ঢাকা     শনিবার   ২২ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৮ ১৪৩১

অস্ট্রিয়া সীমান্তে, আলগয়ে

অহ নওরোজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৩০, ২৬ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ১৫:৩৭, ২৬ এপ্রিল ২০২৪
অস্ট্রিয়া সীমান্তে, আলগয়ে

মোবাইলের ক্যামেরায় নয়েশভানস্ট্যাইন প্রাসাদের সঙ্গে লেখক

ইউরোপে শীতকাল শৈবালজমা পাথুরে সৈকতের মতো, যার চারপাশে গড়ে রাখা আছে গহীন পরিখা। অকারণে কিছুই ভালো না লাগলে বুঝতে হবে পা পিছলে গিয়েছে। আমার অবস্থা আরও করুণ; প্রায় সমস্ত শীতকালই যাপন করতে হয় পরিখার অনুজ্জ্বল আলোতে। এ দেশে আমার বাঙালি বন্ধুর সংখ্যা হাতে গোনা; যে দু’চার জনের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকেই পরিচয় ছিল মূলত তারাই। জার্মানির অন্য শহরে তাদের বসবাস বলে সামনাসামনি বাংলা ভাষায় নিয়মিত আড্ডা দেওয়া অলীক ঘটনার মতো। নতুন করে যারা বন্ধু হয়েছে সবাই বার্লিনের স্থানীয়। তাদের সঙ্গে আড্ডা হয় জার্মান ভাষায়, তবু শীতে অধিকাংশই ঘর ছাড়তে চায় না। ফলে শীতকালে নিয়মিত আড্ডার প্রত্যাশা প্রায়ই বেদনা বয়ে আনে।

এমনই মন খারাপের দিনে মধ্য জার্মানির কাসেল থেকে কবি বোরজাহা মোত্রিসের ফোন পাই। লেখালেখির আদান-প্রদান আর আড্ডার ভেতরে আমাদের সম্পর্ক ঘন হয়েছে অনেক আগেই। জানালেন, স্ত্রী এবং আরও তিনজন বাঙালি বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বছরের প্রাক্কালে কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আমি সঙ্গী হলে হতে পারি।

তেইশ সালের নভেম্বর মাস তখন সবে পড়েছে। রাতে প্রায়ই তাপমাত্রা শূন্য কিংবা তার থেকেও নিচে নেমে যায়। বহুদিন বাংলায় সামনাসামনি কারো সঙ্গে ঘন আড্ডা হয় না। প্রস্তাব শুনে সেই শীতের রাতে সহজেই রাজী হয়ে গেলাম। পরিকল্পনা হলো, ইংরেজি বর্ষবরণের ছুটিতে জার্মানির একেবারে দক্ষিণে অস্ট্রিয়ার সীমান্তে ঝুঁকে থাকা বাভারিয়ান আল্পসের উপত্যকায় ইলার নদীর অববাহিকায় আলগয়-এর লয়েটকিরশে অঞ্চলে খামার বাড়িতে কয়েকদিন অবসরযাপন, এলাকাটা ঘুরে দ্যাখার সঙ্গে রজনীজনিত কারণে ঘুমে ডুবে যাওয়া ভুলে রাতভর-দিনভর কেবলই অনন্ত আড্ডাবাজি, সঙ্গে বাঙালি খানাপিনা। সঙ্গীরা সবাই মধ্য জার্মানির হেসেন প্রদেশের কাসেলে থাকে, সেখান থেকেই দ্রুতগামী বুলেট ট্রেনে করে একসঙ্গে আলগয়-এ রওনা করতে চায়। এ কারণে অগত্যা একদিন আগে আমাকে রাজধানী বার্লিন থেকে কাসেলে যেতে হয়।

বার্লিন থেকে কাসেলে যাই আঞ্চলিক ট্রেনে। পথ প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের মতো। দ্রুতগামী বুলেট ট্রেনে গেলে ট্রেন বদলের ঝামেলা নেই; যাওয়াও যায় কম সময়ে। কিন্তু টিকিটের মূল্য চড়া। এদিকে তেইশ সাল থেকে এ দেশে জার্মান-টিকিট চালু হয়েছে। এক টিকিটে এক মাস পুরো জার্মানিতে দ্রুতগামী বুলেট-ট্রেন বাদে অন্য সকল যানবাহন ব্যবহার করা যাবে। আমি সাধারণত এই টিকিট প্রতি মাসেই কিনি। সপ্তাহান্তে হুটহাট দূরে কোথাও চলে যাওয়া যায়; সাগরের নীল-সফেন জল দেখতে ইচ্ছে হলে চলে যাই রোস্টকে, দেখি বাল্টিক সাগর; পাহাড় দেখতে ইচ্ছে করলে ড্রেসডেনের ওদিকে যাই, এলবে নদীর পাড় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা চেক দেশের পাথুরে পাহাড় দেখি; এক টিকিটে এলবের ফেরি পার হয়ে মাঝে মধ্যে চেক দেশে ঢুকে পড়ি, সীমান্তবর্তী শহরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখি। এই টিকিটের কত সুবিধা! যত ইচ্ছে ভ্রমণ করা যায়, সঙ্গে জলখাবার নিয়ে গেলে একদিনের ভ্রমণে কোনো খরচা নেই বললেই চলে। সবমিলিয়ে আঞ্চলিক ট্রেনেই কাসেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত করি। যেতে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টার মতো লাগবে।

