ঢাকা     শনিবার   ২০ জুলাই ২০২৪ ||  শ্রাবণ ৫ ১৪৩১

কিস্তির টাকা না পেয়ে ঘরে তালা, খোলা আকাশের নিচে পরিবার

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ১ মার্চ ২০২৪   আপডেট: ১১:০১, ১ মার্চ ২০২৪
কিস্তির টাকা না পেয়ে ঘরে তালা, খোলা আকাশের নিচে পরিবার

গাজীপুরের শ্রীপুরে চাকরি হারিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঋণ গ্রহীতার ঘরে তালা মেরে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আম্বালা ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিও’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিরুদ্ধে। ফলে তিন সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়েছে স্বামী-স্ত্রীকে। বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ঘরে তালা লাগানো বিষয়টি জানতে পারেন ঋণ গ্রহীতা। 

এর আগে, গত বুধবার বিকেলে শ্রীপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চন্নাপাড়া গ্রামের ফকির বাড়ি জামে মসজিদ এলাকার বাসের সুপারভাইজার আলা উদ্দিন ও গার্মেন্টস শ্রমিক শামীমা আক্তারের ঘরে তালা লাগানোর ঘটনাটি ঘটে।

ঋণ গ্রহীতা শামীমা আক্তার ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার বৈলর ইউনিয়নের দেওয়ানিবাড়ি গ্রামের মো. আলা উদ্দিনের স্ত্রী। প্রায় ২০/২২ বছর আগে স্বামী আলা উদ্দিনের বাবা আবুল বাশার শ্রীপুরের চন্নাপাড়া গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করেন। এরপর থেকে তারা সেখানে বসবাস করছেন। শামীমা পার্শ্ববর্তী ভিনটেজ ডেনিম লিমিটেড নামের একটি তৈরি পোষাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে অপারেটর পদে চাকরি করতেন। সম্প্রতি তিনি চাকরি হারান। স্বামী আলা উদ্দিন এনা পরিবহন বাসের সুপারভাইজার।

ঋণ গ্রহীতা শামীম আক্তার জানান, গত বছরের মে-জুন মাসে মাসিক ৯ হাজার ৫০০ টাকা কিস্তিতে আম্বালা ফাউন্ডেশনের শ্রীপুর শাখা থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। ঋণের টাকায় সাবলম্বী হতে চেয়েছিলেন তিনি। ঋণের টাকা প্রতি মাসেই যথা সময়ে পরিশোধ করে আসছিলেন। জানুয়ারি মাসে গার্মেন্টস থেকে চাকরি হারিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হন তিনি। এছাড়া, তার শ্বাশুড়ি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সংসার, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ, অসুস্থ শ্বাশুড়ির চিকিৎসা সব মিলিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেননি তিনি। 

তিনি আরও জানান, গত মঙ্গলবার সকালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শ্বাশুড়িকে দেখতে ঘরে তালা দিয়ে যান। বৃহস্পতিবার বিকেলে ফিরে এসে ঘরের দরজায় দুইটি তালা দেখতে পাই। প্রতিবেশীরা জানান, এনজিও কর্মীরা তালা লাগিয়েছেন। 

শামীমা বলেন, ‘আমি যখন ১ লাখ টাকা ঋণ নেই, তখন আমাকে ৩২ হাজার নগদ টাকায় বাধ্যতামূলকভাবে একটি সেলাই মেশিন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে ঋণ বাবদ যাবতীয় খরচ ও সঞ্চয় বাদে আমাকে ১ লাখ টাকার বদলে মাত্র ৫৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আমি তখন সেলাই মেশিন না নিতে চাইলে আমাকে ঋণ দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়। আমি ওই টাকায় একটি অটোরিকশা কিনি। প্রতি মাসের প্রথম বুধবার কিস্তি পরিশোধের কথা। আমার মাত্র এক মাস কিস্তির টাকা বকেয়া পড়েছে, তাই তারা (এনজিও কর্মীরা) আমার ঘরে তালা লাগিয়েছে। আমার যদি চাকরিটা না যেতো তাহলে ঋণের টাকা বকেয়া পড়তো না, খেয়ে না খেয়ে আগে ঋণের টাকা পরিশোধ করেছি। আমি এখন আমার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ১৫ বছরের মেয়ে শাহরিয়া আফরিন, ১৩ বছর বয়সী ছেলে মো. মিনহাজ এবং ৬ বছর বয়সী ছেলে আলভিকে নিয়ে ঘরের সামনে বিকেল থেকে অপেক্ষা করছি। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা বলে আমরাও কিস্তির জন্য আপনার ঘরের সামনে গিয়ে বসে থাকি আমাদের খুব কষ্ট হয়, এখন বোঝেন আমাদের কেমন লাগে।’

