ঢাকা     শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

গরুর গাড়ির চল নেই, চাকার কারিগরের সংসারও চলে না

কাঞ্চন কুমার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:১৮, ১৩ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
গরুর গাড়ির চল নেই, চাকার কারিগরের সংসারও চলে না

এখন আর আদিকালের বাহন গরুর গাড়ি কিংবা মহিষের গাড়িতে মানুষ চড়তে চায় না। তাই সেইসব গাড়ির চাকারও আর কদর নেই। তাই থেমেই গেছে কুষ্টিয়ার কাঠের চাকা তৈরীর কারিগরদের ভাগ্যের চাকা। প্রায় বিলুপ্তির পথে এই শিল্পটিকে কোন রকমে ধরে রেখেছে কয়েকটি কারিগর পরিবার।তাতে যে আয় হয়, তা দিয়ে চলছে না তাদের সংসার।

কুষ্টিয়ার সর্ববৃহৎ চাকা তৈরীর এলাকা দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি গ্রাম।বছর দশেক আগে এখান থেকে কাঠের চাকা তৈরী হয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে যেত। প্রায় সারাদিন-সারারাত কর্মব্যস্ত থাকতো এ অঞ্চলের চাকা তৈরীর কারিগররা।

দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি গ্রামের চাকা তৈরীর কারিগর পরিমল কুমার (৭০) বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশা, যতদিন পারি টিকিয়ে রাখবো। সেই ছোট বেলা থেকে এ পেশায় আছি। আমিসহ আমার আগের সাত পুরুষ এ পেশায় ছিলো। এতে তো এখন আর লাভ নেই, তাও করি। কি আর করবো?

আরেক কারিগর বাবু কুমার (৪৫) জানান, বর্তমানে মানুষ এই কাঠের চাকা আর বেশি ব্যবহার করে না। যার ফলে দিন দিন আমাদের কাজ-কর্ম ফুরিয়ে আসছে। আর বাজারে কাঠের দামও বেশি। এতে যে লাভ হয়, তা দিয়ে কোন রকমে সংসারটা টিকিয়ে রেখেছি।

তিনি জানান, ‘এক জোড়া চাকা তৈরী করতে একজন দক্ষ কারিগরের ১০-১২ দিন সময় লাগে। এতে সাত হাজার টাকার কাঠ লাগে। কিন্তু বাজারে বর্তমানে এক জোড়া চাকার দাম মাত্র ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। তারপরে আরও আনুসাঙ্গিক খরচ তো আছেই।’

কারিগর উপানন্দ (৪৫) বলেন, ‘আমি বিশ বছর ধরে এ পেশায় আছি। কাজ-কাম আগের মতো আর হয়না। মাসে দুএকটা চাকা তৈরীর অর্ডার আসে। তাই বসে বসে করি। গত কয়েক বছর আগে এখানে প্রায় প্রতিদিন একশো কারিগর কাজ করতো। বর্তমানে মাত্র তিন-চার জন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে যারা কাজ করতো তাদের বেশিরভাগ কারিগররা এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। আমরাই কয়েকজন মিলে কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছি বাপ-দাদার রেখে যাওয়া এই শিল্পটি। আমরা চাইনা, চোখের সামনে এটি নষ্ট হয়ে যাক।’

চাকা ব্যবসায়ী আব্দুস সোবহান (৫৫) বলেন, ‘বর্তমানে কাঠের চাকার বাজার তেমন একটা ভালো না। বাজারে বেচা-বিক্রি তেমন একটা নেই। মানুষ প্রায় গরু ও মহিষের গাড়ি চালানো ছেড়েই দিয়েছে। তাই এ চাকার কদরও কমে গেছে। এমনও দিন ছিলো দিনে ৫-৭ জোড়া কাঠের চাকা বিক্রি করতাম কিন্তু এখন মাসে ৪-৫ জোড়া চাকা বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

শুধু দৌলতপুরেই নয়, মিরপুর,খোকসা, কুমারখালী, ভেড়ামারাসহ কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় একই অবস্থা কাঠের চাকা তৈরীর কারিগরদের। বাজারে কাঠের মূল্য বৃদ্ধি ও যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গরু ও মহিষের গাড়ী ব্যবহার কমে যাওয়াকেই দায়ী করছে ঐতিহ্যবাহী চাকা তৈরীর কারিগররা।

দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহম্মেদ মামুন বলেন, ‘এক সময় খলিসাকুন্ডি গ্রামে চাকা তৈরীর খুটখাট শব্দে এলাকার মানুষের ঘুম ভাঙতো। এখন আর শব্দে ঘুম ভাঙে না। গরু ও মহিষের গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে এই চাকা শিল্পিরাও দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছেন। দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে এদের টিকিয়ে রাখতে হবে বলে আমি মনে করি।’

 

কুষ্টিয়া/কাঞ্চন কুমার/সাজেদ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়