বড় শহর হওয়ায় প্রধান রেলস্টেশন বাদেও বার্লিনে অনেকগুলো আঞ্চলিক রেলস্টেশন আছে। এসবের যে কোনো একটি থেকেই আঞ্চলিক ট্রেন পাওয়া যায়। ঘর থেকে সবচেয়ে কাছের স্টেশনে পৌঁছাতে প্রথমে আমাকে পাতাল রেল ধরতে হয়। বার্লিন থেকে আঞ্চলিক ট্রেনে কাসেলে যেতে দু’বার ট্রেন বদলাতে হবে। দ্বিতীয় বদল জাক্সন-আনহাল্ট রাজ্যের জ্যাঙ্গারহাউজেন স্টেশনে, কিন্তু ওই বদলে সময় পাওয়া যাবে মাত্র চার মিনিট। অর্থাৎ পূর্বের ট্রেন যদি কোনো কারণে দেরি করে তাহলে ট্রেন ছুটে যাবে। আর তা হলে পরবর্তী ট্রেনের জন্য ওই শীতে দুই ঘণ্টা স্টেশনে বসে থাকতে হবে। দুশ্চিন্তা আমাকে কিছুটা অগোছালো করে ফ্যালে। তবু অগণন দুশ্চিন্তার উত্তেজনা হাতের পেছনে লুকিয়ে রেখে ‘যা হয় হবে’ ভেবে যাত্রা শুরু করি। প্রথম গন্তব্য বার্লিন থেকে জাক্সন-আনহাল্টের রাজধানী মাগডেবুর্গ। ট্রেনে উঠে বসার জায়গা পেতে একটু বেগ পেতে হয়। সাধারণ সময়ের তুলনায় ট্রেন বেশ জনাকীর্ণ। জায়গা পেলাম টয়লেটের কাছে একটি সিটে। এ দেশে আঞ্চলিক ট্রেনের টয়লেটকে অভিজাত বাংলায় প্রসাধনী বলা যায়। তার ভেতরে আয়না, টিস্যু, জল, তরল সাবান থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সবকিছুই মেলে বিনামূল্যে। মেঝে একদম ঝকঝকে তকতকে। টয়লেটের কাছে বসলেও দুর্গন্ধের নাম নেই। এ প্রসঙ্গে সুইচ ট্রেনের কথা মনে আসে। এত পরিচ্ছন্ন জার্মান ট্রেনও সুইচ ট্রেনের কাছে গেলে কিছুটা নোংরা মনে হবে। 

ট্রেন চলতে শুরু করলে চারপাশে চোখ রাখি। অধিকাংশ মানুষই মুঠোফোনে ব্যস্ত। আগে যে জাতি ট্রেনে উঠলেই বই পড়তো, সামাজিক মাধ্যমে তাদের ব্যস্ততা বলে দেয় সময় বদলে গেছে ঢের। দুইপাশে যতদূর চোখ যায় দেখি বরফ পড়ে শুভ্র হয়ে আছে। মনে হয় ঢেউহীন শুক্লসমুদ্রে আমাদের ট্রেন এক উষ্ণ ক্যারাভান। নিষ্পত্র নিদ্রারত গাছেরা সরে যেতে থাকে। তাদের সমগ্র শরীরে শূন্যতা প্রকাশিত। তাদেরকে গাছ বলতে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় বরফের ভেতরে কেউ বিশাল বিশাল গাছ উল্টো করে পুঁতে রেখেছে। তখন জানুয়ারি মাস, উত্তরের দেশে এ সময়ে গাছেরা পত্রশূন্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। বার্লিনের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোর ভূমি সাধারণত সমতল, ফলে অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি যায়। সম্ভবত কোনো শহর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে তার ভূমি সমতল হওয়ার সম্পর্ক আছে। আল্পস পর্বতমালায় ঘেরা সুইজারল্যান্ডের জুরিখে গিয়েছি কিংবা ব্যার্নে, আগ্নেয়গিরির উঁচু-নিচু পাথুরে দেশ আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিক অথবা স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যবর্তী পিরিনীয় পর্বতমালার খাঁজে ছোট্ট দেশ আন্দোরার রাজধানী আন্দরা লা ভেয়য়া-য় গিয়ে দেখেছি, সবই প্রায় সমতল।

