ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

এ কি শুধু দিল্লি জয়! || দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-০৪ ১২:৩৯:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৪ ২:৫৬:৫৬ পিএম
ভারতের আরেকটি উইকেটের পতন, বাংলাদেশের উল্লাস

ফিরোজ শাহ কোটলার নাম বদলে গেছে। শতবর্ষী কোটলা এখন ‘অরুন জেটলি আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম’। তাতে দিল্লি বদলে যায়নি। দিল্লি এখনও ভারতের রাজধানী। গতকালকের আগ পর্যন্ত দিল্লিতে অপরাজেয় ছিল ভারতের টি-টোয়েন্টি দল। এই স্টেডিয়ামে একটি মাত্র টি-টোয়েন্টি খেলেছিল ভারত; নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচ জিতেছিল। মানে, জয়ের রেকর্ড শতভাগ। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের শতভাগ জয়ের রেকর্ডও ছিল।

এতো সব রেকর্ড, এতো সব ইতিহাস তুচ্ছ করে দিল বাংলাদেশ। উড়িয়ে দিল সব অতীত। অবহেলায়, হাসতে হাসতে বাংলাদেশ দল সেই দিল্লি জয় করে ফেলল!

তবে এ কেবল দিল্লি জয়ের মতো সামান্য ব্যাপার নয়। ভারতের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি জয় করতে বাংলাদেশকে জিততে হয়েছে আরও অনেক লড়াই। এই এক ম্যাচ জয়ের পেছনে লুকানো রয়েছে আরও অনেক অপ্রকাশিত জয়ের গল্প। সেই গল্পই ফিরে দেখি বরং।

দিল্লির দূষণ: ভারতের রাজধানী শহরের বায়ুদূষণ গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার ব্যাপার। বিশ্বের নানা রকম দূষণ সূচকে শহরটি থাকে ওপরের দিকে। বিশেষ করে বছরের এই সময়ে, মানে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে শহরটির দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নভেম্বর মাসে দিল্লির বায়ু কখনো কখনো স্বাভাবিকের চেয়ে দশ গুণ পর্যন্ত দূষিত থাকে। ফলে মানুষের শ্বাসকষ্ট হওয়া, গলা-বুক জ্বালা করার মতো ব্যাপার থেকে শুরু করে অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটে।

বায়ুদূষণের প্রধান কারণ দিল্লির আশপাশের এলাকায় এই সময়ে ফসল ঘরে ওঠে। তারপর কৃষকরা ঐতিহ্যগতভাবে ফসলের অবশিষ্টাংশে আগুন ধরিয়ে দেন। এছাড়া দিওয়ালির রাতে এখানে পোড়ে মণকে মণ বাজি! এই দুইয়ের দূষিত পদার্থগুলো ভারী করে দেয় দিল্লির বাতাস। শীতকালীন হাওয়া আসার আগ পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে। ফলে এই সময় দিল্লিতে খুব একটা ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করা হয় না। তবে এবার দিল্লির রাজ্য সরকার আগে থেকে দাবি করছিল- দূষণ গত কয়েক বছরের চেয়ে কম হবে। ফলে খেলা চালানো যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের খেলার আগের দিন শহরটির দূষণ সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে। খেলার দিন শহরে খালি চোখে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ম্যাচ বাতিলেরও আলোচনা চলছিল।

শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতির একটু উন্নতি হওয়ায় খেলা চলল। চোখে জ্বালাপোড়া, গলাবুকে কষ্ট নিয়েই ক্রিকেটাররা এই অপরিচিত পরিবেশে খেললেন। খেলা তো নয়, যেনো পরিবেশের সাথে লড়াই!

ভগ্নপ্রায় দল: গতকাল বাংলাদেশের যে দলটা ভারতের বিপক্ষে জিতল, সেটাকে কাগজে কলমে অন্তত ‘বি’ টিম বললে খুব অন্যায় হয় না। এই দলে ছিলেন না সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল ও তরুণ সাইফউদ্দিন। এক সাকিব-ইকবাল না থাকলে দুনিয়ার যে কোনো দলের শক্তি অর্ধেক কমে যায়। সাকিব না থাকা মানে একজন বোলার নেই, একজন ব্যাটসম্যান নেই। সেই সাকিব গতকাল দলে ছিলেন না। মূলত তার এক বছর মেয়াদী নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পর গতকালই প্রথম ম্যাচ খেলতে নামল বাংলাদেশ।

দলেল সঙ্গে ছিলেন না তামিম। সম্প্রতি স্বেচ্ছা ছুটি শেষ করে ফিরেছিলেন ক্রিকেটে। ভারত সিরিজ দিয়ে আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সন্তানসম্ভবা স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার পাশে থাকতে হচ্ছে তামিমকে। ফলে বাংলাদেশ এই ম্যাচে পায়নি তার ইতিহাসের সেরা ওপেনারটিকে।

