ঢাকা     শনিবার   ১৩ এপ্রিল ২০২৪ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩০

পঞ্চম পর্ব

দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

ইকরামুল হাসান শাকিল  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২৬, ৬ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৮:২৭, ৬ জানুয়ারি ২০২৪
দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

সেপ্টেম্বরের সাত তারিখ। সকালে মিল্লাত ভাইয়ের সঙ্গে নাস্তা করলাম। তিনি অফিসে চলে গেলেন। আমিও এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হলাম। পাঠাও অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে মটরসাইকেল কল করেছি। বাংলামুখি টেম্পলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মটরসাইকেল চালকের নাম রাজু শ্রেষ্ঠা। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি রাজু শ্রেষ্ঠা? সে মাথা নেড়ে জানাল- হ্যাঁ। মটরসাইকেলে উঠতেই জিজ্ঞেস করল, তুমি কোত্থেকে এসেছ? আমি বললাম, বাংলাদেশ থেকে। তারপর দু’জন গল্প করতে করতে কখন যে এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না! 

দাওয়া ফুটি আমার আগেই এয়ারপোর্টে চলে এসেছে। এয়ারপোর্টে প্রবেশ পথেই সে স্কুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বলল, তুমি এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে যাওয়ার গেইটে গিয়ে দাঁড়াও, আমি স্কুটি পার্কিং-এ রেখে আসছি। আমি দাঁড়ালাম। অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে গেস্টদের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে। এদের অধিকাংশই বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির গাইড বা প্রতিনিধি। সবাই গেস্টদের জন্য অপেক্ষা করছে। যাদের গেস্ট বেরিয়ে এসছে তারা গেস্টদের ফুল, খাঁদা পড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। 

দাওয়া স্কুটি রেখে চলে এলো। মুহিত ভাইদের বহনকারী বিমান ইতোমধ্যে কাঠমান্ডু এয়ারপোর্টে নেমেছে। মুহিত ভাই ফোন করে জানাল, তারা ইমিগ্রেশন শেষ করে ডাফল ব্যাগ সংগ্রহের জন্য বেল্টের সামনে অপেক্ষা করছেন। 

বারোটার মধ্যেই তারা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলেন। দাওয়া আগে থেকেই গাড়ি ঠিক করে রেখেছিল। আমরা সেই গাড়ির কাছে এসে মুহিত ভাইদের ডাফল ব্যাগ তুলে দিলাম। দাওয়া সবাইকে খাঁদা পরিয়ে দিল। তারপর আমরা সবাই মিলে ছবি তুলে হোটেলের উদ্দেশে রওনা হলাম। কাঠমান্ডু শহরের ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা থামেলে চলে এলাম। এজেন্সির পক্ষ থেকে হোটেল কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজে রুম বুকিং করা ছিল আগে থেকেই। 

হোটেলের কর্মকর্তা আমাদের রুমে নিয়ে গেলেন। আমাদের দুইটা রুম দেওয়া হয়েছে। এক রুমে মুহিত ভাই আর বিপ্লব ভাই এবং অন্য রুমে সানভি ভাই আর আমি। টিমের সাথে যোগ দিতে মুহিত ভাই আমাকে আজকেই মিল্লাত ভাইয়ের বাসা থেকে হোটেলে চলে আসতে বললেন। দুপুরের খাবার খেতে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম। ওয়েস্টর্ন তন্দুরিতে খেতে এসেছি। এখানকার খাবার বেশ সস্তা ও দারুণ। এখানে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আমাদেরকেও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলো। অপেক্ষার পালা শেষ করে দুপুরের খাবার খেতে বসে গেলাম। রেস্টুরেন্টের মালিক মহিলা। আমরা তাকে আন্টি বলে ডাকি। আন্টি এসে কুশল বিনিময় করলেন। টেবিলে খাবার দিতে দিতে মিনিট পাঁচেক সময় লেগে গেল। খাবার শেষে আমি মহারাজগঞ্জ চলে এলাম।  

দোগারি হিমাল অভিযানে আমার যেসব জিনিসপত্র প্রয়োজন হবে সেগুলো ডাফল ব্যাগে এবং রুকস্যাকে গুছিয়ে নিলাম। বাকি জিনিসপত্র বাসায় রেখে দিলাম। মিল্লাত ভাই অফিস থেকে ফিরে আসার পর থামেলে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। অভিযান শেষে আবার এই বাসায় ফিরে আসবো। সন্ধ্যার মধ্যেই আমি হোটেলে চলে এলাম। কিছু কেনাকাটা করে সন্ধ্যাটা কেটে গেল। আমরা আছি কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজে। এই হোটেল নেপালের ঐতিহ্যবাহী হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৫০ সালে সিদ্ধি বাহাদুর বাড়িসহ জমিটি মাত্র ৩৬ হাজার নেপালী রুপিতে ক্রয় করে তার প্রিয়তমা স্ত্রী বুদ্ধ মায়ার হাতে বাড়ির চাবি তুলে দেন। ১৯৬৮ সালে তাদের দুই সন্তান মাত্র সাতটি রুম নিয়ে গেস্ট হাউজটির যাত্রা শুরু করেন। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সুনামের সাথে টুরিস্টদের সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিগণ এখানে থেকেছেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা আরোহনকারী পর্বতারোহী জর্জ ব্যান্ড, দক্ষিণ-পূর্ব পাশ দিয়ে প্রথম এভারেস্ট আরোহনকারী পর্বতারোহী ডগ স্কট, সাপ্লিমেন্ট অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট আরোহনকারী পিটার হাবলার ও রেইন্ডহোল্ড মেসনার, লোনলি প্ল্যানেট বইয়ের লেখক ও প্রকাশক টনি এবং মউরিন হুইলার। 

