ঢাকা     শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৪ ১৪২৭ ||  ৩০ মহরম ১৪৪২

হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান: চতুর্থ পর্ব

ইকরামুল হাসান শাকিল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৫৯, ৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
হিমলুং শিখরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান: চতুর্থ পর্ব

মুহিত ভাই বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের নিউজ লেটার ‘শিখর পেরিয়ে’র জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৮-এর ৬১ তম সংখ্যায় ‘মিস এলিজাবেথ হাউলের সাথে’ শিরোনামে একটি স্মৃতিচারণ লেখেন। তিনি লিখেছেন: ‘বাংলাদেশ থেকে প্রথম আট হাজার মিটার পর্বতে অভিযান হয় ২০০৮ সালে। সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে আমি আর নূর মোহাম্মদ পৃথিবীর ৮ম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ মানাসলু (৮ হাজার ১৬৩ মিটার) অভিযানে যাই। সেবার আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা হয় হিমালয়ান ডাটাবেজের ভলান্টিয়ারের মুখোমুখি হওয়ার। তারপর আমি আরো ১৫ বার এই ইন্টারভিউ দিয়েছি। এতোবার ইন্টারভিউ দেয়ার কারণ, সর্বসাকুল্যে পাঁচটি আট হাজার মিটার পর্বতে মোট আটবার অভিযান করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এই আটটির মধ্যে চারটি অভিযানে সফল হতে পেরেছি এবং বিরূপ আবহাওয়ার জন্য বাকি চারটি সফল হয়নি।

মিস এলিজাবেথ হাউলের সঙ্গে আমার দেখা হয় ২০১৩ সালে। সে বছরের এপ্রিল-মে মাসে গিয়েছিলাম পৃথিবীর ৩য় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজংঘা (৮ হাজার ৫৮৬ মিটার) অভিযানে। সেটা ছিলো আমার আট হাজার মিটারের ৭ম অভিযান। ততদিনে হাউলের বয়স নব্বই ছুঁয়েছে। বয়স হয়েছে বলে তিনি তখন আর ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য আসেন না। যারা ইন্টারভিউ নিতে আসেন তারা সবাই হিমালয়ান ডাটাবেজের ভলান্টিয়ার। নেপাল ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভলান্টিয়ার মিস এলিজাবেথ হাউলের হয়ে হিমালয়ান ডাটাবেজের জন্য কাজ করেন। কাঞ্চনজংঘা অভিযান থেকে কাঠমান্ডুতে ফেরার পর আমার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য মিস এলিজাবেথ হাউলে নিজে থামেলে আমার হোটেলে আসেন। মিস হাউলেকে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। তিনি আমার সঙ্গে করমর্দন করে বলেছিলেন, তোমরা সমতলের মানুষ, তোমাদের দেশে তো কোনো উচ্চতাই নেই। তাপমাত্রাও তো কখনও শূন্য ডিগ্রি হয় না। সমতলের মানুষ হয়ে তুমি আট হাজার মিটারের পর্বতে অভিযান করছো বারবার; তাই তোমার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য আমি নিজে এলাম।

অসামান্য সেই পর্বতপ্রেমীকে আমি বলেছিলাম, আমি ছোটবেলায় কখনও ভাবিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়ে উঠব। হিমালয়ে যাব, এভারেস্টে উঠব, সেটা ছিল স্বপ্নের বাইরে। বড় হওয়ার পর বায়োজ্যেষ্ঠদের উদ্যোগে আমাদের পর্বতারোহণের লক্ষ্য স্থির হয়েছিল। আমি শুধু ধৈর্য্য ধরে সেই লক্ষ্যের পেছনে লেগে ছিলাম; বাকিটুকু ধীরে ধীরে হয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি কোনো মানুষ যদি সততার সাথে, ধৈর্য্য ধারণ করে একাগ্রচিত্তে কোনো কিছুর জন্য লেগে থাকে তবে একদিন সে তার স্বপ্নের শিখরে পৌঁছাতে পারে।’

জীবন শ্রেষ্ঠা আর মুহিত ভাইয়ের পর্বতারোহণ নিয়ে গল্প হচ্ছে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি তাদের কথা। এবারই প্রথমবারের মতো আমার নাম হিমালয়ান ডাটাবেজে নথিবদ্ধ হলো। নিজের অজান্তেই এক ভালো লাগা কাজ করতে লাগলো। পৃথিবীর সব বিখ্যাত পর্বতারোহীর সঙ্গে আমার নামটাও লেখা হচ্ছে- ভাবতেই আনন্দ হচ্ছে। আমরা কবে কোথায় থাকবো, টিমে কতজন পর্বতারোহী, কতজন শেরপা, সম্ভাব্য চূড়ায় আরোহণের তারিখ ইত্যাদি তথ্য নিলেন। আবার যখন অভিযান শেষ করে কাঠমান্ডুতে ফিরে আসবো তখন আবার তথ্য নিতে আসবেন বলে জানালেন। আমাদের অভিযানের তথ্য নিয়ে জীবন শ্রেষ্ঠা চলে গেলেন। এর মধ্যে আবার চলে এলেন দাওয়া শেরপা। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তার ছোট্ট ভাতিজিকে। তাদের কোম্পানির নাম ইমাজিং নেপাল। তিনি আমাদের জন্য দুটো ডাফল ব্যাগ নিয়ে এসেছেন। তিনি জানালেন কাঠমান্ডুতে আমাদের দুদিন থাকতে হতে পারে। কারণ দুর্গাপূজা। পূজার কারণে ছুটি চলছে নেপালজুড়ে। তাই গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে যদি গাড়ি ম্যানেজ হয়ে যায় তাহলে পরশু আমরা কাঠমান্ডু থেকে অভিযানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবো। দাওয়া শেরপা চলে গেলে আমরাও কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বের হলাম।

