ঢাকা     সোমবার   ১৭ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩১

তিন নদীর মোহনায় 

সুমন্ত গুপ্ত  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ২৯ মার্চ ২০২৪  
তিন নদীর মোহনায় 

ব্যাংকে কাজ করার সুবাদে প্রায় সময় লোন পার্টির মরগেজ প্রপার্টি দেখতে যেতে হয়। আমি যেহেতু ভ্রমণপ্রিয় মানুষ সে ক্ষেত্রে এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো অবস্থা হয়। সিলেট থেকে ৯২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জকিগঞ্জ যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় কখনো তিন ঘণ্টাও লেগে যায়। জকিগঞ্জে আমাদের এক লোন পার্টির জায়গা দেখতে যাবার কথা বলেছিলেন আমার ম্যানেজার স্যার। কিন্তু দূরত্বের কথা ভেবে যেতে মন চাইছিল না। তখন তিনি  বললেন, ভারতের এলাহাবাদে যেভাবে ত্রিবেণীসঙ্গমে মিশেছে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী, তেমনভাবে বাংলাদেশের জকিগঞ্জে মিশেছে বরাক, সুরমা ও কুশিয়ারা। তুমি একসাথে ব্যাংকের কাজ করে সেখানে ঘুরে আসতে পারবে। আমি ভাবলাম, দূরত্ব যাই হোক না কেন নতুন স্থান ঘুরে দেখার মজাই আলাদা। আর যেহেতু তিন নদীর মিলনস্থান, সেহেতু  আমাকে দেখে আসতেই হবে। 

সকালবেলা প্রস্তুতি নিয়ে বের হলাম অফিস পানে, সঙ্গে নিলাম আমার প্রিয় ক্যামেরা। অপেক্ষা করছি আফতাব ভাইয়ের কিন্তু তার দেখা নাই। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১১টা প্রায় বাজে, কিন্তু তখনো দেখা নাই। ফোন দিলাম আফতাব ভাইকে। বলল, দাদা আমি অফিসের নিচে, আপনি নামুন। শেষ পর্যন্ত চার চকার গাড়িতে চেপে বসলাম আমরা। আকাশে মেঘের ভেলা সঙ্গী করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে বেরসিক রাস্তার জন্য শরীরের নাটবল্টু ঢিলে হবার জোগাড়। তবে রাস্তার সৌন্দর্য আপনাকে নিশ্চিতভাবে বশ করবে। মাঝে মাঝে ছবি তোলার নিরন্তর চেষ্টা করছি। প্রায় আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আমরা এসে পৌঁছাই জকিগঞ্জ শহরে। 

দেখলাম জকিগঞ্জ পৌর পাঠাগার, পাশেই স্থানীয় শহীদ মিনার।   আফতাব ভাই বললেন, দাদা আগে কিছু খেয়ে নেন, পরে জায়গা দেখতে যাবেন। আর এখানে হোটেলে টাটকা মাছের ঝোল পাবেন সুস্বাদু। সকাল থেকে পেটে কিছু পরেনি। আমি আর না বললাম না। এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করলাম। বেশ পরিষ্কার। আমরা যেতেই টেবিলে গরম গরম ভাত পরিবেশন করা হলো। জানতে চাওয়া হলো কি দিয়ে আমরা আহার পর্ব শুরু করবো। ভিন্ন ভিন্ন পদের মাছের নাম বলল- ছোট মাছ , রানী মাছ, শিং মাছ , কৈ মাছ, পাবদা মাছ, চিতল মাছ, সরপুঁঠি মাছ, বাউস মাছ কোনটা লাগবে? আমি এতোগুলো মাছের নাম শুনে কোনটা রেখে কোনটা খাবো তাই ভাবছিলাম। শেষ পর্যন্ত ছোট মাছ, রানী মাছ দিতে বললাম। এদিকে আমার সঙ্গীরা কৈ মাছ, পাবদা মাছ দিয়ে আহার পর্ব শেষ করলেন। অসাধারণ স্বাদ, খুব একটা মসলা নেই। খুব ভালো লাগলো। 

পেট পূজা শেষে আমরা চললাম আমাদের গন্তব্যপানে। পথে দেখা পেলাম প্রচুর সুপারি বাগানের। আফতাব ভাই বললেন, জকিগঞ্জের সুপারির বেশ কদর। এখানকার সুপারির রং যেমন খাসা, স্বাদও অসাধারণ। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি সুপারিগাছের প্রাচুর্য প্রমাণ করে এই এলাকার সুপারির কদরের কথা। আমরা পৌঁছে গেলাম আফতাব ভাইয়ের বাড়ি। তিনি  বাড়ি ঘুরে দেখালেন। দেখে মনেই হয় না যে গ্রাম। আমি দ্রুত অফিসের কাজ শুরু করে দিলাম। মনের ভেতর তাড়া দিচ্ছিল কতক্ষণে হাতের কাজ শেষ করবো। 

কাজ শেষ করে ছুটে চললাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যপানে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কুশিয়ারা তীরের কাস্টমস ঘাট। দেখা পেলাম খরস্রোতা নদীর। আফতাব ভাই বললেন, এ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের পূর্ব-উত্তর কোণের সর্বশেষ উপজেলা জকিগঞ্জ, অপর প্রান্তে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলা। পাশেই দেখলাম আমাদের সীমান্তরক্ষীদের সতর্ক প্রহরা। দুই দেশের মাঝখানে নদীটি আছে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ হয়ে। নৌকাগুলোতে কোনটিতে বাংলাদেশের পতাকা, কোনটিতে ভারতের পতাকা উড়ছে। আমি ছবি তুলতে লাগলাম। হঠাৎ দেখা পেলাম এক বয়স্ক লোক হাঁসের ছানা নিয়ে যাচ্ছেন।

আফতাব ভাই বললেন, চলেন সামনের দিকে গেলেই তিন নদীর মোহনা। আমরা যাব আমলসীদ পয়েন্ট, এখানেই মিলিত হয়েছে তিন-তিনটি নদী। জকিগঞ্জ সদর থেকে উত্তর-পূর্বমুখী রাস্তা ধরে ১৩ কিলোমিটার যাওয়ার পর পড়ল আমলসীদ বাজার। সেখান থেকে একটু সামনে গিয়ে ডানে মোড় নিলাম। মোড় থেকে একটু সামনে গিয়ে টিলার মতো একটা উঁচু ঢিবি। কিছু দূর যাবার পর রাস্তার অবস্থা খুব করুণ। গাড়ি সামনে যেতেই চাইছে না। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে পদব্রজে রওনা দিলাম। কয়েক মিনিট হাঁটার পর আমারা পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। এক সাথে তিনটি নদীর সঙ্গম স্থান দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। 

নদীর স্রোতধারা বলে দিচ্ছে এটি তিন নদীর মিলন ক্ষেত্র। ভারতের মনিপুরে জন্ম নেওয়া বরাক মিজোরাম আর আসামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আমলসীদে এসে দুই ধারায় ভাগ হয়েছে। এই দুটিই আমাদের সুরমা ও কুশিয়ারা। এই দুই নদী জকিগঞ্জ উপজেলাকে তিন দিক থেকে জড়িয়ে আছে। দেখা পেলাম নদীর পাশে বাঁশবাগানের পাশে সবজি ক্ষেতের। আমাদের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী টহল দিচ্ছেন। পানকৌড়ি, সারস, বকসহ অচেনা বেশ কিছু পাখিকে খাবারের সন্ধান করতে দেখলাম। সে এক অসাধারণ দৃশ্য! হঠাৎ করে শব্দ হতেই দেখলাম- বড় একটি মাছ ধরা পড়েছে পেতে রাখা ফাঁদে। 

আফতাব ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, এটা হলো বাঁশ-বেত দিয়ে বানানো এক ধরনের বড় আকৃতির মাছ ধরার ফাঁদ, স্থানীয় নাম ‘ফর্গা’। ছুটে এলেন এক বয়স্ক লোক। এসেই নৌকা নিয়ে ছুটে গেলেন মাছ ধরতে। বড় আকারের একটি আইড় মাছ  ধরা পড়েছে জালে। নদী থেকে উঠে আসার পর জানতে চাইলাম কী কী মাছ আছে এই নদীতে । তিনি বললেন, তাদের বড়শিতে নানা জাতের মাছ ধরা পড়ে। তবে বাইন, আইড়, সরপুঁটিই বেশি ধরা পড়ে। কতো বছর ধরে মাছ ধরছেন জানতে চাইলে তিনি বললেন- বাপ চাচার আমল থেকেই মাছ ধরছি। এখন আর আগের মত জালে মাছ ধরা পরে না। দেখা পেলাম স্থানীয় মুরুব্বী রফিক চৌধুরীর। পরিচয় দেবার পর তিনি বললেন, বরাক মোহনার এই মিলিত স্রোতের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানটায় প্রায় সারা বছরই পানির যথেষ্ট প্রবাহ থাকে। শুষ্ক মৌসুমে এমন স্রোত দেশের অনেক নদীতেই দেখা যায় না। আমলসীদ পয়েন্টে তিন নদীর আকৃতি ইংরেজি ‘ওয়াই’ অক্ষর উল্টো করে ধরলে যে রকম দেখায় অনেকটা সে রকম। রফিক সাহেবের সাথে কথা বলতে বলতে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। নদীর পারে নানা জাতের বাহারি লতা-গুল্ম আর নলখাগড়ার বন পেরিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। সেখানে রঙের আবহ ছড়িয়ে ফুটেছে বর্ণিল সব বুনো ফুল। এদিকে সূর্য মামার বিদায় বেলা উপস্থিত হবার দরুন অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে।  আফতাব ভাইও তারা দিতে লাগলেন- দাদা সিলেটে ফিরবেন না? ফলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে চললাম শহর পানে। 

যাবেন কীভাবে

সিলেটের কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে জকিগঞ্জের উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। বাসে ভাড়া পড়বে ১২০ টাকা। জকিগঞ্জ উপজেলায় যাওয়ার পথে কালীগঞ্জ লাইনে পড়বে আমলসীদ পয়েন্ট। সেখানে দেখা পাবেন তিন নদীর মিলন স্থান। তবে চাইলে সিলেট থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি  অথবা ভাড়া করে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। তবে বাসে গেলে  নিশ্চিত হয়ে নেবেন বাস কালীগঞ্জ হয়ে যাবে কিনা। দিনে দিনেই সিলেটে ফেরা যাবে জকিগঞ্জ থেকে। 

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়