‘একজন রাক্ষস পাশে নিয়ে ঘুমাতাম’ সংসারজীবন নিয়ে সিঁথি
সিঁথি সাহা
ভালোবেসে নিউজিল্যান্ড প্রবাসী এক তরুণকে বিয়ে করেছিলেন সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা। এ সংসারে তাদের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। তবে এ সংসার সুখের হয়নি শিল্পীর। কয়েক দিন আগে একটি পডকাস্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। সংসার জীবনের অজানা অধ্যায় ভাগ করে নেন। সিঁথি সাহা জানান—একজন রাক্ষস পাশে নিয়ে ঘুমাতেন তিনি।
এ আলাপচারিতায় সঞ্চালক জানতে চান, প্রেম-বিয়ে নিয়ে আপনার একটা খামখেয়ালিপনা ছিল। আপনার কি মনে হয় এটা অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত ছিল? জবাবে সিঁথি সাহা বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই তাই মনে হয়। কারণ আমার বিয়েটাই ভুল ছিল। যে বিয়ের কারণে আমার ক্যারিয়ার নষ্ট হলো। ২০১০-১১ সাল আমার উঠতি ক্যারিয়ার ছিল। আমি রাইজিং সুপারস্টার ছিলাম। ওই সময়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া, পাগলের মতো প্রেমে পড়ে নিউজিল্যান্ড চলে যাওয়া, অবশ্যই একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এটা কোনো হ্যাপি ম্যারেজ ছিল না। আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে।”
প্রেম করে বিয়ের পরও এমনটা কেন হলো? এ প্রশ্নের উত্তরে সিঁথি সাহা বলেন, “এ বিয়েতে আমার বাবা-মা কেউই রাজি ছিলেন না। আমার পাগলের মতো প্রেম, তারপর বিয়ে। ছেলেও আমাকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া ছিল। আমাকে বিয়ে করার জন্য নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে চলে আসে। তারপর বিয়ে হয়। এটা একটা অসম সম্পর্ক ছিল।”
সিঁথি সাহা
খানিকটা ব্যাখ্যা করে সিঁথি সাহা বলেন, “শুরুতে তাদের (শ্বশুরবাড়ির লোকজন) কাছে আমার গান ভালো লাগত। বিয়েটা হয়ে যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে নিয়ম করা হলো—রাত ৯টার পর আমি বাড়ির বাইরে থাকতে পারব না। সুতরাং আমি আর রাতে কোনো শো করতে পারতাম না। আমার বন্ধুরা দাওয়াত দিলেও যেতে পারতাম না। আর যদি যেতামও তাড়াতাড়ি চলে আসতাম। এমনকি, এখনো সেই আতঙ্ক কাজ করে; আমাকে রাত ৯টার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে। ওই বাসার মধ্যে অসুস্থ একটা পরিবেশ ছিল, আমি অ্যাবিউজড হয়েছি।”
প্রেম পবিত্র জিনিস। বিয়ের আগে তো ক্যারিয়ার নিয়েও কথাবার্তা হয়, সেরকম কিছু আপনাদের হয়নি? জবাবে সিঁথি বলেন, “প্রেম তো মানুষ অন্ধভাবে করে। বিয়ের আগে এতসব বুঝতে পারি নাই। তখন ওরা যথেষ্ট বিনয়ী ছিল।”
সিঁথি সাহা
একটি ঘটনা বর্ণনা করে সিঁথি সাহা বলেন, “বিয়ের পর যেদিন আমি ওদের বাড়ি গেলাম। বিয়ের পরের দিন ওর বাবা-মা-বোন সবাই মিলে একটা গোল মিটিং করছিল। সেখানে আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, ‘গীতা ছুঁয়ে বলো—তুমি আর তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবে না।’ বিয়ের দিন একটা সমস্যা হয়েছিল, সেটা নিয়ে এমন বক্তব্য আসে। কিন্তু তাই বলে এটা তো হতে পারে না! এটা একটা ছোট ঘটনা। যাইহোক, বাসাটার মধ্যে একটা অসুস্থ পরিবেশ ছিল; আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কারণ আমি মানসিক-শারীরিকভাবে অ্যাবিউজড ছিলাম।”
সিঁথিকে তার স্বামী নির্যাতন করতেন। এ তথ্য স্মরণ করে এই শিল্পী বলেন, “আমি ছোটবেলায় ভূত খুব ভয় পেতাম। আমি ওয়াশরুমে গেলেও মা দাঁড়িয়ে থাকতেন। যেদিন আমার বিয়ে হয়েছে, তারপর থেকে আমি আর ভূত ভয় পাই না। কারণ আমি আমার পাশে একজন রাক্ষস নিয়ে ঘুমাতাম। দেখা যেত, রাতে কোথাও থেকে ফিরল, এসেই আমাকে টর্চার করা শুরু করল। একপর্যায়ে আমার জীবন হুমকির মুখে পড়ে গেল। ওর বাবা-মা থানায় জিডি করতে গেল। এটা বাংলাদেশের ঘটনা, নিউজিল্যান্ডেও এরকম হয়েছে।”
সিঁথি সাহা
সংসার টিকানোর চেষ্টা করেছেন সিঁথি। সবশেষে তা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সিঁথি সাহা বলেন, “আমরা তো বাবা-মাকে দেখেই বড় হই। আমাদের হিন্দু ধর্মে বলা হয়, একটাই স্বামী। বিয়ে একবারই হয়। একটু সহ্য করো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ওর মা-ও বলত, বাবু (সিঁথির স্বামী) ছোট মানুষ, একটু ধৈর্য ধরো সব ঠিক হয়ে যাবে। এই ঠিক হয়ে যাওয়ার চক্করে আমার জীবন থেকে ১০টি বছর নাই হয়ে গেছে। শেষ অধ্যায়ে কী পেলাম? কিছুই না। চেষ্টা করলাম সংসার টিকানোর, সংসারও টিকলো না, ক্যারিয়াও নষ্ট হয়ে গেল। আর এই যে ট্রমা নিলাম, এই ট্রমার কারণে এখনো রাতেরবেলায় মনে হয়, কেউ আমার উপরে হামলে পড়বে!”
কন্যার সঙ্গে সিঁথি সাহা
শৈশবে মায়ের কাছ থেকে সংগীতের হাতেখড়ি সিঁথি সাহার। তারপর শাস্ত্রীয়, লোক ও আধুনিক সংগীত রপ্ত করেন ছায়ানট ও সম্মেলন পরিষদ থেকে। রবীন্দ্রসংগীতের জন্য চারটি জাতীয় পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা পেয়েছেন এই শিল্পী। এরই মধ্যে তার শরীরে ক্যানসার বাসা বেঁধেছিল। তবে এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে সুস্থ হয়েছেন। এখন সন্তান ও গান নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন এই শিল্পী।
ঢাকা/শান্ত