‘ফ্যাসিবাদ যেন পুলিশকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে’
রবিবার পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেন ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শক্তি পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করতে না পারে, সেই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রবিবার (১০ মে) সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের ভূমিকার ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। আপনারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করবেন; এটাই আপনাদের কাছে সরকারের প্রত্যাশা।”
পুলিশ সদস্যদের নতুন শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শুধু স্মরণের মধ্য দিয়েই আপনাদের-আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যেসব শহীদ পুলিশ ভাইরা আত্মত্যাগ করেছিলেন, যে কোনো মূল্যে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে। স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই পুলিশের রক্তে রঞ্জিত এই মাটিতে দাঁড়িয়ে আসুন, আজ আমরা আবারও নতুন শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হই।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে জনগণের রায়ে গঠিত বর্তমান সরকার। বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য হামলা মামলার শিকার নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অধিকারহারা মানুষ বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে শান্তি এবং নিরাপত্তা চায়।”
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সকল পুলিশ সদস্যকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, “এই সেই ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইন, যেখানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বর্বর হামলা চালিয়ে শত শত ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছিল। আমি আজকের অনুষ্ঠানে প্রথমেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সকল পুলিশ সদস্যকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম। শুধু দেশেই নয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় আমাদের পুলিশ সদস্যরা পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে নারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকাও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সুতরাং শুধু বিদেশেই নয়, দেশের জনগণের সঙ্গেও পুলিশের মানবিক আচরণ প্রত্যাশিত।”
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রজন্ম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম আমরা যারা ইতিহাস পড়ে কিংবা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুনে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছি তাদের মনে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন ইতিহাস নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, “একদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার ‘উই রিভোল্ট’, অন্যদিকে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশের মরণপণ প্রতিরোধ; এরপর স্বাধীনতার লড়াই থেকে স্বাধীনতাকামী মানুষের পিছিয়ে থাকার আর কোনো সুযোগ ছিল না।”
১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উত্তাল মার্চে যখন স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার সৈন্য ঢাকায় আনা হচ্ছিল, তখন সকল পুলিশ সদস্যকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে একসঙ্গে জড়ো করে রাখার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কী কৌশল বা যুক্তি ছিল, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণাকারীদের জন্য এখনও একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।”
বক্তব্যের শেষে প্যারেডে অংশ নেওয়া পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর সার্বিক সাফল্য কামনা করেন তিনি।
ঢাকা/ইভা