ঢাকা     শনিবার   ০৯ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৬ ১৪৩৩ || ২২ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গাজীপুরে ৫ খুন: গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে মাতম

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:২৭, ৯ মে ২০২৬   আপডেট: ২১:০০, ৯ মে ২০২৬
গাজীপুরে ৫ খুন: গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে মাতম

নিহতের সংবাদের স্বজনের কান্নায় ভেঙে পড়ে।

ছেলে-মেয়ে, নাতনিদের হত্যায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ফিরোজা বেগম (৬০)। বুক চাপড়ে, বিলাপ করে তিনি শুধু বলছিলেন, ‘‘আমার বাবারে মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার ধনডারে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো রে আল্লাহ...।’’ দুই সন্তান এবং তিন নাতনি হারানোর শোকে বার বার মুর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। 

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচজনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় গোপালগ‌ঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের পাইকান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের বাড়িতে চলছে মাতম। হত্যার ঘটনার খবর আসার পরপর মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।

আরো পড়ুন:

শনিবার (৯ মে) সকালে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রাম থেকে ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন (৩০), মেয়ে মীম (১৫), হাবিবা (১০), ফারিয়া (২) ও শ্যালক রসুল মিয়ার (২২) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক ফোরকানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের সদর উপজেলায় মেরী গোপীনাথপুর এলাকায়। তিনি পরিবার নিয়ে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে বছর খানেক ভাড়া থাকতেন।

বিভিন্ন আলামত ও স্বজনদের ভাষ্য থেকে পলিশ ধারণা করছে, পারিবারিক কলহের জেরে গৃহকর্তা ফোরকান নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। লাশের পাশে গোপালগঞ্জ সদর থানায় দায়ের করা একটি সাধারণ সাধারণ ডায়েরির কপি পাওয়া গেছে। এই সাধারণ ডায়েরিতে পারিবারিক কলহের জন্য স্ত্রীকে অভিযুক্ত করেছেন ফোরকান। যদিও এমন কোনো ডায়েরি করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনিসুর রহমান জানান, লাশের পাশে সাধারণ ডায়েরির (ডিজি) যে কপি পাওয়া গেছে, সদর থানায় এমন কোনো জিডি করা হয়নি।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শাহাদাত ও ফিরোজা দম্পতির চার মেয়ে এবং তিন ছেলের মধ্যে শারমিন আক্তার তৃতীয় ও রসুল মোল্লা সবার ছোট। বড় মেয়ে বিয়ের কয়েক বছর পর ব্যাধিতে মারা যায়।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ী গ্রামের আতিয়ার মোল্লার ছেলে ফোরকান মোল্লার সঙ্গে এই উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের পাইকান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাত মোল্যার মেয়ে শারমিনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েক বছর শশুরবাড়ি থাকার পর দাম্পত্য কলহ শুরু হলে স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে যায় ফোরকান। বছর খানেক আগে কাপাসিয়ায় বসবাস শুরু করে তারা। ভাড়ায় প্রাইভেটকার চালিয়ে সংসার চালাতেন ফোরকান। রসুল মোল্লা তার বড় বোন ফাতেমা বেগমের বাসায় থেকে গাজীপুরে পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।

এক বছর আগে পারিবারিক কলহ হলে শারমিন বাবার বাড়িতে চলে আসে। পরে ফোরকান শশুরবাড়ির লোকদের বুঝিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানকে ফিরিয়ে নেয়। শুক্রবার ফোরকান মোল্লা ফোন করে চায়না কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে শ্যালক রসুল ও ভাগ্নে রকিবকে তার বাসায় আসতে বলে। কিন্তু শ্যালক রসুল গেলেও ভাগ্নে যায়নি। 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শারমিনের মা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘‘আমার বাজান গতকাল নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাসায় গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে...।’’ এ কথা বলেই আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাশে থাকা স্বজনেরা তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। 

নিহত শারমিন ও রসুলের চাচা খবির মোল্লা বলেন, ‘‘আমার ভাই গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার)। অনেক কষ্ট করে অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে সন্তানদের বড় করেছে। রসুল মোল্লা গাজীপুরে পোশাক কারখানায় চাকরি করত। থাকত বড় বোন ফাতেমার বাসায়। গতকাল রসুল শারমিনের বাসায় যাওয়ার পর রাত ৮টায় মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সবাই ভেবেছিল ফোনে হয়ত চার্জ নেই। ভোর সাড়ে ৫টায় জামাইয়ের ভাই (ফোরকান মোল্লার ভাই) জব্বার মোল্লা কল করে বলেন, শারমিনের বাসার সবাই মারা গেছে।’’ 

খবির মোল্লা বলেন, ‘‘কীভাবে মারা গেছে— জানতে চাইলে তিনি বলে, তার ভাই তাদের কল করে জানিয়েছে ‘পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফ্যালাইছি আমাকে খুঁজলে পাওয়া যাবে না’ বলে ফোন কেটে দেয়।’’ 

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘‘বাবা হয়ে কীভাবে সন্তানকে মারতে পারে? সে কি মানুষ?’’ তিনি খুনীর সর্বোচ্চ শাস্তি চান এবং লাশ পাইকান্দি গ্রামে দাফন করা হবে বলে জানান। 

ঢাকা/বাদল/বকুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়