ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২২ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

গণভোটের রায়ে নির্ধারিত হবে দেশের নতুন শাসন কাঠামো

আসাদ আল মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৪৩, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
গণভোটের রায়ে নির্ধারিত হবে দেশের নতুন শাসন কাঠামো

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দেশের শাসন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের রায়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনের পথে দেশ এগোবে কি না। এই গণভোট কেবল মতামত প্রকাশ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের প্রশ্ন থাকবে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে কি হ্যাঁ ভোট দিবেন? না ভোট দিবেন।

আরো পড়ুন:

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভোট শুধু একটি সাধারণ গণমত প্রকাশ নয়, এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদের কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেমন হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তনের পথ খুলবে। সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য আগামী সংসদ কেবল নিয়মিত আইন প্রণয়নের দায়িত্বই পালন করবে না, বরং সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে এবং এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার পরিবর্তন

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয়। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কমিটিতে সরকারি দল, বিরোধী দল এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিও থাকবেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিটি যাদের বাছাই করবে, তাদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতি করবেন।

এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী পদে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকতে পারবেন এবং একই সঙ্গে দলের প্রধানের পদে থাকবেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা কমবে।

বিএনপি সূত্র জানায়, এই ধারা নিয়ে তাদের কিছু ভিন্নমত রয়েছে, তবে প্রাথমিক আলোচনায় কিছু সমঝোতা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সম্প্রসারণ

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। এতে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য আরো শক্ত হবে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী  ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের  প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করার জন্য জাতীয় সংসদের একটি কমিটি করা হয়েছিল। তাতে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের সদস্যরা ছিল না। সেই কমিটি ২৫টি বৈঠক, ১০৪ জন ব্যক্তির মতামত নিয়ে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে। তবে কিছু শর্ত আরোপ করা হবে। যেমন ৯০ দিনের বেশি এটা থাকতে পারবে না। বিদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে পারবে না। একটা বৈঠকে সেটা পরিবর্তিত হয়েছে। সেই বৈঠকটা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “সংস্কার বাস্তবায়িত হলে শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। এতে জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা ভাঙবে। কিছু স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে এবং সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ হবে। আমরা বিশ্বাস করি, জুলাই শহীদের আত্মাহুতি বৃথা যাবে না, এ দেশের জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে কথা বলবে এবং সাফল্য ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাববে।” 

সংসদীয় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা

জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, আগামী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। উচ্চকক্ষ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠিত হবে। কোনো একটি দলের একক আধিপত্য থাকা কঠিন হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে নিম্নকক্ষে দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে।

সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা বাড়ানো হয়েছে। অর্থবিল এবং আস্থা ভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এছাড়া, চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের হাতে থাকবে।

সাবেক এক এমপি  জানান, এতে সরকারি দলের একক আধিপত্য কমে যাবে। সংসদে প্রস্তাবিত নীতিমালা ও আইন বিষয়ে সমন্বয় এবং সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।এটা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সংবিধান সংশোধন ও গণভোটের প্রভাব

সংবিধান সংশোধনের জন্য তিনটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপ হলো রাষ্ট্রপতির আদেশ, যা এরইমধ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপ গণভোট, যা জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বৈধতা যাচাই করবে। তৃতীয় ধাপে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবেন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রস্তাবিত সংস্কার সম্পন্ন করবেন। 

গণভোটে না জয়ী হলে সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তখন সংস্কারের ভাগ্য নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কোন দল ক্ষমতায় আসে এবং সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কত। 

স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্য

সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন, দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো হবে। 

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সূত্র জানায়,  এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলো কার্যকরভাবে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি হবে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “সংস্কার বাস্তবায়িত হলে এককেন্দ্রিক শাসনের পথ ভেঙে যাবে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়বে। এটি বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন।” 

অতীত অভ্যুত্থান ও সংবিধান সংস্কারের প্রেক্ষাপট

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের পতন হয় এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার কথা ঘোষণা করে। অক্টোবর ২০২৪-এর প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন খাতে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়।

প্রাথমিকভাবে ১৬৬টি সুপারিশ চিহ্নিত করা হয়, এরপর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সম্পর্কিত। এগুলো জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উচ্চকক্ষ ও অন্যান্য সংস্কার

সংস্কার বাস্তবায়িত হলে উচ্চকক্ষ আগামী সংসদে গঠিত হবে। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, নির্বাচনি এলাকার সীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি বাস্তবায়নের পথ খুলবে।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, এগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু বর্তমান সরকারের অধীনে নয়, ভবিষ্যতের জন্যও শক্তিশালী সংবিধানগত কাঠামো গড়ে উঠবে। এতে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা এবং স্বৈরতন্ত্রের কোনো সুযোগ থাকবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়াকেই প্রকৃত সংস্কার হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, গ“ণভোটে না জয়ী হলে সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে এবং দেশ আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।” 

তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত বহু সুদূরপ্রসারী সংস্কার বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এসব বিষয়ে নাগরিকদের সচেতনভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এর পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হ্যাঁ জয়ী হওয়া মানেই সংস্কার বাস্তবায়ন, আর না জয়ী হওয়া মানেই সংস্কার না হওয়া। সংস্কার না হলে যে সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসবে, তাদের স্বৈরাচারী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” 

বদিউল আলম বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল তিনটি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, সংস্কার এবং বিচার। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে আররো সক্রিয় হতে হবে, নির্বাচনে টাকার প্রভাব বন্ধ করতে হবে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন রোধ করতে হবে। শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত হয় না। এ জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কিছু মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন, যা জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বাক্ষর রয়েছে।”

ঢাকা/এএএম/ইভা 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়