পোস্টাল ভোটে পিছিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
আসাদ আল মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: সংগৃহীত
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। চারদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও ভোটের উত্তেজনা থাকলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পোস্টাল ভোটে অংশগ্রহণ আশানুরূপ নয়। প্রথমবার অনলাইনে ভোটের সুযোগ থাকলেও দায়িত্বের চাপ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানায়, আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটগ্রহণে মোট ১৭ লাখ ৪৩ হাজার জনবল নিয়োজিত থাকবে। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনি কাজে দায়িত্ব পালন করবেন।
ভোটগ্রহণে রিটার্নিং কর্মকর্তা থাকবেন ৬৯ জন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ৫৯৮ জন, প্রিজাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৪ জন। পোস্টাল ভোট পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবেন প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচনী দায়িত্বের চাপ এতটাই যে পোস্টাল ভোটে অংশ নেওয়া গৌণ হয়ে পড়েছে। ঢাকায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তা নিজ ভোটার এলাকার বাইরে অবস্থান করছেন। তাদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালন ও পরিবারের নিরাপত্তার কারণে ভোট দিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকার একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক আবিদুল হাসান বলেন, “ভোটের সময় এলাকায় গেলে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকে। দীর্ঘ ছুটিতে পরিবারের সবাই গ্রামে গেলে নিজে দায়িত্ব পালন করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভোট দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে যায়।”
সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, ভোটের দিন আমাদের ব্রাঞ্চ খোলা রাখতে হয়। এর মধ্যে পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন, ব্যালট গ্রহণ এবং ফেরত পাঠানোর সময় বের করা কঠিন।
সচিবালয়ের তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, “পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা বিবেচনায় ভোট দিতে এলাকায় যাওয়ার বিষয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। ডিউটি নেই বলে মনে হতে পারে ভোট দেওয়া সহজ, কিন্তু পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকে ভোট দিতে পারছে না।”
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, (৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সকাল ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত) পোস্টাল ভোট বিডি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত ভোটারদের ভোটদান কার্যক্রমে এ পর্যন্ত যা অগ্রগতি হয়েছে তা তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে প্রেরিত ব্যালটের সংখ্যা- ৬,৯৪,১৪৬টি। ভোটারদের মাধ্যমে ব্যালট গ্রহণ করা হয়েছে- ৩,২৪,০০২টি, ভোটার কর্তৃক ভোট প্রদান সম্পন্ন হয়েছে- ২,৫৯,৩৯৪টি, ভোটার কর্তৃক পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে জমা দেওয়া হয়েছে- ২,১৩,৬৯৭টি, রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক গৃহীত ব্যালটের সংখ্যা- ৩০,৭০৬টি। এতে দেখাচ্ছে, ব্যালট পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত ভোট গণনায় বড় অংশ পৌঁছায়নি।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত ওসিভি এসডিআই প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে দেশ ও প্রবাস মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার পোস্টাল ভোট বিডি মোবাইল অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন।
নির্বাচনের সময় সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ভোট কমানোর বড় কারণ। সরকারি একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভোটার এলাকার বাইরে গিয়ে পরিবার-পরিজনকে ঝুঁকিতে ফেলা সম্ভব নয়। অনেকে নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটিতে পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে নিজ দায়িত্ব পালন করছেন।
মৎস্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ডিউটি পালন করাটাই বড় কাজ। ভোট দেওয়া গৌণ হয়ে গেছে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত ভোটে অংশ নিচ্ছেন না।
অনেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ নয়। কেউ কেউ একাধিকবার চেষ্টা করেও নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারেননি। এছাড়া কেউ ব্যালট হাতে পেলেও সময়মতো পূরণ করে ফেরত পাঠাতে পারেননি।
একজন উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, অ্যাপ ব্যবহার করে নিবন্ধন করেছি। কিন্তু ব্যালট কখন আসবে, কীভাবে ফেরত দিতে হবে এ বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা নেই। কিছু কর্মকর্তা ব্যালটের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে নির্বাচন কমিশন আশ্বস্ত করেছে যে ব্যালট নিরাপদ।
একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ভোট দিতে না পারেন, তাহলে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আরো সহজ, বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরাপদ পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভোটাধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারসাম্য না থাকলে অংশগ্রহণের হার কম থাকে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “অনেকে শুরুতে ভেবেছিলেন দায়িত্ব পড়বে না, তাই পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেননি। পরে দায়িত্ব পেয়ে শেষ সময়ে নিবন্ধনের চেষ্টা করলেও অনেকেই বাদ পড়েছেন।”
তিনি আরো বলেন, “ব্যাপক প্রচারের পরও কেউ পোস্টাল ভোট সম্পর্কে অবহিত না থাকলে তা ভোট শেষে বিশ্লেষণ করা হবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করছে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সহজতা, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং ব্যালট গ্রহণ ও ফেরতের নির্ভরযোগ্যতার উপর। যদি এই ব্যবস্থায় আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়, ভবিষ্যতের নির্বাচনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটাধিকার আরো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, “পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেবে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের এবং সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য আরও পরিকল্পিত প্রচার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।”
ঢাকা-৫ আসনের ভোটার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা ভোটাধিকার প্রয়োগে সরাসরি অংশ নিতে পারছেন না। দায়িত্বের ভার, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পোস্টাল ভোটের জটিল প্রক্রিয়া ভোটারদের বাধ্য করছে, অনেকেই ভোট থেকে দূরে থাকছেন। পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা হলে এটি ভবিষ্যতের নির্বাচনে সরকারি কর্মকর্তাদের ভোটাধিকার সুরক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।”
ঢাকা/এএএম/এস