ঢাকা     শনিবার   ২২ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৮ ১৪৩১

চতুর্থ পর্ব

লোলেগাঁও ও গ্যাংটক ভ্রমণের দিনরাত্রি 

তপন চক্রবর্তী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২১, ৪ জুন ২০২৪   আপডেট: ১৩:২৪, ৪ জুন ২০২৪
লোলেগাঁও ও গ্যাংটক ভ্রমণের দিনরাত্রি 

যদু বাবুরা চয়ের দোকানের দিকে আর আমরা দুজন পাহাড় থেকে নেমে যাওয়া সরু পথ ধরে নিচে নামি। সেখানে কয়েক ঘর বসতি। আমরা পুরনো আত্মীয়ের মতো এক ঘরে ঢুকে বলি, বসতে পারি। ওরা খুব খুশী মনে বসতে বলে। ওরা বাংলা একআধটু বলতে পারে। তারা নিজেদের মধ্যে লেপছা ভাষায় কথা বলে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে কৌতূহলী হয়ে আমাদের দেখছিল। ওদের মায়েরাও। মলিনা ব্যাগ থেকে ক্যাডবেরি চকোলেট বের করে সবাইকে দেয়। দুটো মেয়েকে প্রজাপতি ক্লিপ দিলে ওরা খুশি হয়ে ফড়িংয়ের মতো দৌড়ে বেড়ায়। ওদের মরদেরা দিনে অরণ্যের নানা কাজে যান। সন্ধ্যার পর ফিরে আসেন। কিন্তু আজ একটু আগে এক মরদ ফিরে এসেছে। তার স্ত্রী তাকে বসতে দেন। তাদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলে তাদের জলকষ্টের কথা জানা গেল। মলিনা তাদের বিহু উৎসবের কথা জানতে চাইলে মেয়েটি লজ্জা পেল। ছেলেটিই জানাল বিহুর সময় জলকেলি হয় এবং পাত্র পাত্রীকে ও পাত্রী পাত্রকে পছন্দ করে। 

জানেন, আমাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছিল না। আমার চেহারা সুন্দর নয়। এই মেয়েটি এসে আমার হাত ধরে। আমরা মেয়েটির দিকে চাইলে সে বলে, ‘দেখতে ভালো না হলেও লোকটার মন যে ভালো তা বুঝতে পেরেছিলাম।’ বলেই সে সলজ্জ হাসি দিলো। 

মলিনা তার হাতের পলা খুলে মেয়েটিকে পরিয়ে দিলো। সে খুশিতে কেঁদে ফেলল। মলিনা অন্য মহিলাদের দেওয়ার জন্য টিপের একটি পাতা তার হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। এবার ফিরতে হবে। আমিও উঠলাম। মেয়েটি মলিনার হাত ধরে বলল, কিছু খেয়ে যেতে হবে। পড়শি মহিলাদেরও দাবি তাই। আমরা ওদের বোঝাই- এ সময়ে আমরা খাই না। মলিনা তাদের জলের সংকট মোচনের ব্যাপারে আশ্বস্ত করল।  

উপরে মথ, নিচে প্রজাপতি এবং লাল পান্ডা

ঘরেই চা-বিস্কিটের ব্যবস্থা আছে। অলিন্দে বসেই চা-পান করি। আবছা আঁধারের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে অনন্ত সবুজ গালিচা। আমরা বসে বসে জাবর কাটি। ছেলে বউ ফিরে এসেছে। বনাধিপতিও ফিরে আসেন। বিষ্ণুর গাড়ির হেড লাইটে রেস্ট হাউজের দেয়ালে ছোট পাখির আকারের একটি মথ দেখে সকলে অভিভূত হই। মোবাইল তখন চালু হলেও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। অবশ্য ওতে ক্যামেরা থাকতো কি না মনে পড়ে না। এনড্রয়েড ফোন তো তখন বাজারে নেই। কাজেই ক্যামেরার প্রশ্ন আসে না। আমাদের কাছে ক্যানন কোম্পানির ক্যামেরা ছিল। তাতে মথের ছবিও তোলা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর রীল নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে মথ ও প্রজাপতির পার্থক্য বোঝেন না। মথ ডানাকে ভূমির সমান্তরাল রাখে। প্রজাপতি পাখাকে ভূমির সঙ্গে লম্বলম্বি রাখে। প্রজাপতির এন্টেনা সামনের দিকে একটু গোলাকৃতির। মথের এন্টেনা সোজা এবং পালকযুক্ত। মথের দেহ পুরু এবং প্রজাপতির দেহ পাতলা। প্রজাপতির ডানা বিচিত্র বাহারি রঙের। মথের ডানা ধূসর বর্ণের। অবশ্য এর উপর সামান্য কিছু কারুকাজ থাকে। মথ নিশাচর, প্রজাপতি দিবালোকে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়।

