকার অন্যতম প্রধান নদী বুড়িগঙ্গা। লঞ্চ চলাচলে ব্যবহৃত দূষিত উপাদান ও নানা কারণে বুড়িগঙ্গার পানি এখন প্রায় ব্যবহার অযোগ্য। দূষিত বুড়িগঙ্গার নতুন আতঙ্ক সাকার মাছ। অনেকে ‘রাক্ষুসে মাছ’ বলেন একে। এই মাছের কারণে বুড়িগঙ্গা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অন্যান্য মাছ। 

সদরঘাট, শ্যামবাজার, গেন্ডারিয়া, ওয়াইজঘাট, বাদামতলী বুড়িঙ্গার যে কোনো ঘাটে দাঁড়ালে পানিতে এই মাছের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। মাছটি সাধারণ কোনো মাছ নয়। দেখতেও ভয়ানক। শরীরে ছোট ধারাল কাটাযুক্ত এই মাছ অন্য মাছ খেয়ে ফেলে। এ ছাড়া এই মাছ আবর্জনা ও ময়লা খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারে।

বিভিন্ন কারণে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমলেও এখনো নানা কারণে বুড়িগঙ্গার উপর নির্ভরশীল অনেকেই। অনেকে এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে সাকার মাছের কারণে তারা আর অন্য মাছ পাচ্ছেন না। এই মাছ ধরে যে বিক্রি করবেন তাও সম্ভব নয়। অথচ নদীতে জাল ফেললেই উঠে আসে ঝাকে ঝাকে সাকার মাছ। যেখানে যত ময়লা আবর্জনা বেশি, সেখানে এই মাছও বেশি। জালে সাকার মাছ উঠে এলেও বিড়ম্বনার শেষ নেই। কারণ এই মাছের শরীরে ধারাল কাঁটার কারণে জাল ছিঁড়ে যায়। জেলেরা এই মাছের নাম দিয়েছেন ‘রোহিঙ্গা মাছ’। 

সরকার কর্তৃক বিক্রি ও প্রজনন নিষিদ্ধ থাকায় সাকার মাছ বিক্রি করেন না জেলেরা। সাকার মাছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতুসহ রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি রয়েছে এবং এই মাছ দেশীয় মাছ বিলুপ্তি করতে পারে এবং বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে দিতে পারে বলে শঙ্কা অনেক বিশেষজ্ঞের। অথচ এই মাছে ভরে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা। এবং এতোটাই বেশি যে অনেকে ভয়ে বুড়িগঙ্গায় গোসল করতেও নামেন না। 

বুড়িগঙ্গার পারের বাসিন্দা হাসানুল করিম রাইজিংবিডিকে বলেন, এখানে এত বেশি পরিমাণে সাকার ফিস বেড়েছে যে অন্য কোন মাছ আর দেখা যায় না। আমরা আগে অনেকেই এখানে গোসল করতাম। এখন করি না। জেলেদেরও খুব বেশি দেখা যায় না এখানে। আমরা চাই বুড়িগঙ্গা সাকার মাছ মুক্ত এবং দূষণ মুক্ত হোক। 

গেন্ডারিয়া এলাকার জেলে হারেজ উদ্দিন বলেন, আগে তো প্রতিদিন জাল ফেলে মাছ ধরতাম। এখন তো আর মাছ পাওয়া যায় না। সব রোহিঙ্গা মাছ। এই রোহিঙ্গা মাছ সব মাছ খাইয়া ফেলে। এই মাছের বাজারে দাম নাই। কেউ কেনে না।  সরকারেরও নিষেধ আছে। অনেক সময় জাল ছিঁড়ে ফেলে এই রোহিঙ্গা মাছ।

এই মাছ খেয়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না। তবে অনেকে শস্তা পেয়ে  ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে এই মাছ কিনতেন বলে জানান তিনি। এখন মানুষ সচেতন হওয়ার পর আর বিক্রি হয় না। 

এ প্রসঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ও গবেষক প্রফেসর ড. কাজী আহসান হাবীব বলেন, আমাদের দেশে শুধু বুড়িগঙ্গায় নয় অন্য নদীতেও এই মাছ দেখা গেছে। এটার বংশবিস্তার রোধ করা কষ্টকর। এটা যদি ছোট জায়গায় থাকতো তাহলে বিষ দিয়ে মারা যেতো। নদীর মতো বড় জায়গায় বিষ প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। প্রচুর পরিমাণে এই মাছ ধরে সেসব ক্যাটফুড বানানো যেতে পারে। বাইরের দেশে কুকুর-বিড়ালের খাবার হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। 

এই মাছ নিয়ে গবেষণা করে যদি ভালো ফল আসে তবে শুঁটকি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি। 

কীভাবে সাকার ফিসের প্রজনন কমিয়ে আনা যায় এ প্রসঙ্গে রাইজিংবিডিকে ঢাকা জেলা মৎস বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক ড. আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমরা কেরানীগঞ্জের জেলেদের নিয়ে সচেতনামূলক সেমিনার করিয়েছি। তাদের বুঝিয়েছি এই মাছ ক্ষতিকর, এদের পাওয়ার পর নদীতে না ছেড়ে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। লিফলেট বিতরণ করেছি জনসচেতনতার জন্য। আমরা ভেবে দেখছি এই সাকার ফিসকে কোনোভাবে ফিড বানানো যায় কিনা। 

১৯৮০ সালে সর্বপ্রথম অ্যাকুরিয়ামে ব্যবহারের জন্য সাকার ফিশ দেশে আনা হয়।  অ্যাকুরিয়ামের শ্যাওলা ও বর্জ্য খেয়ে পরিষ্কার রাখবে তাই এই মাছ আনা। এরপর সেখান থেকে এই মাছ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন খালে ও নদীতে। এই মাছের আসল নাম সাকার মাউথ ক্যাটফিশ। এই মাছের প্রাণশক্তি প্রচণ্ড। পানি ছাড়াও এই মাছ ২৪ ঘণ্টা বাঁচতে পারে। 

মৎস গবেষকরা জানিয়েছেন, ১৯৬৮ সালে সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রে সাকার ফিশে দেখা যায়। এরপর সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে মেক্সিকো, ব্রাজিল, পানামাসহ নানা দেশে। মেক্সিকো থেকে এই মাছ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয় কুকুর, বিড়ালের খাবার হিসেবে বিক্রির জন্য। মেক্সিকোর অনেক রেস্তোরাঁয় এই মাছ বিক্রি করা হয় এবং অনেকেই শুঁটকি হিসেবে ব্যবহার করেন। মেক্সিকোতে এই মাছের বার্গারসহ চিপসেরও দেখা মেলে।

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়