ছিলেন না অলরাউন্ডার সাইফউদ্দিন। এই তরুণ গত বছরখানেক বাংলাদেশ দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘদিন খোঁজ করার পর বাংলাদেশ একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার পেয়েছে। বিশ্বকাপেই তিনি বল হাতে ও ব্যাট হাতে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরেই পিঠের ব্যথা নিয়ে খেলছিলেন। আর পেরে ওঠেননি এই ব্যথার সাথে। অবশেষে তিন মাসের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে যেতে হয়েছে তাকে।

ভারতের রেকর্ড: ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে ফরম্যাটে বাংলাদেশের বেশ কিছু সাফল্য আছে। সেই ২০০৪ থেকে অনেকবারই এই দলটিকে হারানো গেছে। ২০১৫ সালে তাদের সিরিজও হারিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু টি-টোয়েন্টি সাফল্যের খাতায় ছিল একটা শূন্য। এই ফরম্যাটে ভারতের বিপক্ষে আগে আটটা ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ; জয় নেই একটিতেও। হ্যাঁ, দুটো ম্যাচ বাংলাদেশ অনায়াসে জিততে পারত। সর্বশেষ নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল। বাংলাদেশ একদম ট্রফিটার কাছে চলে গিয়েছিল। ১২ বলে ৩৪ রান দরকার ছিল ভারতের। এই ম্যাচ হারা কঠিন। কিন্তু সেখান থেকেই অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলেন দিনেশ কার্তিক। ম্যাচ বের করে নেন। এরপর মনে করা দরকার সবচেয়ে বড় কান্নার গল্পটা। ২০১৬ বিশ্বকাপে এই ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। সেখানেও উইকেটে ছিলেন এই মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দু’জনে তরতর করে বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন জয়ের কাছে। শেষ ওভারে দরকার ছিল ১১ রান। মুশফিক দুটো চার মেরে দিলেন দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে। পান্ডিয়ার শেষ ৩ বলে দরকার ছিলো ২টি মাত্র রান। কিন্তু হায়!

পরপর দুই বল তুলে মারতে গিয়ে আউট হয়ে ফিরলেন রিয়াদ ও মুশফিক। আর শেষ বলে মুস্তাফিজ হলেন রান আউট!

খেলোয়াড়দের আন্দোলন: মাত্র ক’দিন আগেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আন্দোলন শেষ করলেন। সেই আন্দোলনের পর এটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ। ফলে একটা আশঙ্কা ছিল যে, ওই আন্দোলনের ফলে ক্রিকেটাররা ক্রিকেট থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলতে পারে। ক্রিকেটাররা প্রথমে ১১ দফা, পরে ১৩ দফা দাবিতে ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। পরে বিসিবির সাথে আলোচনায় বসে ক্রিকেটার ও বিসিবির পক্ষ থেকে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিসিবি তাদের কিছু দাবি পূরণও করতে শুরু করেছে। ফলে ক্রিকেটাররা মাঝে বেশ কিছুটা সময় ভারত সফরের চেয়ে মানসিকভাবে তাদের আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একটা ভয় তো থেকেই যায়। ভয় থাকে যে, এই আন্দোলন ভারত সফরের প্রস্তুতিটা ঠিকমতো নিতে দিল কি না দলকে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, ক্রিকেটাররা তাদের কাজ ঠিকই করেছেন।

অভিজ্ঞতার অভাব: মিডল অর্ডারে মুশফিক ও রিয়াদ। আর বোলিংয়ে শফিউল ও মুস্তাফিজ। এই বাদ দিলে বাংলাদেশের এই দলটাকে আর খুব একটা অভিজ্ঞ বলা যায় না।  দলে তিনজন ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ ক্রিকেটার- আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, মোহাম্মদ নাঈম এবং আফিফ হোসেন। এই অনভিজ্ঞরা ভারতের মতো দলের বিপক্ষে তাদেরই দর্শক ভরা স্টেডিয়ামে কতোটা স্নায়ুর পরীক্ষা দিতে পারবেন, সে নিয়ে একটা সংশয় ছিল। এদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোচিং দলও একেবারে নতুন। কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর এটা মাত্র দ্বিতীয় এসাইনমেন্ট। বোলিং কোচ শার্ল ল্যাঙ্গাভেল্টেরও তাই। আর স্পিন কোচ ড্যানিয়েল ভেট্টোরির এটা প্রথম অভিযান বাংলাদেশের সাথে। সবমিলিয়ে এই অনভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে বিপাকে ফেলতে পারে, এমন ভয় করা অবান্তর ছিল না। কিন্তু সেই ভয়কেও জয় করেছে এই দল!

 

লেখক: ক্রীড়া সাংবাদিক, সাহিত্যিক

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন