জ্বালানি সংকট এড়াতে বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার
ফাইল ফটো
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংকট এড়াতে বেশি দামে জ্বালানি আমদানিসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে রান্নার গ্যাস এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেসরকারি খাতকে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত এখনো পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিবেচনায় জ্বালানির সরবরাহ সাময়িকভাবে প্রায় ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা থেকে অতিরিক্ত ডিজেল কিনে মজুত করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, গত চার দিনে দেশে প্রায় ৯৮ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেলের মজুত রয়েছে। আগামী সপ্তাহে আরো কয়েকটি জাহাজে ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এদিকে, গ্যাস সরবরাহ নিয়েও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। গ্যাস-সংকটের আশঙ্কায় দৈনিক প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। তবে খোলাবাজার থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনা হচ্ছে। গত বুধবার দুটি কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এর একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া থেকে প্রতি ইউনিট প্রায় ২৪ দশমিক ৫০ ডলার দরে, যা আগামী ২০ মার্চ সরবরাহ হওয়ার কথা। অন্যটি গানভর থেকে প্রতি ইউনিট ২৮ ডলার দরে কেনা হয়েছে, যার কার্গো ১৭ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে একই এলএনজি প্রতি ইউনিট প্রায় ১০ ডলার দরে কেনা হচ্ছিল।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় মনে করছে, এই আমদানির ফলে চলতি মাসে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস সরবরাহ নিয়েও বাজারে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বর এলপিজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় জানুয়ারিতে বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। তখন ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় এক হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল।
বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা হলেও বাজারে অনেক ক্ষেত্রে তা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা আমদানির নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের অভিযোগ, অনেক কোম্পানি দীর্ঘদিন এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। কারও ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় ঋণপত্র খুলতে সমস্যা হচ্ছে। আবার কোনো শিল্পগোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ জটিলতার কারণে সেই গোষ্ঠীর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও এলসি খোলা বন্ধ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা এলপিজি আমদানির জন্য ব্যাংকঋণ সহজ করার দাবি জানান। জ্বালানিমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, “বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”
এদিকে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একটি কোম্পানির প্রায় ১০ হাজার টন এলপিজির চালান আটকে গেছে। এর মধ্যেও বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্রেশ ব্র্যান্ড।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, “বর্তমানে বেসরকারি খাতে যে এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, তা দিয়ে মার্চ মাস পর্যন্ত বড় কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। সে জন্য ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও চীনের মতো বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির চেষ্টা চলছে।”
তিনি বলেন, “দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন হলে বেশি দামে হলেও আমদানি অব্যাহত রাখা হবে।”
জ্বালানি সাশ্রয়ে নির্দেশনা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গ্যাস, জ্বালানি তেল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
গ্যাস ব্যবহারে অপচয় রোধ, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার কমানো এবং পাইপলাইন নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার ও শেয়ারিং ব্যবস্থা উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারি দপ্তরগুলোতে জ্বালানি সাশ্রয়ে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা কমানো এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার নির্দেশ রয়েছে।
ঢাকা/এএএম/ইভা