শামীমার স্বামী আলা উদ্দিন বলেন, ‘দুই জনের আয়ে মা-বাবা ও সন্তান নিয়ে কোন মতো চলতে হয়। এর মধ্যে মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় এ মাসের কিস্তি বকেয়া পড়েছে। আমরা স্বাধ্যমত চেষ্টা করেছি কিস্তি দিতে, কিন্তু মা হাসপাতালে ভর্তি থাকায় দিতে পারেনি। তাই তারা আমার ঘরে তালা মেয়ে দিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে আম্বাল ফাউন্ডেশন শ্রীপুর শাখার মাঠকর্মী কবির হোসেন বলেন, ‘আমাদের লোনটা নিতে গেলে ১ লাখ টাকায় ১০ হাজার সঞ্চয় লাগে, ১ হাজার টাকা বীমা, আনুষঙ্গিক ২৬৫ টাকা খরচ আছে। আর জোর করে সেলাই মেশিন দেওয়ার বিষয়টি হলো, যেদিন আমি ঋণ প্রস্তাব করি উনি আমাকে বলেছিল, এক লাখ টাকা লোন দিলে আমি একটি সেলাই মেশিন নেব। পরদিন যখন স্যাররা ভিজিট করে লোনটি বাদ দেবে উনি আমাকে বলেছিলেন, আমার লোনটা বাদ দিয়েন না। মেশিনটা আমাকে নগদ টাকা দিয়ে দেন। সেই শর্তে মেশিনটা দেওয়া হয়েছে।

ঘরে তালা লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, যখন একটি ঋণের সদস্য বাসায় থাকেন না তখন জামিনদারকে ধরবে এটাই স্বাভাবিক। আমি সবসময়ই তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। তারা ফোন কল ধরছিল না। আমরা বুধবার তাকে বাসায় পাইনি। যাওয়ার সময় ঘরে জামিনদারের উপস্থিতিতে তালা লাগিয়েছি।

কিস্তি না পেয়ে ঘরে তালা লাগানো বিষয়ে আম্বালা ফাউন্ডেশনের শ্রীপুর শাখার ব্যবস্থাপক আশিকুল ইসলাম বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি মাঠকর্মীর দেওয়া বক্তব্য থেকে সরে আসেন। তিনি বলেন, এই একটা ছোট বিষয় নিয়ে কি একটা বিরক্তিকর পরিস্থিতি মধ্যে আছি রে ভাই, বলার মতো না। শামীমা আক্তারকে দেওয়া লোনের কিস্তি সঠিক সময়ে আসছিল না। প্রতি মাসেই মূল কিস্তি থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা কম দিচ্ছিলেন। গত বুধবার সন্ধ্যার কিছু সময় আগে আমার মাঠ কর্মী কিস্তির টাকা জন্য তার বাসায় যায়। কিন্তু, তাদের ঘরের দরজা খোলা থাকলেও তারা বাসায় ছিল না। দীর্ঘ সময় হয়ে গেলেও আমরা তাদের আসার অপেক্ষা করছিলাম। সবশেষ রাতে আসার সময় ঋণের জামিনদারকে ডেকে এনে তার সামনেই ঘরে তালা লাগিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে আম্বালা ফাউন্ডেশনের এরিয়া ম্যানেজার টিটু চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কিস্তির দেওয়ার কথা বলে কর্মকর্তাদের বসিয়ে রেখে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানিক নিয়মে ঋণ খেলাপিদের বাড়িতে তালা লাগানোর নিয়ম নেই। এটা পরিস্থিতির শিকার।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ জামান বলেন, এবিষয়ে কেউ থানায় জানায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রফিক/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়