বার্লিন থেকে যাওয়ার পথে

মাগডেবুর্গে ট্রেন বদলানোর পর জাংগ্যারহাউজেন নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। প্রথম বদলের পর যে ট্রেনে উঠি তার যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে জাংগ্যারহাউজেন পৌঁছাই। যে ট্রেনে এসেছে সেটা দুই মিনিট দেরি করেছে; ফলে দৌড়িয়ে প্ল্যাটফর্ম বদলে ট্রেন ধরতে হয়। তবুও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায়। আর কোনো বদল নেই, এই ট্রেনই আমাকে কাসেল নিয়ে যাবে। জাংগ্যারহাউজেন থেকে ট্রেন বদলানোর পরপরই জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যের ঝাঁক বদলে যেতে থাকে। এদিকের ভূমি তেমন সমতল নয়, ঢেউখেলানো। দূরে পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা তুষারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় চিরসবুজ পাইন গাছ। কে যেন বাংলায় তাদের নাম দিয়েছে সরলবৃক্ষ। মাঝে মাঝে ট্রেন চলে পাহাড়ের পথ ধরে, মাঝে মাঝে দু’পাশে তাকালে বুকের ভেতর ছলাৎ করে ওঠে; খাঁজ নেমে যায় শাসিত পাথরের ভেতরে। তখন বিকেল যায়যায়। ইউরোপে শীতের দিন খুব ছোট। সাড়ে তিনটে বাজতে বাজতেই সন্ধ্যে নেমে আসে। সেদিন মুখের উপর ভেঙে পড়া শেষ বিকেলের রোদ ম্লান হতে হতেই কাসেল পৌঁছে যাই।

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই মন খারাপ হয়ে যায়। আমাদের এক সঙ্গীর জ্বর। তাকে ছাড়াই আমাদের রওনা করতে হবে। সেদিন সকাল থেকেই ঝিরঝির বৃষ্টির কলোরলে সমগ্র কাসেল আমোদিত। ভিজে ভিজে নির্দিষ্ট সময়ে কাসেল থেকে একসঙ্গে আইসিই (ICE) বুলেট ট্রেনে উঠি। এই ট্রেনের গতি মাঝে মাঝে ঘণ্টায় তিনশো কিলোমিটারে গিয়ে ঠেকে। ট্রেনে উঠেই খুশির বদলে কপালে পড়লো দুশ্চিন্তার ভাঁজ। নির্দিষ্ট বগিতে আমাদের সংরক্ষিত আসন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সবার মাথায় হাত! তাহলে কি ভুল ট্রেনে উঠলাম? অসম্ভব! ট্রেনের বগিতে সংযুক্ত বগির মনিটরে যে নম্বর রয়েছে সেটাই তো আমাদের টিকিটে। ঘটনা কী? সঙ্গীদের বললাম, টিটি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাক। ট্রেন কানায় কানায় ভর্তি। অনেকেই নির্ধারিত সিট খুঁজে পায়নি। আমাদের মতো ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটু পরে টিটি আসেন। জার্মান ভদ্রলোকের পরনে খয়েরি টুপি, খয়েরি টাই, সাদা শার্ট আর নীল স্যুট। মুখ শুষ্ক। মনে হচ্ছে সদ্য ফোটা রোদ কোনো কালে সে দ্যাখেনি। সম্ভবত মানুষের জেরা আর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে ক্লান্ত। বায়ার্নের আঞ্চলিকতা মাখানো জার্মানে জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আজকের জন্য এই রুটে তুলনামূলক ছোট অন্য একটি ট্রেন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সে কারণেই পুরো ট্রেন রিজার্ভ-ফ্রি ঘোষণা করা হয়েছে। সিট পেলেই বসে যাওয়া যাবে। যারা সংরক্ষণের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেছে সবাই অর্থ ফেরত পাবে।

দুই বগির মাঝখানের একটি স্থানে আমরা বসে পড়ি। স্বয়ংক্রিয় দরজা বন্ধ হয়ে গেলে দরজার কাছে মেঝের উপরেও বসা যায়। কার্পেটে মোড়ানো মেঝে, ময়লা নেই বললেই চলে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মিউনিখ। ওখান থেকে আঞ্চলিক ট্রেন ধরে আলগয় যেতে হবে। কাসেল থেকে মিউনিখের দূরত্ব ৫০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি। ট্রেনে সময় লাগবে সোয়া ৩ ঘণ্টার মতো। সবকিছুর পরেও মন খারাপ হয় না। বাংলায় আড্ডা হলে আর কী লাগে? ট্রেন যতই দক্ষিণে যেতে থাকে রেলপথের দু’পাশের পাহাড়ের পরিমাণ ততই বাড়তে থাকে।

মিউনিখ প্রধান স্টেশনে যখন ট্রেন থেকে নামলাম তখন দুপুর। নামার সঙ্গে সঙ্গে আল্পস থেকে নেমে আসা হিমশীতল হাওয়া মজ্জায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। আজ তবু শীত তুলনামূলক কম। কিছু দিন আগেও ভারী তুষারপাতের কারণে এই স্টেশন থেকে সব ট্রেনযাত্রাকে বাতিল ঘোষণা করতে হয়েছিল। মিউনিখের প্রধান স্টেশন কাজের পরিধিতে বাংলাদেশের কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে অন্তত তিন গুণ বড়। সবমিলিয়ে প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা ৩২টি। এখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্রেনে যাওয়া যায়। মাটির নিচে প্রতি মিনিটেই ছেড়ে যাচ্ছে পাতাল রেল। হাজার হাজার মানুষের যাওয়া আসায় কর্মব্যস্ত এই স্টেশনে আমাদের দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে পরবর্তী ট্রেন ধরতে হবে।