সন্ধ্যার পর জমাট আড্ডা। মূল বক্তা বিষ্ণু। অরণ্যের চমকপ্রদ কাহিনি কখনো রোমাঞ্চকর, কখনো ভীতিকর। তিনি আজ লাল পান্ডা দেখার সুযোগ  পেয়েছেন। এদের খুব কম দেখা যায়। বললেন, ‘ছবি তুলেছি, দেবো। তোমাদের বোধ করি জানা নেই, গ্রীষ্মে এখানে নানা ধরনের অর্কিড বিক্রির হাট বসে। হাটের ছবিও দেবো।’ 

বিষ্ণুর আলোচনা থেকে বুঝতে পারি, আমরা অরণ্যে সম্পর্কে জানি খুবই কম। ছেলেরা বিষ্ণুভক্ত হয়ে উঠেছে। বিষ্ণুও তাদের আগ্রহকে সমাদর করছেন। বিষ্ণু বললেন, ‘তোমরা তো এরপর গ্যাংটক যাবে। প্রোগ্রাম না থাকলে তোমাদের গভীর অরণ্যে নিয়ে যেতে পারতাম। আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো, সময় করে চলে এসো। তবে অরণ্য ও জীবজন্তু সম্পর্কে প্রাথমিক ধ্যানধারণা থাকলে তোমাদের আরো ভালো লাগবে। আমি ফরেস্ট্রি ছাড়া উদ্ভিদ, প্রাণিবিজ্ঞান, রসায়ন, ভূবিজ্ঞান সম্পর্কে বিস্তর পড়েছি। এখনো পড়ছি। এতে প্রকৃতি পাঠে  সুবিধা হয়। তোমরা গ্যাংটক কীভাবে যাবে ঠিক করেছো ‘

লোলেগাঁওয়ে ক্যানোপি (ঝুলন্ত সেতু), বৌদ্ধ জাদি ও হোটেল 

সুব্রত জানায় যে, সকালে এখানে নাকি জীপ পাওয়া যায়, নতুবা লাভা গেলে পাওয়া যাবে। বিষ্ণু বললেন, ‘এখান থেকে জীপ পাওয়া যায় কালেভদ্রে। পাওয়া গেলেও গলাকাটা ভাড়া নেবে। তোমরা বাসে কালিম্পং চলে যাবে। কালিম্পং থেকে গ্যাংটকে যাত্রী নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা থাকে। তোমরা দরদাম করে জীপ ঠিক করবে এবং জীপের নম্বর ও চালকের পরিচয়, ভাড়ার অঙ্ক ইত্যাদি লিখে পুলিশকে লিখিত রিপোর্ট করবে এবং পুলিশের সইসহ দরখাস্তের কপি সঙ্গে রাখবে।’

বিষ্ণু আমাদের প্রণাম করে জানায়, রাত বারটার পর বের হবেন। সকালে দেখা হবে না। আমরাও জিনিসপাতি গোছানোয় বসে পড়ি। মলিনা এক ফাঁকে বিষ্ণুকে প্রতিবেশীদের জলকষ্ট কমানোর অনুরোধ জানালে বিষ্ণু আশ্বাস দিয়ে বলে, ‘কাকীমা, আপনার অনুরোধ নয়, আদেশ। প্রায়োরিটি পাবে।’ 