হোটেলটির ভিতরে মায়া গার্ডেন নামে এক টুকরো সবুজ উদ্যান রয়েছে। উদ্যানের ওয়াকওয়েতে বিখ্যাত ব্যক্তিদের নাম লেখা আছে যারা এখানে থেকেছেন। উদ্যানে যেমন বিভিন্ন ধরনের ফুল-ফলের গাছ আছে তেমনই বিভিন্ন ধরনের নারী-পুরুষের স্ট্যাচুও আছে। ভিতরে ঢুকেই চোখে পড়বে বেঞ্চে বসা এক নগ্ন পুরুষমূর্তি, উদ্যানের মাঝখানে পিতলের বিশাল বড় এক বাজরা যা বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্যতম এক বস্তু। বাজরার পাশেই সবুজ ঘাসে শুয়ে আছে নগ্ন এক নারীমূর্তি। এখানে অবস্থানরত অতিথিরা এই উদ্যানে অবসর সময় কাটান। এশিয়ার সেরা হোটেলগুলোর মধ্যে এই কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজ ২৮তম। 

সকালেই চলে এসেছেন ইমাজিন নেপাল এজেন্সির মালিক বিখ্যাত শেরপা পর্বতারোহী মিংমা গ্যালজেন শেরপা। যাকে সবাই মিংমা জি নামেই চেনেন। হোটেলের বাগানে বসে তার সাথে অভিযানের প্ল্যানিং নিয়ে মিটিং চললো। নেপাল টিমের দলনেতা হিসেবের তার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ তিনি জরুরি একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে গেস্ট হিসেবে যোগ দিতে চীনে যাবেন। তাই তিনি আমাদের সাথে অভিযানে থাকতে পারবেন না। তবে তার তত্ত্বাবধানেই অভিযান হবে। মিটিং শেষে মিংমা চলে যাওয়ার পর আমার দুপুরের খাবার খেতে ওয়েস্টার্ন তন্দুরিতে এলাম। আমাদের সাথে খাবারে যোগ দিলেন নিশাত মজুমদার এবং মুহিত ভাইয়ের বন্ধু অভিজ্ঞ শেরপা পর্বতারোহী দাওয়া তেনজিং শেরপা। 

পুরো বিকেল কেটে গেল প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে। সন্ধ্যায় থামেলের লাস্ট বাইট কফি শপে কফি আড্ডায় আমাদের সাথে যোগ দিলেন মিল্লাত ভাই। কিছু সময় পর নিশু আপুও এলেন। নিশু আপু আমার জন্য তার কিছু  জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন। আগামীকাল তিনি বাংলাদেশে চলে যাবেন তাই তিনি ড্রাই ফুডস, চকলেট, আইচ বুট, রেইনকোট আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন যেন আমার অভিযানে ব্যবহার করতে পারি। আমাদের প্রায় ঘণ্টা দুয়েক আড্ডা হলো। আড্ডা শেষে মিল্লাত ভাই আর নিশু আপু চলে গেলেন। আর আমরা ডিনার করে হোটেলে ফিরে এলাম। 

সকালে আমরা হোটেল মালবেরিতে এলাম। আজ নয় তারিখ। নিশু আপু দেশে ফিরে যাচ্ছেন তাই তাকে বিদায় দিতে আমার এসেছি। দাওয়াও এসেছে। নিশু আপুকে বিদায় দিয়ে আমরা চলে এলাম কাঠমান্ডুর বৌদ্ধাতে। এখানে ইমাজিন নেপাল এজেন্সির অফিস। দোগারি অভিযানে নেপাল টিমের সদস্যদের সাথে এখানে সাক্ষাৎ হবে। একে একে কিলু পেম্বা শেরপা, তামটিং শেরপা, আংডু শেরপা ও নিমা নুরু শেরপা চলে এলো। অফিসটি মিংমা জি এর বাসার ছাদের চিলেকোঠায়। আমার সবাই ছাদে রোদের মধ্যে বসে ম্যাপ নিয়ে দোগারি অভিযানের প্লানিং করে নিলাম। এরপর এখান থেকে আমরা বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মুহিত ভাই, বিপ্লব ভাই, সানভি ভাই এবং মিংমা জি টেক্সিতে উঠে বসলেন। আমি কিলু পেম্বার স্কুটিতে যাচ্ছি। আধ ঘণ্টার মধ্যে আমরা দূতাবাসে চলে এলাম। রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী ও দূতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হলো। রাষ্ট্রদূত আমাদের সবাইকে শুভকামনা জানালেন। (চলবে)

চতুর্থ পর্ব : দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়