প্রায় সন্ধ্যার মুখে আমরা আলগয়ের লয়েটকির্শ স্টেশনে পৌঁছাই। এখান থেকে বাস ধরে তবেই বাভারিয়ান আল্পস পাহাড়ের পাদদেশে ক্ষণকালের জন্য ভাড়া করা খামারবাড়িতে যেতে হবে। কিন্তু সবকিছুর আগে চাই বাজার করা। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। জার্মানির প্রায় সব রেলস্টেশনের কাছেই সুপারমার্কেট কিংবা সে ধরনের দোকান থাকেই। কেনাকাটা শেষে বাসে উঠলাম। তখনো বৃষ্টির কমতি নেই। আকাশ ফুটো হয়ে যেন অবিরল জল ঝরছে। ক্রমেই রাত নেমে আসছে। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাওয়া। পৃথিবী যেন আজ রজঃস্বলা হয়েছে। মিনিট বিশেক পর অন্ধকার, ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির ভেতরে বাস আমাদের গ্রাম্য সরু পিচঢালা পথের ধারে নামিয়ে দেয়। চারদিকে তাকিয়ে দেখি প্রান্তরের ভেতর একটি বাড়িতে টিমটিম করে হলুদাভ আলো জ্বলছে, এছাড়া ত্রিসীমানায় কোনো বাড়িঘর বা মানুষের নাম গন্ধ নেই। মাঝে মাঝে রাস্তা ধরে দুই একটি গাড়ি চলে যাচ্ছে। অন্ধকারে ঠিক বোঝার উপায়ও নেই রাস্তা ঠিক কোনদিকে গেছে। পথের নির্ণয় আমাদের অজানা; বৃষ্টির ছাটে ইতোমধ্যে জুতো ভিজে গেছে। তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি; বৃষ্টির জল তারও অধিক হিম। অল্প সময়ে হাত অসাড় হয়ে আসে। বৃষ্টির জল ঘিরে রাখা বাস স্টেশনের ক্ষুদ্র ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আমরা ছাতা বের করি, সঙ্গে গুগল ম্যাপ। ম্যাপ বলে এই ত্রিসীমানায় একটাই বাড়ি, আর এটাই সেই বাড়ি যেটা আমরা ভাড়া করেছি। মালিক আগেই আমাদের বার্তা দিয়ে দরজা খোলার কোড জানিয়ে দিয়েছেন, ফলে চিন্তা নেই। 

নয়েশভানস্ট্যাইন প্রাসাদ

মিনিট দশেক বৃষ্টিতে ভিজে আমরা সেই বাড়িতে পৌঁছাই। অন্ধকারে যা আবছা আবছা বোঝা যায় তাতে বাইরে থেকে বাড়িটিকে কাঠের খামার বাড়ির মতো দেখতে লাগে। যদিও ভেতরে অত্যাধুনিক। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট থেকে শুরু করে গরম জলের ব্যবস্থাও রয়েছে। দোতালা বাড়ি, নিচের তলায় বিভাজনহীন বিশাল রান্না আর বসার ঘর। ওপরের তলায় ঘুলঘুলির মতো বর্গাকার জানালাযুক্ত শোবার ঘর। দেরি না করে হাতমুখ ধুয়ে সবাই একসঙ্গে রান্নায় লেগে গেলাম। দীর্ঘ পথ ভ্রমণের পর রাতের খাবার ভালো হাওয়া চাই। সবাই মিলে ঠিক করা হলো জার্মান হংসবলাকার মাংস আর ডাল রান্না করা হবে। সদ্য বন্ধু হয়ে ওঠা মিঠুন সানার রান্নার সুনাম আগেই শুনেছি; কিন্তু সেদিন সেই ঘন বৃষ্টির শীতের রাতে বাভারিয়ান আল্পস পর্বতমালার কোলে জনহীন প্রান্তরের ভেতর বিশাল খামার বাড়িতে গল্প করতে করতে ঝরঝরে ধোঁয়া ওঠা বাসমতি চাউলের ভাতের সঙ্গে তেল উঠে যাওয়া হংসবলাকার মাংস ভোজনের প্রাক্কালে টের পেলাম কীভাবে রান্নাকেও নির্দ্বিধায় শিল্পকর্ম বলা যায়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলতেই চোখে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা। দ্রুত নিচে নেমে এলাম। এই প্রথমবার দিনের আলোয় দেখতে পেলাম আমরা ঠিক কোথায় আছি। বৃষ্টি থেমে গেছে। রোদ উঠি উঠি। বাড়িটির একটু সামনে দিয়ে আঁকাবাঁকা পিচঢালা সরু রাস্তা একটু সামনে গিয়ে দুই পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। তিন দিকে অবারিত ঢেউখেলানো উপত্যকায় হাঁটুসমান ঘাসের জলময় সবুজ প্রান্তর কিছু দূরে পাহাড়ের গায়ে বেঁচে থাকা পাইন (কীফ্যার্ন) গাছের ভেতর মিশে গেছে। বাড়ির পেছনের অদূরে ছোট টিলার ভেতর চিরসবুজ বৃক্ষের জমাট জঙ্গল। তাদের বৃষ্টিধোয়া পাতায় সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে। দূরে আল্পসের পর্বতমালার উপরে সাদা বরফ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আনন্দ আর ধরে না, বিপুল স্বাধীনতা বুকের ভেতর শ্বাস রাখে। আজ যেন তোড়াবাঁধা ফুল হাতে নিয়ে মুক্ত প্রান্তরে দৌড়ে বেড়ানোর দিন। 
একদিন বিকেলে এই সৌন্দর্যে বুদ হয়ে আমাদের কবিবন্ধু বোরজাহা তো বলেই ফেললেন, চলুন হেঁটে পাহাড়ে ওঠা যাক। আমার মনে তখন সঞ্জীবের পালামৌ-র কথা উঁকি দেয়। সমতলের মানুষের কাছে পাহাড় কিছুটা বিভ্রমের। আমি বন্ধুকে বললাম, সামনে যে পাহাড় দেখা যাচ্ছে এটা হাতের কাছে মনে হলেও আসলে প্রায় মাইল বিশেক দূরে। সে মানতে নারাজ। সত্য প্রমাণ করতে আমরা তিনজন পাহাড়ের দিকে জলময় সবুজ ঘাসের প্রান্তর মাড়িয়ে মৃদু মৃদু ভেজা বাতাসে প্রায় দু ঘণ্টা হাঁটলুম। যতই হাঁটি ততই মনে হয় ঐ তো পাহাড়, আর দুই মিনিট, কিন্তু ঘণ্টা পার হয়ে যায় তবু ওই একই দূরত্ব প্রতিভাত হয়।

আলগয় গিয়ে আমরা চেয়েছিলুম কেবলই অবকাশ যাপনের। অবসিত দিনের ভেতরে কেবলই আড্ডা আর বিশ্রাম। সারা পৃথিবীর দিকে পাঁচিল তুলে দিয়ে শুধুই নিজের জন্য কিছু সময় যাপন। কিন্তু কিছু সময় এমন আসে যখন সহজেই প্রলুব্ধ হয়ে যাওয়া যায়, তারপর অশরীরী কোনো শক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। ছবিতে দেখা সুরম্য নয়েশভানস্ট্যাইন প্রাসাদের সৌন্দর্য আমাদের চৈতন্যে ঢোকার পর অবকাশের প্রসঙ্গ অস্পষ্ট হয়ে আসে। পৃথিবীর সুন্দরতম এই প্রাসাদে যাওয়ার পথ দুর্গম। প্রথমে যেতে হবে জার্মানি আর অস্ট্রিয়ার শরীরে গড়ে ওঠা ইন নদীর তীরে ছোট্ট ফ্যুসেন (Füssen) শহরে। ফ্যুসেন থেকে কিছু অংশ বাসে গিয়ে বাকিটা পদব্রজে। ট্রেনে ফ্যুসেন যাওয়ার পথটি স্মরণীয়। আগেই বলেছি, তুষারের প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েও আমরা তুষার পাইনি। তখন তুলনামূলক গরম হাওয়ায় পাহাড়ের চূড়ার বরফ বাদে অন্য সকল তুষার গলে গেছে। তাপমাত্রার ঘোরাঘুরি ২-৪ ডিগ্রির সেলসিয়াসের মধ্যে। অন্য পথের তুলনায় এই পথে ট্রেন চলে খুব ধীরে। ছোট ছোট গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ধীর নদীর জলে ভেসে যাওয়া হিজল ফুলের মতো ট্রেনটি আমাদের নিয়ে জাদুকরী ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়। যত সামনে এগোই ততই দু’পাশের মেঘফুঁড়ে ওঠা আল্পস পর্বতমালা ঘনিয়ে আসে। মাঝে মাঝে মনে হয় পর্বতের কোলের ভেতর ছোট ঘাসের দোলনার ভেতর দুলে দুলে আমরা এগোচ্ছি। ট্রেনের গতি এত ধীর হয় যেন সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে দৌড়ানো যাবে। প্রতিটি মুহূর্তেই আমাদের মনে হতে থাকে, ইস যদি নেমে পড়া যেত। ওই যে দশ গজ দূরে সবুজ ঘাসে মোড়া টিলার উপরে দোচালা টালির ঘরটায় কেউ হয়তো দুপুরের খাবার রান্না করছে, আহা ওই বাড়িটির বারান্দায় যদি দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে সামনের আল্পস পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে একবার নিঃশ্বাস নেওয়া যেত!

ফ্যুসেন মূলত পাহাড়ের খাঁজে সবুজাভ ইন নদীর তীরে খুবই ছোট্ট শহর। বিখ্যাত নয়েশভানস্ট্যাইন প্রাসাদ দেখার জন্য এই শহরে সারা পৃথিবী থেকে আগত মানুষের ভিড়। শহরের অদূরে পাহাড়ের কোলে অনেক হ্রদের দেখা। সেই বরফযুগ থেকে আজ অব্দি তারা টিকে আছে। ভারী তুষারের সময়ে এসব হ্রদ জমে যায়, মানুষেরা তখন তার উপরে আইস-স্কেটিং করে। 

ফ্যুসেন শহরের অদূরে ফরগার হ্রদ 

বাস থেকে নামার পর নিচ থেকেই আল্পসের খাঁজে নয়েশভানস্ট্যাইন প্রাসাদ (Schloss Neuschwanstein) চোখে পড়ে। নিচ থেকেই সে অনিদ্যসুন্দর! উপরে উঠার জন্য জার্মান সরকার দারুণ পিচঢালা পথ করে দিয়েছে। এই পথে উপরে ওঠার দুই উপায়, এক বিশাল কেশরযুক্ত ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, দুই, হেঁটে। আমরা হেঁটে ওঠার সিদ্ধান্ত নেই। সাবধানে পথ চলতে হয়, পথিমধ্যে ঘোড়ার বড় বড় বিষ্ঠার দলা। অন্য একটি গাড়ি এসে সেটা পরিষ্কার করছে। পথ প্রায় দুই কিলোমিটারের মতো। পাহাড়ের গা বেয়ে খাড়া উঠতে হয়। পিচঢালা পথ হাওয়া সত্তেও সেই শীতে ঘামে শরীর ভিজে আসে। যত উপরে উঠি তত বেশি আশেপাশের এলাকার নয়নাভিরাম জলভরা  হ্রদ আর নীল দিগন্ত নজরে আসে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকি; দেড়শ বছর আগে কেবল ঘোড়ায় টানা গাড়ির সাহায্য নিয়ে বাভারিয়ার রাজা দ্বিতীয় লুডভিগ যখন এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন তখন কী কষ্টসাধ্য ছিল এর নির্মাণ! বাবা মারা যাওয়ায় অল্প বয়সে রাজা হন দ্বিতীয় লুডভিগ। তিনি ছিলেন জার্মান ইতিহাসের সবথেকে আলাদা রাজা। সাধারণত রাজারা যেখানে যুদ্ধ, সেনাবাহিনী ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সেখানে দ্বিতীয় লুডভিগ মেতে থাকতেন কবিতা, সংগীত আর শিল্প নিয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্পই পারে মানুষকে মুক্তি দিতে। সুন্দর ছিল তার আরাধ্য। যেখানেই যেতেন সেই এলাকার সৌন্দর্য নিয়ে ভাবতেন। একই সঙ্গে তার চলাফেরা পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল জার্মান ইতিহাসের সবথেকে শিল্পিত। সে কারণেই এখনো জার্মানিতে তাকে ‘রূপকথার রাজা’ ডাকা হয়। সংগীত নিয়ে এতই মেতে থাকতেন যে, অস্ট্রিয়ান রাজা যখন বাভারিয়া সাম্রাজ্য আক্রমণের পরিকল্পনা করছে তখনও তিনি মুদে আছেন সংগীতে। ভাগনার ছিলেন তার প্রিয়তম সংগীতজ্ঞ। একই সঙ্গে ছিলেন তার শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা। দ্বিতীয় লুডভিগের জন্ম মিউনিখের রাজপ্রাসাদে। সে সময়ে জার্মানি ভিন্ন ভিন্ন রাজার অধীনে বিভিন্ন সাম্রাজ্যে বিভক্ত ছিল। মিউনিখ ছিল মুক্ত সাম্রাজ্য বাভারিয়ার রাজধানী। একবার দ্বিতীয় লুডভিগকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কেন মিউনিখের বিশাল রাজপ্রাসাদ ফেলে রেখে এত দূরে আল্পস পর্বতের খাঁজে সুরম্য প্রাসাদ বানাতে চান। উত্তরে বলেছিলেন, ‘এখানে শহুরে আবহাওয়া আমার ভালো লাগে না। আমি দূরে কোথাও দুনিয়ার সুন্দরতম প্রাসাদে অবসর যাপন করতে চাই’। পেরেওছিলেন তিনি। আজ তাবৎ দুনিয়ার সুন্দরতম প্রাসাদের নাম নয়েশভানস্ট্যাইন।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে প্রাসাদের বড় বড় থাম চোখে পড়ে। মনে হয় যেন এখনো নতুন সুরভী তাতে লেগে আছে। তার প্রতিটি কারুকাজ যেন ময়ূরশোভিত। প্রাসাদের এক পাশে সেই দূর থেকে দেখা বরফমাখা আল্পসের চূড়া সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে তাকালে বুক হিম হয়ে আসে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফিট উঁচুতে আল্পসের খাঁজে এই প্রাসাদের অবস্থান। নিচে বয়ে যাওয়া ইন নদী আর বাহারি হ্রদ ছোট জলের রেখা বলে ভ্রম হয়। আমরা প্রাসাদ রেখে পাহাড়ি পথ ধরে আরও উপরে উঠি। যতই উপরে উঠি ততই জলের শব্দ স্পষ্ট হয়। কোথাও কি তবে ঝরনা আছে? একটু উপরে উঠে দেখা মেলে সেই বিখ্যাত মারিয়েন সেতু। দুই পাহাড়ের চূড়ার সঙ্গে সংযোগস্থাপনকারী প্রায় শত ফিটের অধিক দৈর্ঘ্যের এই কাষ্ঠসেতু স্তম্ভহীন। তার উপরে হাঁটার সময় অনবরত দোলে। তবু দ্বিধা জড়ানো উদ্যোগে সেতুর মাঝ বরাবর গিয়ে দাঁড়াই, সেটাই পৃথিবীর সুন্দরতম প্রাসাদ দেখার উপযুক্ত স্থান। সেতুর নিচ দিয়ে জলের ধারা বয়ে গেছে। সম্ভবত সেই জল ইন নদীতে গিয়ে মিশেছে।