বলেছিলাম বর্তমান লোলেগাঁও অনেকে বদলে গেছে। ইন্টারনেট সূত্রে জানতে পাই যে, এখন পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য কিছু দর্শনীয় স্থানের আয়োজন করা হয়েছে। হোটেল, গেস্ট হাউজ, কাঠনির্মিত রোপওয়ে, দোকানপাট তো হয়েছেই। কিন্তু লোলেগাঁওয়ের আদি চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেনি। লোলেগাঁও আজো প্রকৃতির কোলে নীরব, শান্ত ও সুখী গ্রামের সুনাম হারায়নি।

লিডারেরা স্থির করেছে সকাল ৭টার বাসে সিকিমের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। লোলেগাঁও থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার। জীপে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা। ভোরে চা পান, প্রাতঃকৃত্য ও স্নান সেরে যাওয়া হবে। আমরাও সব সেরে রেডি হয়ে রেস্ট হাউজ থেকে বাস স্টেশনে আসি। ছেলেরা মাল বয়ে আনে। লোলেগাঁওয়ের বাস স্ট্যান্ডে বেশ বড়সড় জীপ পেয়ে যাই। ভাড়াও যুক্তিসঙ্গত। আমরা ৭টায় রওনা দেই। আগে ধারণা ছিল লাভা হয়ে যেতে হবে। এখন অন্য পথে গ্যাংটক যাওয়া হচ্ছে।

পথে এক মহিলা মমো বানাচ্ছেন দেখে গাড়ি থামাই। লিডারদের মমো কিনতে বলি। লিডারেরা প্রত্যেকের জন্য চারটা মমো ও স্যুপ সাপ্লাই দেয়। আমরা চলন্ত বাসে পরম সুস্বাদু খাবার খেয়ে তৃপ্তি পাই। এর আগে কলকাতায় মমো খেয়েছি। এরকম স্বাদ পাইনি। এসব পাহাড়িদের উদ্ভাবিত খাবার। মূলত তিব্বত ও নেপালে এবং পরে ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে মমোর কদর বেশি, দরও কম। বিচিত্র রকমের মমো বানানো হয়। যেমন, স্টীম মমো, ঝোল মমো, সি-মমো, ফ্রাই মমো, চিকেন মমো, ভেজ মমো, বাফ মমো, চজি মমো, খুয়া মমো, চকোলেট মমো ইত্যাদি।

বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড

সিকিম উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। এর উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমানায় রয়েছে চীনের স্বশাসিত অঞ্চল তিব্বত, উত্তর-পূর্বে ভূটান, পূর্বে নেপালের কোশি প্রদেশ, পশ্চিমে নেপাল ও দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গ। নৈকট্যে থাকা শিলিগুড়ির সীমানায় বাংলাদেশ। এটি ভারতের দ্বিতীয় ছোট রাজ্য এবং এর লোকসংখ্যা সকল রাজ্য থেকে কম। হিমালয়ের পূর্বকোলে অবস্থিত দেশটি জীববৈচিত্র্যের জন্য প্রসিদ্ধ। প্রায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া বিরাজ করলেও শীতে উচুঁ বৃক্ষ পর্যন্ত বরফে ঢেকে যায়। পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা এখানেই অবস্থিত। সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। এটি সিকিমের সবচেয়ে বড় শহরও। সিকিমের শতকরা ৩৫ ভাগ অঞ্চল কাঞ্চনজঙ্ঘা জাতীয় পার্কের অর্ন্তগত। এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। 

নামগাইয়াল রাজত্ব ১৭ শতকে রাজধানী সিকিমের পত্তন ঘটায়। ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ রাজত্বে এটি রাজকীয় রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। বৌদ্ধ পুরোহিত চৌগয়াল এর শাসক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে এটি ভারতের করদ রাজ্য ছিল। হিমালয় আশ্রিত রাজ্যগুলোর মধ্যে এখানে শিক্ষিতের হার বেশি, মাথাপিছু আয়ও বেশি। ১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্র বিরোধীরা দাঙ্গা সৃষ্টি করলে সেনাবাহিনি ক্ষমতা দখল করে। গণভোটের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটে এবং ভারতের ২২তম রাজ্যে পর্যবসিত হয়। নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হলে সেনারা ব্যারাকে ফিরে যায়। 

তৃতীয় পর্ব : লোলেগাঁও ও গ্যাংটক ভ্রমণের দিনরাত্রি 

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়