ঢাকা, বুধবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গ্রাম্য দ্বন্দ্বের সর্বশেষ শিকার তুহিন?

জেলা সংবাদদাতা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১৬ ১০:৫৬:৩০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১৭ ১২:৪০:০৩ পিএম
নিহত তুহিনের বাবা আব্দুল বাছির। তিনিও সন্তান হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন

এক সন্তান জন্ম দেয়ার ১৫ দিন পর আরেক সন্তানহারা হলেন মা মনিরা বেগম (৩৫)। এখন সন্তানশোকে বাকরুদ্ধ তিনি। কথা বলছেন না কারো সঙ্গে। তার বড় ছেলের বয়স সাড়ে সাত বছর। মেজ ছেলে নিহত তুহিনের বয়স পাঁচ বছর। ছোট ছেলের তিন বছর। এদের নিয়ে ছিল মনিরা বেগমের সংসার।

রোববার রাতে নিমিষে মনিরার সাড়ে নয় বছরের সাজানো সংসারে নেমে আসে অন্ধকার। সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বাবা-মায়ের কোল। অভিযোগ উঠেছে- এই বাবার কোলে প্রাণ দিতে হয়েছে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনের। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে আব্দুল বাছির নিজের সন্তানকে খুন করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। 

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে তুহিনকে নৃশংসভাবে গলাকেটে হত্যা করা হয়। ছুরিকাঘাত করা হয় পেটে; কেটে নেয়া হয় একটি কান ও পুরুষ-অঙ্গ। এরপর ঝুঁলিয়ে রাখা হয় বাড়ির পাশের সড়কের কদমগাছে।

এলাকাবাসী জানান, কেজাউড়া গ্রামের দুই পক্ষের মধ্যে খুন, লুটপাট, বিষ দিয়ে মাছ নিধনসহ বিভিন্ন অপরাধের ১০টি মামলা রয়েছে। গত চার বছরে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এই প্রতিহিংসার শেষ বলি পাঁচ বছরের শিশু তুহিন মিয়া। কেজাউড়া গ্রামের বাসিন্দারা কেউ এই দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা বলতে চান না। তবে তুহিন হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান সকলে।

কেজাউড়া গ্রামের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নাম না প্রকাশ করার শর্ত দিয়ে বলেন, গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার মিয়া ও মাওলানা মছব্বির মিয়ার লোকজনের মধ্যে ২০১৪ সালে প্রথমে জমি-জমা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরে একটি খুনের ঘটনা থেকে এই দ্বন্দ্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মছব্বির মিয়া তুহিনের বাবা আব্দুল বাছিরের ভাই। 

২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টায় মছব্বির মিয়ার গোষ্ঠীর অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ নিলুফার বেগম গ্রামের পথ ধরে যাওয়ার পথে খুন হন। এই খুনের মামলার আসামি করা হয় অপরপক্ষের আনোয়ার মিয়াসহ ১২ জনকে।

গত বৃহস্পতিবার আনোয়ার মিয়াসহ ওই পক্ষের লোকজন ছয় মাস কারাভোগ করে বাড়ি ফিরেছেন। নিলুফার বেগম খুন হওয়ার পর আনোয়ার মিয়া ও মছব্বির মিয়ার লোকজনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও মামলা হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়েছে দুই পক্ষ প্রতিপক্ষকে। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে তুহিন।

আনোয়ার মিয়ার ছেলে আতার মিয়া বলেন, ‘‘আমার বাবা আনোয়ার মিয়াসহ আমাদের লোকজন জেল খেটে বের হয়েছেন। শিশু তুহিনকে পরিকল্পিতভাবে তারা (মছব্বির মিয়ার লোকজন) হত্যা করে আমার চাচাত ভাই সালাতুল ও মামা সোলেমানের নাম চাকুতে লিখে রেখেছেন। আমাদের কেউ খুনের সঙ্গে জড়িত নন।’’

তিনি বলেন, ‘‘এর আগে নিলুফার বেগমকে খুন করে তারা আমাদের নিঃস্ব করেছেন। তারা দুটি ঘর লুটের মামলা, দুটি জলমহালের মাছ লুটের মামলা এবং তিনটি ফৌজদারি মামলা করেছেন। এখন আরেকটি নতুন মামলা সাজিয়েছেন। আমরা ন্যায় বিচার চাই।’’

নিহত তুহিনের চাচা সাবেক ইউপি সদস্য মুনসুর আলী বলেন, ‘‘আগে আমাদের গৃহবধূ নিলুফা বেগম খুনের সময়ও তারা বলেছিলেন- ‘আমরা খুন করে, তাদের আসামি করেছি’। পরে তদন্তে দোষী কারা বেরিয়ে এসেছে। এই ঘটনারও আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই। দ্বন্দ্ব সংঘাত বড়দের মধ্যে আছে, পাঁচ বছরের শিশু কী দোষ করেছে। আমরা কাউকে দোষছি না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দোষী খুঁজে বের করবে। তারা আগেই কীভাবে বুঝে নিল- আমরা আমাদের সন্তান খুন করে তাদের কথা বললো। অপরাধী নিশ্চয় বের হবে।’’  

তিনি জানান, আনোয়ার মিয়ার লোকজনের সঙ্গে খুনসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে তাদের।

স্থানীয় রাজানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৌম্য চৌধুরী বলেন, এলাকার মানুষ স্তম্ভিত। রোমহর্ষক এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার চান। এই বিষয়ে কেউ কারো পক্ষে-বিপক্ষে বলছেন না। শিশুটি কারো পক্ষে-বিপক্ষে ছিল না। শিশু তুহিন হত্যার বিচার চায় সকলে।

এদিকে, তুহিন হত্যার প্রতিবাদে ও দোষীদের দ্রুত বিচার আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ জজ কোর্ট চত্বরে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল জেলা শাখাসহ বিভিন্ন সংগঠন।

মানববন্ধনে বক্তারা দোষীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব ইন্সপেক্টর আবু তাহের জানিয়েছেন, নিহত তুহিনের বাবা আব্দুল বাছির, চাচা আব্দুল মছব্বির এবং জমশেদ মিয়াকে দিরাই থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ।

তুহিনের চাচা নাছির মিয়া ও আরেক চাচা মৃত ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহিয়ার হত্যার বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত রোববার গভীর রাতে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে নৃশংসভাবে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে হত্যা করে গাছে ঝুঁলিয়ে রাখা হয়।


সুনামগঞ্জ/আল আমিন/বকুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন