ঢাকা     সোমবার   ১৭ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩১

পালানাট্যের সেকাল একাল

গাজিবর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪৭, ৮ মে ২০২৪   আপডেট: ১২:৫০, ৮ মে ২০২৪
পালানাট্যের সেকাল একাল

ছবি: প্রতীকী

পালানাট্য কাহিনিমূলক লোকগীতি অর্থাৎ যা কোন একটি কাহিনি অবলম্বন করে কীর্তনের ঢংগে গান গাওয়া। বলা যায় এটি লোকগীতির একটি ধারা। পালানাট্যে যেকোন আদি বা পৌরাণিক কাহিনিকে ছন্দ গাঁথা হয়। দেবতাদের কাহিনি, জীবনী কিংবা কীর্তি নিয়ে পালানাট্য রচিত হতে পারে আবার এ নাটকে সমাজের বিভিন্ন ঘটনাও প্রাধান্য পেতে পারে। নাচ, গান এবং সংলাপযোগে খোলা মঞ্চে গৃহস্থের বাড়ির উঠানে উঠানে বা খৈলানে খৈলানে পরিবেশিত হয় বাঙালির পালানাট্য। পালানাট্যের এই আঙ্গিক মধ্যযুগেও জনপ্রিয় ছিল, এখনও আছে।

বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ধারার উপস্থাপন রীতি ছিল প্রধানত পালা কেন্দ্রিক। ‘শেকড়ের পালানাট্য হোক সত্যিকারের বাঙালির পালানাট্য’। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পালানাট্যের উপাদান ও উৎস। আমাদের এই রূপসী বাংলাদেশে অগণিত গল্প, কেচ্ছা, কথা, উপকথা, রূপকথা নিয়ে পালানাট্য হয়েছে। সেই সব পালার ঝুড়ি থেকে কিছু কথা নিয়ে আজকের এই প্রবন্ধ লেখা। যেকোন গল্পের মৌলিক কাহিনি নিয়ে পালানাট্য এগিয়ে যায়। সেখানে থাকে মৌলিক নাচ, গান, সংলাপ ও বন্দনা। তবে নাট্যকার অথবা নির্দেশক ইচ্ছে করলে তিনি সেই প্রাচীনতম (আদি) কিছু গানের সুর অথবা পালানাট্যের সাথে সংগতি রেখে কোনো গানের সুর সংমিশ্রণ করতে পারেন। কিন্তু গানের কথাগুলো হতে হবে কাহিনীর উপর ভিত্তি করে। তবেই সেটা হবে প্রকৃত মূল পালানাটক।  

মৌলিক পালানাট্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে আমাদের। উল্লেখ করা যায় মাথুর, নৌকা বিলাস, কালীয় দমন, নিমাই সন্ন্যাস, চন্দ্রাবতী, মহুয়া সুন্দরী, মলুয়া সুন্দরী, কমলা সুন্দরী, দেওয়ানা-মদিনা, রূপবতী, দস্যু কেনারামের পালা, ভেলুয়া সুন্দরীর পালা, নসিমনের পালা, মৈফল রাজার পালা, জামাল বাদশার পালা, রাজ বিদ্যার পালা, ছুরত জামাল ও অধুয়া সুন্দরীর পালার নাম। এইগুলো হলো বাঙালির আদি পালা যেখানে বাঙালির সংস্কৃতির নাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। বাঙালির সংস্কৃতির এই পালা নাটকগুলো বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে আর এগুলোর উদ্ধারের কাজ করছে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। যে দুইজন মানুষের প্রচেষ্টায় এই সংগঠনটি কাজ শুরু করেছিল তারা হলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এবং নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ।

কিছুদিন আগে গাইবান্ধার দারিয়াপুর ‘সারথি থিয়েটার’ তিন দিনব্যাপী ‘হাকিম আলী গায়েন’ পালানাট্য উৎসবের আয়োজন করে। আমি সেই উৎসব দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে তিন দিনে তিনটি পালানাট্য মঞ্চায়ন হয়। পালানাট্যগুলো মনোযোগ সহকারে দেখি। তবে, আমি যে তিনটি পালানাট্য দেখলাম সেই তিনটি নাটককে কোনো ক্রমেই পালানাট্য বলতে রাজি নই। দেখলাম দুটি মৌলিক নাটককে পালানাট্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পালানাট্যের গঠন ঠিক থাকলেও তার কাহিনি বিন্যাস, গান ও সংলাপ ঠিক ছিল না।

তিনটি পালানাট্যেরই গঠন ও পাঠন ছিল একই রূপ। যেসব পালাকার এ রকম পালানাট্যের জন্ম দিচ্ছেন বা মৌলিক নাটক ভেঙ্গে পালানাট্যে রূপান্তরিত করছেন তারা বিকলাঙ্গ পালানাটকের জন্ম দিচ্ছেন। এই সমস্ত শিল্প দিয়ে বা পালা নাটক দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো কিছুদিন হাততালি পাওয়া যাবে কিন্তু স্থায়িত্ব রক্ষা করা যাবে না। এতে মৌলিক কাজ  বা মৌলিক শিল্প নষ্ট হচ্ছে। পালানাট্যে যদি কোন প্রচলিত গান ব্যবহার করা হয় তাহলে সেই নাটক এক সময় অবশ্যই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই প্রকৃত পালানাট্যে প্রচলিত গানের ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। তবে এটা করতে পারেন, পালা নাটকের কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো কোনো আদি বা পুরাতন পালানাট্যের গানের সুর থেকে সুর মিশ্রণ করে উক্ত নাটকের কথায় সেই সুর ব্যবহার করলে নাটকের মান অক্ষুন্ন থাকবে। আমি এই সমস্ত পালাকার ও নির্দেশকদের অনুরোধ করবো আপনারা এই সমস্ত নকল শিল্প থেকে বিরত থাকুন এবং মৌলিক শিল্পের মান অক্ষুন্ন রাখুন।

নাটকের আঙ্গিকে দৃষ্টিকটু কিছু দেখলেই মনটা বেদনায় ভরে ওঠে এবং কিছু বলতে ইচ্ছে করে বলেই, বলা।

লেখক: থিয়েটারকর্মী

/লিপি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়