সংস্কৃতিমন্ত্রী ডেকে বললেন আপনার পুরস্কার বাড়িতে পৌঁছে দেব: মোহন
মোহন রায়হান
‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’–এর জন্য মনোনীত হয়েও পুরস্কার পাননি কবি মোহন রায়হান। কেন তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শুরুর আগে মোহন রায়হানের সঙ্গে কী ঘটেছিল— তা উঠে এসেছে এই কথপোকথনে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন স্বরলিপি।
রাইজিংবিডি: ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’–এর জন্য মনোনীত হয়েও পুরস্কার পাননি, এ নিয়ে সারা দেশের মানুষ কথা বলছে।
মোহন রায়হান: আমাকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য ডেকে নিয়ে বাংলা একাডেমি শেষ পর্যন্ত পুরস্কার দেয়নি। এটা তো মানহানিকর ব্যাপার। ফেসবুকে সবাই এটার প্রতিবাদ করছে। প্রধানমন্ত্রী আজকে (২৬ ফেব্রুয়ারি) যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই প্রেক্ষিতে বলতে হয়—যারা প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে আমার পুরস্কার বাতিল করিয়েছেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন। সারা দেশে আজ এ নিয়ে আলোচনা চলছে, প্রতিবাদ হচ্ছে।
আমি সংস্কৃতিমন্ত্রীকে বলেছি, দেখেন, পুরস্কার বাতিল করা হলে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। আলোচনার ঝড় উঠবে। আপনারা এই কাজটা করছেন কেন? এখন দেখেন, ঘটনার পর সারা দেশেই আলোচনা হচ্ছে। এখন তারা এসে সামাল দিক। দেখুক, লোকে কীসব বলছে!
রাইজিংবিডি: উনি কী সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেছেন যে, কেন আপনার পুরস্কার স্থগিত করা হলো?
মোহন রায়হান: আমাকে বলা হয়েছে, আপনি কর্নেল তাহেরকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছেন। আমি বললাম, তাতে কী হয়েছে—কর্নেল তাহের তো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার এবং বীর উত্তম। কামালপুর যুদ্ধে তিনি পঙ্গু হয়ে যান। একজন পঙ্গু লোককে তো এমনিই ফাঁসি দেওয়া যায় না। কিন্তু একজন পঙ্গু, বীর উত্তম, সেক্টর কমান্ডারকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। তাকে যখন ফাঁসি দেওয়া হয়, এরপর আমি তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। কবিতায় তো শহীদ জিয়াউর রহমান–এর নামে কিছু লিখিনি।
রাইজিংবিডি: সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার কখন, কোথায় কথা হলো?
মোহন রায়হান: বাংলা একাডেমি মঞ্চের পাশেই। আমাকে তিনি ডেকে নিলেন। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে আমাকে ডেকে মন্ত্রী বললেন, আপনি এখান থেকে চলে যান। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে পুরস্কারটা দিতে বিব্রত হবেন। আমরা আপনার বাড়িতে পুরস্কার পৌঁছে দেব।
রাইজিংবিডি: আপনি প্রতিউত্তরে কী বললেন?
মোহন রায়হান: বললাম, এটা কেমন কথা! আমি থাকব না, আর আপনারা আমার পুরস্কার বাড়িতে পৌঁছে দেবেন? আমি এখানে থাকব। পুরস্কার দিলে সবার সামনে দেবেন। আমাকে তো ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলা একাডেমিতে রিহার্সেল করানো হয়েছে—কীভাবে পুরস্কার গ্রহণ করব, কীভাবে সামনে দাঁড়াব, কীভাবে স্টেজে উঠব-নামব। আমরা নয়জন একসঙ্গে প্রশিক্ষণ করেছি। পুরস্কার দেওয়ার জন্য ডেকেছে বাংলা একাডেমি, আমি এসেছি। আর আমাকে বলছেন বাড়ি চলে যেতে! বলছেন, আপনাকে পুরস্কার দেব না—এটা কেমন কথা?
রাইজিংবিডি: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার এ বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে?
মোহন রায়হান: না, দেখা বা কথা হয়নি।
রাইজিংবিডি: প্রধানমন্ত্রীকে আপনার কিছু বলার আছে?
মোহন রায়হান: না, আমার তাকে কিছুই বলার নেই। আমি তো এই পুরস্কার চাইনি। আর প্রধানমন্ত্রীকে যদি কিছু বলতে হয়, তা আমি আমার লেখাতেই বলব।
রাইজিংবিডি: যা ঘটল, এটা বিব্রতকর। আশা করছি, আপনি দ্রুতই মানসিক ধকল কাটিয়ে উঠবেন।
মোহন রায়হান: আমি ভালো আছি। আমি তো যোদ্ধা মানুষ। তেরোবার জেল খাটা লোক। পাঁচবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।
রাইজিংবিডি: পুরো ব্যাপারটা খারাপ হতে হতে আপনার জন্য ভালো হয়ে গেল কি না, সেটা আসলে সময় বলবে। আপনার পুরস্কার স্থগিত করা হয়েছে। অন্য যারা পুরস্কার গ্রহণ করলেন, তাদের মধ্যে কেউ এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিবাদ করেননি। সে যাই হোক, মানুষ আপনার পক্ষে কথা বলছেন। এটা হয়তো পুরস্কারটা পেয়ে গেলে হতো না।
মোহন রায়হান: যারা কথা বলছেন, আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
রাইজিংবিডি: ধন্যবাদ আপনাকে।
মোহন রায়হান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
ঢাকা/লিপি