আমাদের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনতে হবে। সন্ধ্যার পরে এলাম নর্থফেসের শো-রুমে। এখান থেকে আমার কিছু পোশাক নিলাম। নর্থফেসের ম্যানেজার সাবিনা। সে মুহিত ভাইয়ের বন্ধু। এবারই জানতে পারলাম তাদের বন্ধুত্ব ষোল বছরের। হয়তো সে কারণেই নর্থফেসের এই শো-রুমকে আপন মনে হয়। মুহিত ভাইয়ের জন্যেও এখানে বিশেষ ছাড় থাকে সবসময়। আমি আগে আরো দুবার এসেছি অভিযানে, তাই সাবিনা দিদির সাথে আগেই পরিচয় হয়েছে। সদা হাসিখুশি মিশুক মানুষ। আমাকে ও মুহিত ভাইকে একটি করে নর্থফেসের নেক-পিলো ও হ্যান্ড ব্যাগ গিফট করলেন।

কেনাকাটা শেষ করে হোটেলে ফিরে এসে জিনিসপত্র রেখে বেরিয়ে এলাম রাতের খাবার খেতে। দিনের আলোর চেয়ে রাতের রঙিন সোডিয়াম আলোতে কাঠমান্ডুর থামেল সুন্দর দেখায়। থামেলের প্রতিটি অলিগলি পর্যটক, ট্রেকার ও পর্বতারোহী দ্বারা মুখরিত থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ভিড় এখানে। কতো বাহারি রং-বেরঙের পোশাক পরা। প্রাতিটি দোকান, ফুটপাত, খাবারের দোকান বিদেশীদের দখলে। কেউ কেনাকাটা করছে। কেউ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আবার বড় বড় ব্যাগপ্যাক কাঁধে নিয়ে নিজস্ব গন্তব্যে হেঁটে চলছে। এই থামেলে বেশিরভাগ ট্রেকার ও পর্বতারোহীদের ভিড় থাকে সবসময়।

মুহিত ভাইয়ের আরো এক বন্ধু বিনোদ মানি। সেও ভীষণ দারুণ মানুষ। সব সময় যেন তার মুখে হাসি লেগেই থাকে। মাকালু ই-টেডার্স নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। আমরা প্রথমেই তার শো-রুমে চলে এলাম। তারপর তাকে সঙ্গে নিয়ে আমার আন্টির হোটেলে ডিনার করতে গেলাম। মাকালু ই-টেডার্স আর আন্টির হোটেল পাশাপাশি। আন্টির এই হোটেলের নাম ওয়েস্টার্ন তন্দুরি। ছোট একটি দোকান। পরিপাটি বলতে তেমন কিছু নেই। দোকানে মোট ৬টি টেবিল রাখা। প্রতি টেবিলে ৪ জন করে বসতে পারে। ভীষণ রকমের বিনয়ী এক মাঝবয়সী মহিলা এই খবার হোটেলের মালিক। সে নিজেই এই খাবার হোটেলটি পরিচালনা করে। সবাই তাকে ‘আন্টি’ বলেই ডাকে। আর সে কারণেই এটি ‘আন্টির খাবার হোটেল’ নামেই পরিচিত।

হোটেলে তেনজিং ও রাজু নামে দুটি ছেলে কাজ করে। তাদের দেখতেও অনেকটা একই রকম লাগে। তেনজিং গোল একটি চশমা পরে, দেখতে অনেকটা হ্যারি পটার মুভির নায়কের মতোই। তারা দুজনেই সাদা টি-শার্ট ও অ্যাপ্রোন পরে কাজ করে। তাদের মধ্যে কখনো কপালে ক্লান্তির রেখা চোখে পরেনি। হাসিমুখেই তারা ব্যস্ততা সামলে নিচ্ছে। তন্দুরি ও নানরুটি বানানোতে তেনজিংয়ের জুড়ি নেই। তেনজিং ও রাজু ছাড়াও আরো তিনজন ছেলে কাজ করে এখানে। থামেলে এই একটি খাবার হোটেলেই দেখেছি লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে খেতে হয়। আর এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরাই মূলত খাবার খায়।

আমরাও লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। একটা টেবিল খালি হলেই সিরিয়ালে থাকা মানুষটিকে ডেকে বসানো হচ্ছে। কিছু সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমাদের ডাকা হলো। ভেতরে গিয়ে বসেই রাজুকে মুহিত ভাই খাবারের অর্ডার করলেন। ভাত, রাইশাক, চিকেন, ডাল দিয়ে হয়ে গেলো রাতের খাবার। খাবার শেষ করেই দ্রুত চলে এলাম হোটেলে। কী কী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হবে ঢাকা থেকেই তালিকা তৈরি করে আনা হয়েছে। আজ যে সব জিনিস কেনা হলো সেগুলো ভালো করে দেখে গুছিয়ে রাখলাম। বাকিগুলো সকালে কেনা হবে। অবশ্য কাল সারাদিন কেনাকাটাতেই চলে যাবে। সময় যত যাচ্ছে আমার উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছে। (চলবে)

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়