দ্বিতীয় দিন আবারো অবসর ফেলে আমরা গেলাম কনস্ট্যান্স হ্রদের ভেতরে লিন্ডাউ দ্বীপে। আল্পস পর্বতের উত্তর পাদদেশে বিশাল এই হ্রদের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে রাইন নদী। কনস্ট্যান্স হ্রদের তিন অংশ পড়েছে তিন দেশে; উত্তর-পূর্ব অংশ জার্মানিতে, দক্ষিণ-পূর্ব অংশ অস্ট্রিয়ায়, পশ্চিম-দক্ষিণ অংশ সুইজারল্যান্ডে। ব্ল্যাক ফরেস্ট অঞ্চলে যখন থাকতাম তখন এই হ্রদে প্রায়ই ঘুরতে আসা হতো। এই হ্রদে আসার সময় একবার ঘটে যাওয়া ঘটনা সেদিন আসার পথে সঙ্গীদের সঙ্গে ভাগ না করে পারিনি।

তখন বাইশের জুলাই। ব্ল্যাক ফরেস্ট এলাকায় সেবার দারুণ গরম পড়েছে। আমার ছুটি চলছিল। হুট করে কী মনে হলো, ভাবলাম, যাই, কনস্ট্যান্স হ্রদের নীল জলে ঝাপাঝাপি করে আসি। যেতে ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। ট্রেন বদলানোর ঝামেলা নেই। যেই কথা সেই কাজ। সাঁতার আর গোসলের জন্য কাপড় গুছিয়ে নিলাম। সঙ্গে জলখাবার। একক ভ্রমণের এই এক সুবিধা, কারও মতামতের অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো যায়; কারও খুশি বেজার হাওয়া নিয়ে ভাবতে হয় না।
ট্রেন তখন পূর্ণ গতিতে ব্যাক ফরেস্টের বনরাজি, তার ছায়া আর উঁচুনিচু টিলার ভেতর দিয়ে সুনীল আকাশ আর গ্রীষ্মের গনগনে সূর্য মাথায় করে ছুটে চলছে। অধিকাংশ আসনই ফাঁকা। দ্বিতল ট্রেনে উঠলে সবসময়ই চেষ্টা করি উপরের তলায় বসার। সেখান থেকে অবলোকনের আনন্দ বেশি। আমি যেখানে বসেছি তার কয়েক আসন কাছেই স্বচ্ছ কাচে ঘেরা প্রথম শ্রেণির কামরা। সেই কামরার ভেতরে আফ্রিকা অঞ্চলের রং আর গড়নের বিশালদেহি একজনকে একা বসে থাকতে দেখি। আমার উল্টো পাশের সিটে বয়স্ক দম্পতি খোশগল্পে ব্যস্ত। এই বগির উপরের তালার অংশে এই চারজন ছাড়া আর কেউ নেই। কোমল ঋশভ ছন্দের সংগীত বাজছে আমার হেডফোনে। কিছু সময় পর টিটি আসেন। আমাদের তিনজনের টিকিট পরীক্ষা করে প্রথম কামরায় বসা ভদ্রলোকের কাছে যান। তাদের উচ্চস্বরের কথোপকথনে বুঝতে পারি ঝামেলা একটা লেগেছে। স্বর আরও উঁচু হলে সব কথা শুনতে পারি। 

কনস্ট্যান্স হ্রদ

টিটি তাকে বলছে, আপনার দ্বিতীয় শ্রেণিরই টিকিট নেই, কেন প্রথম শ্রেণিতে এসে বসেছেন? লোকটি জানায়, এখানে জায়গা ফাঁকা ছিল সে কারণে। টিটি বলে, ঠিক আছে সমস্যা নেই। তাহলে নিয়ম অনুসারে যে জরিমানা আসে সেটা পরিশোধ করুন। লোকটি অসম্মতি জানায়। টিটি তার কাছে আইডি কার্ড দেখতে চেয়ে সেটা রেখে দিয়ে বলে, জরিমানা পরিশোধ না করলে আপনার নামে রিপোর্ট করবো। দেখতে পাই লোকটি উত্তেজিত হয়ে তার বুক সমান টিটির দিকে তেড়ে আসছে। ধবধবে সাদা চামড়া আর সোনালি চুলের টিটি লোহিত-হলুদ মুখ নিয়ে কাচের রুম থেকে বেরিয়ে আমাদের রুমে আসে। এদিকে লোকটি আরও বেশি অশান্ত। ‘আমার আইডি কার্ড দে’ বলে যেই না টিটিকে সজোরে ঘুষি মারতে উদ্দত হয়েছে তখন তাদের মধ্যে আমি। ঘুষিটি থামাতে পারলেও লোকটিকে থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। শক্তিতে সে আমার মতো দু’জনের সমান। উচ্চতা সাত ফিটের কাছাকাছি। আমাকে বলে, আমার সমস্যা আমাকে সমাধান করতে দে। বলি, ট্রেনের মধ্যে মারামারি এ কেমন কথা! বয়স্ক দম্পতি চোখ বড় বড় করে আমাদের দেখছে, তাদের কপালে হঠাৎ খাবি খাওয়ার মতো ভয় কিংবা দুশ্চিন্তার বেগুনি রেখা। পড়লাম মহাবিপদে! আমার কাছে লোকটি বাঁধা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টিটি তার ওয়াকিটকিতে খবর অন্য সঙ্গীদের জানিয়ে দেয়। তখনো ট্রেন পূর্ণ গতিতে চলছে। অল্পক্ষণেই আরও দু’জন টিটি হাজির। আমি আর তারা দু’জন মিলেও লোকটিকে থামানো যায় না। তার এক কথা, আমার আইডি কার্ড ফেরত দে। টিটিরও এক কথা, জরিমানা দিতেই হবে। এদিকে আরেক টিটি পুলিশে খবর দিয়ে দিয়েছে। এভাবে মিনিট পনেরো অতিক্রান্তের পর ট্রেন থামে অজানা এক স্টেশনে। এই ট্রেন সাধারণত এই স্টেশনে থামে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম স্টেশনের চারপাশে লাল-নীল বাতি জ্বলমান কয়েকটি পুলিশের গাড়ি। প্ল্যাটফর্মের উপরে অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশে ছয়লাব। আমার পানি শুকানো বুকের ভেতর থেকে অজান্তে বেরিয়ে আসে- খাইছে আমারে!

পুলিশ লোকটিতে হাতকড়া পরিয়ে ট্রেন থেকে বের করার সময় আমাকে বলে, টিটির সঙ্গে আপনাকেও আসতে হবে আমাদের সঙ্গে। বললাম, আমি কী করেছি? তাছাড়া আমি যেতে পারব না। আমাকে এই ট্রেনেই কনস্ট্যান্স পৌঁছুতে হবে। কিছু জিজ্ঞাসার থাকলে ট্রেনেই জিজ্ঞেস করুন। পুলিশ বলে, আপনি এ ঘটনার বড় সাক্ষী। কী কী দেখেছেন সেটা দয়া করে আমাদের বলবেন। কিন্তু আমরা ট্রেন দাঁড়িয়ে রাখতে পারব না। এই ছোট্ট ঘটনায় ট্রেনকে দেরি করানো আমাদের এখতিয়ারে নেই। দয়া করে আসুন, আপনাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। অনিচ্ছা সত্তেও যা যা দেখেছি সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। এরপরের কাহিনি অবিশ্বাস্য! পুলিশের একটি গাড়িতে করে আমাকে এবং দু’জন টিটিকে হুইসেল বাজিয়ে দুই স্টেশন পরে ওই ট্রেন ধরিয়ে দেওয়া হলো। সবশেষে টিটি আমাকে দস্তখত এবং সিলমারা একটি কাগজ উপহার দিলেন, যেটা দেখিয়ে এই রুটে আমি বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে পারব। এখন বার্লিন থাকি বলে যদিও সে সুযোগ নেই, তবুও সে ঘটনা আজীবন মনে রাখার মতো।

এই ঘটনা সঙ্গীদের বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম লিন্ডাউ দ্বীপে। বড় বড় ঢেউতোলা কনস্ট্যান্স হ্রদের জল দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। গরমে যার রূপ সুনীল জলের স্রোতে মোহনীয়, আজ মেঘলা দিনে সে যেন অবসাদে আক্রান্ত। তার রূপের আলো আজ যেন মুছে গেছে। তবু তার বুকে জলকাটা পাখিরা আর হ্রদের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সারিসারি আল্পস পর্বতমালা মন ভালো করে দেয়।

অবসর যাপনের নামে আলগয়ে কাটানো দিনগুলো ছিল কিছুটা কুহক কিছুটা অনিদ্রার। সন্ধ্যায় গান গেয়ে আড্ডা দিয়ে লুডু খেলে আমরা সে কয়েকটি দিনে দ্বিগুণ জীবন্ত হয়ে উঠেছিলাম। আজও রাতের ভেতর শুয়ে শুয়ে ভাবলে সে সব দিনের অরুণ আভা করোটির মাঝখানে হাত রাখে।

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়