ঢাকা     সোমবার   ১১ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৮ ১৪৩৩ || ২৩ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বার্সেলোনার শিরোপা উৎসব, হান্সি ফ্লিকের বুকভরা শোক

ক্রীড়া ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ১১ মে ২০২৬  
বার্সেলোনার শিরোপা উৎসব, হান্সি ফ্লিকের বুকভরা শোক

ফুটবল কখনও কখনও শুধু খেলা থাকে না। কখনও এটি হয়ে ওঠে মানুষের ভেতরের শক্তি, ভালোবাসা, ত্যাগ আর ভাঙা হৃদয়ের এক নীরব গল্প। রবিবার রাতের এল ক্লাসিকো ঠিক তেমনই এক গল্প লিখে রাখল স্পেনের আকাশে।

একদিকে বার্সেলোনার শিরোপা জয়ের উৎসব, অন্যদিকে কোচ হান্সি ফ্লিকের বুকভরা শোক। আনন্দ আর বেদনা- দুই বিপরীত নদী যেন এসে মিলেছিল একই মোহনায়।

আরো পড়ুন:

সকালের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি বার্সেলোনার শহরে। ঠিক সেই সময় ফোন আসে ফ্লিকের মায়ের কাছ থেকে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সংবাদগুলোর একটি পৌঁছে যায় তার কানে- তার বাবা আর নেই।

মানুষের জীবন কখনও কখনও এমন নিষ্ঠুর মোড়ে দাঁড় করায়, যেখানে চোখের জল লুকিয়ে দায়িত্বের পোশাক পরে নিতে হয়। ফ্লিকের সামনেও ছিল সেই মুহূর্ত। তিনি চাইলে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে পারতেন। চাইলে নিজেকে আড়াল করতে পারতেন শোকের নিভৃত ঘরে। কিন্তু তিনি যাননি। ডাগআউট ছেড়ে ওঠেননি। দলের পাশে থেকেছেন।

কারণ, তার কাছে বার্সেলোনা শুধুই একটি ক্লাব নয়; একটি পরিবার।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে জার্মান এই কোচের। তিনি বলেন, ‘‘দিনটি ছিল ভীষণ কঠিন। সকালে বাবার মৃত্যুসংবাদ শোনার পর তিনি দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন- খবরটি নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখবেন, নাকি খেলোয়াড়দের জানাবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দলকে সব বলেন। আর এরপর যা ঘটেছে, সেটি তিনি কোনোদিন ভুলবেন না।’’
হয়তো সেই মুহূর্তেই ড্রেসিংরুমে ফুটবলের সম্পর্ক ছাপিয়ে জন্ম নিয়েছিল আরও গভীর এক বন্ধন।

এল ক্লাসিকোর উত্তাপের মাঝেও সেদিন ছিল এক ধরনের নীরবতা। দুই দলের খেলোয়াড়ের হাতেই ছিল কালো আর্মব্যান্ড। মাঠে খেলা শুরুর আগে পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা। যেন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছিল একজন পিতাকে, আর শক্তি দিচ্ছিল একজন ছেলেকে।

এরপর শুরু হয় ম্যাচ। প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে বার্সেলোনা খেলছিল শুধু একটি ট্রফির জন্য নয়, তাদের কোচের জন্যও। মার্কাস রাশফোর্ড ও ফেরান তোরেসের গোলে ২-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে কাতালানরা। সেই জয়ের সঙ্গে নিশ্চিত হয় লা লিগার শিরোপাও।

গোলের পর বার্সার খেলোয়াড়েরা যেভাবে ছুটে গিয়ে ফ্লিককে জড়িয়ে ধরেছিলেন, তাতে বোঝা যাচ্ছিল- এটি শুধুই একটি জয় নয়। এটি ছিল একজন ভেঙে পড়া মানুষকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে রাখার চেষ্টা।

শেষ বাঁশির পর উৎসব আরও উন্মাতাল হয়ে ওঠে। খেলোয়াড়েরা ফ্লিককে কাঁধে তুলে নেন। আকাশে ছুড়ে দেন বারবার। অথচ সেই হাসির ভেতরেও লুকিয়ে ছিল এক গভীর শূন্যতা। হয়তো সেই মুহূর্তে ফ্লিক মনে মনে খুঁজছিলেন এমন একজন মানুষকে, যিনি ছোটবেলায় তার হাত ধরে প্রথম স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, জীবনে কোনোদিন এত ভালোবাসা অনুভব করেননি।

২০২৪ সালে বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্পেনের ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছে ফ্লিকের দল। ঘরোয়া ৬টি শিরোপার মধ্যে ৫টিই জিতেছে তারা। শুধু কোপা দেল রে হাতছাড়া হয়েছে। তবে ইউরোপের মঞ্চে এখনও অপূর্ণতা রয়ে গেছে। চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্ন এখনও অধরা।

কিন্তু ফ্লিক থামতে চান না। তার চোখে এখনও নতুন স্বপ্ন। তিনি চান বার্সেলোনাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে। তার বিশ্বাস, পুরো বার্সেলোনা শহর চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি দেখতে চায়। আর সেই স্বপ্নের দিকেই এগোতে চান তিনি।

মৌসুমে এখনও ৩টি ম্যাচ বাকি। আলাভেস, রিয়াল বেতিস ও ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে জয় পেলে ১০০ পয়েন্ট নিয়েও মৌসুম শেষ করতে পারে বার্সেলোনা। স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে যা খুব কম দলই করতে পেরেছে।

কিন্তু সংখ্যার হিসাবের বাইরেও এই রাত অন্য কারণে মনে থাকবে। কারণ, এই রাত শিখিয়েছে- কখনও কখনও মানুষ নিজের ব্যক্তিগত শোককে হৃদয়ের গভীরে চাপা দিয়েও অন্যদের জন্য আলো হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই আলোতেই জন্ম নেয় ইতিহাস।

ঢাকা/আমিনুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়