ঢাকা     শুক্রবার   ১২ এপ্রিল ২০২৪ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩০

ষষ্ঠ পর্ব

দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

 ইকরামুল হাসান শাকিল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫৮, ১৬ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৯:০১, ১৬ জানুয়ারি ২০২৪
দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

ঘুম ভাঙলো বিপ্লব ভাইয়ের ডাকে। সকাল সকাল হাঁটতে বের হলাম। গলিপথ এখনো ফাঁকা। গভীর রাত পর্যন্ত এই পথগুলো পর্যটক এবং স্থানীয় মানুষে ভরপুর থাকে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আমরা চা পান করে আবার হোটেলে চলে এলাম। কাঠমাণ্ডু গেস্ট হাউজের ডাইনিং-এ সকালের নাস্তা সেরে আমরা নেপালের ডিপার্টমেন্ট অব ট্যুরিজমের অফিসে রওনা হলাম। আমাদের আগেই দাওয়া চলে গেছে। আমাদেরও বেশি সময় লাগলো না। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই আমরাও চলে এলাম। 

দাওয়া আমাদের ডিরেক্টরের কক্ষে নিয়ে গেল। আগে থেকেই দাওয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। প্রথমেই মুহিত ভাই দলনেতা হিসেবে বেশকিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করলেন। তারপর ডিপার্টমেন্ট অব ট্যুরিজমের ডিরেক্টর যুবরাজ কাথিওয়ালা আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ অভিযানের অনুমতিপত্র তুলে দেন মুহিত ভাইয়ে হাতে। যুবরাজ কাথিওয়ালা আমাদের চা বিস্কুট আপ্যায়ন করলেন এবং বেশ কিছু সময় অভিযান নিয়ে গল্পও হলো। এখানেই পরিচয় হলো আমাদের অভিযানের লিঁয়াজো অফিসার দেবেন্দ্র ভট্টরয়ের সাথে। তিনিও অভিযানের বেসক্যাম্প পর্যন্ত থাকবেন আমাদের সাথে। তিনি অভিযানের অফিসিয়াল ফিল্ড রিপোর্ট তৈরি করে ডিপার্টমেন্ট অব ট্যুরিজমকে দেবেন। তবে আমাদের সঙ্গে যাবেন না।  

১২ অক্টোবর। ভোর রাত। এখনো দিনের আলো ফোটেনি। আমরা রুকস্যাক গুছিয়ে অভিযানের উদ্দেশ্যে হোটেল রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। গতকাল দাওয়া আামদের আজকের পরিকল্পনা জানিয়ে রেখেছিল। অতিরিক্ত জিনিসপত্র হোটেলের স্টোর রুমে রেখে দিলাম। আমাদের নেওয়ার জন্য গাড়িও চলে এসেছে। কিলু পেম্বা আর মিংমা জি এসেছেন হোটেলে। কিলু আমাদের সাথে যাবেন। সে নেপাল টিমের দলনেতা। মিংমা আমাদের বিদায় জানাতে এসেছেন। আমাদের শুভকামনা জানিয়ে মিংমা সবাইকে উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন। বেশি সময় নষ্ট না করে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম।  

আঁধা ঘণ্টার মধ্যেই চলে এলাম বালাজো বাস স্ট্যান্ডের কাছেই মেইন রোডে। এখানে আমাদের জন্য রিজার্ভ বাস দাঁড়িয়ে আছে। অভিযানের মালামাল বহন করার জন্য ১৩ জন পোর্টার, রান্নার জন্য একজন বাবুর্চি ও তার দুইজন সহযোগী এবং নেপাল দলের বাকি সদস্য আগে থেকেই বাসে অপেক্ষা করছিল। বাসে ওঠার পর কিলু সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। দিনের আলোয় কর্মব্যস্ত মানুষজন পথে বেরিয়ে পড়েছে। এখনো সূর্য ওঠেনি। সাড়ে ছয়টা নাগাদ বাস যাত্র শুরু করল। আমি বামপাশে জানালা খুলে বসেছি। ভোরের শীতল বাতাস খারাপ লাগছে না। কাঠমাণ্ডু শহরের ভিতর দিয়েই বাস চলছে। আমার পাশের সিটে সানভি ভাই বসেছে। মুহিত ভাই আর বিপ্লব ভাই পাশাপাশি বসেছেন। পেছন থেকে পোর্টারদের মধ্যে থেকে কেউ একজন ড্রাইভারকে বললো, গান চালাতে। ড্রাইভার গান ছেড়ে দিলেন। সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। সবাই গাইতে শুরু করল। নেপালী ভাষার গান হওয়াতে তেমন বুঝতে পারলাম না। তাই মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে নিজের মতো গান শুনতে লাগলাম আর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। 

ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে হেলেদুলে এগিয়ে চলছি। সবুজ পাহাড় দেখতে দেখতে কখন যেন দুই চোখে ঘুম চলে এলো বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখি একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তার বিরতি দিয়েছে। বেসিনে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলাম। ডিম ভাজি আর রুটি দিয়ে নাস্তা করলাম। এখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক বিরতির পর আবার বাস চলতে শুরু করল। রাস্তাটি যেহেতু কাঠমাণ্ডু থেকে পোখারার সেহেতু বেশ ব্যস্ত। রাস্তাটিও বেশ ভালো। বারোটার দিকে দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হলো। হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট বেশ পরিপাটি। অনেক মানুষের ভীড়। আমাদের ভিতরে একটি টেবিল পরিষ্কার করে দিলো। আমরা সেখানে হাত-মুখ ধুয়ে এসে বসলাম। আমাদের খাবার দেওয়া হলো। ডাল, ভাত, রাইশাক সাথে মুরগির মাংস। মুহিত ভাই রাইশাক পছন্দ করেন না। তিনি শাক আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি রাইশাক ভীষণ পছন্দ করি। খাবার শেষ করে মুহিত ভাইকে বললাম, ভাইয়া চা খাবো। ভাইয়া রেস্টুরেন্টের বাইরে একটি চায়ের দোকান থেকে আমাদের চা খাওয়ালেন। 

বিকেল তিনটের দিকে আমরা পোখারা এসে পৌঁছালাম। এবারই প্রথম আমি পোখারাতে এলাম। বাস পার্কে এসে দাঁড়ালো। কিলু আমাদের জানালো এখানে ঘণ্টাখানেক দেরি হবে। অভিযানে খাবারের জন্য রান্নার সবজি, চাল-ডাল, মুরগি, তেলসহ সকল কিছু এখান থেকে কেনাকাটা হবে। কিচেন স্টাফ আর শেরপারা সবাই কেনাকাটার জন্য বাজারে ঢুকে গেল। আমরা একটি গলিতে দাঁড়িয়ে চা খেলাম। পোখারা স্টেডিয়ামে জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হচ্ছে। দূর থেকে দেখতে পেলাম। প্রতিযোগিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শহড়জুড়ে। মুহিত ভাই আশেপাশে ঘুড়িয়ে দেখালেন। প্রায় ঘণ্টা দুই লেগে গেল এই পোখারাতে। 

কেনাকাটা শেষে সবাই বাসে উঠে বসলাম। বাস এখন একটি সরু রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করল। পথ এখন কিছুটা ভাঙাচোড়া। তবে খারাপ লাগছে না। দিনের আলো খুব দ্রুতই যেন লুকিয়ে গেল পাহাড়ের আড়ালে। রাতের অন্ধকারে চারপাশ ঢেকে গেল। 

পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বাস এগিয়ে চলছে। আকাশে বিশাল চাঁদ আমাদের সঙ্গে আছে। অন্ধকারে গাছগুলো উল্টো পথে দৌড়াচ্ছে। নিশ্চই ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে, জোনাকি আলো জ্বেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে-সবের কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসের ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝে বুঝতে পারছি রাস্তার বেহাল অবস্থা। সাড়ে নয়টার দিকে রাস্তার পাশে একটি ছোট রেস্টুরেন্টে রাতের খাবারের যাত্রা বিরতি দেওয়া হলো। বাস থেকে নেমে সবাই রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে গেল। আমি কিন্তু ঢুকলাম না। আমি রাস্তা ধরে একটু সামনে এগিয়ে এলাম। রাস্তার পাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে মাথা তুলে চাঁদ দেখতে লাগলাম। আমার সামনে পাহাড়ের গভীর গিরিখাদ চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট একটি মেঘের দল চাঁদ স্পর্শ করে চলে গেল। আমি মোবাইল ফোনে ছবি তোলার বৃথা চেষ্টা করলাম। এই সৌন্দর্য কোনো ক্যামেরায় ধরে রাখা সম্ভব না। বেশি সময় এখানে দাঁড়িয়ে চাঁদের এই মাতাল করা রূপ দেখার সুযোগ নেই। তাই দ্রুতই রেস্টুরেন্টে চলে এলাম। 

সবাই খাবার টেবিলে বসে আছে। মুহিত ভাই, বিপ্লব ভাই, সানভি ভাই ও আমি এক টেবিলেই বসেছি। কিলু এসে আমাদের জিজ্ঞেস করল, আমরা কী খেতে চাই? মুহিত ভাই আমাদের সম্মতি নিয়ে সবার জন্য নেপালী চিকেন থালি অর্ডার করলেন। নেপালী চিকেন থালিতে ভাতের সাথে মুরগির মাংস, ডাল, বিভিন্ন ধরনের সবজি, শাক, চাটনি ও সালাদ থাকে। শুধু মাংস ছাড়া বাকি সবই একাধিকবার নেওয়া যায়। এতে বাড়তি টাকা দিতে হয় না। খাবার চলে এলো। বড় স্টীলের থালার মাঝখানে ভাত আর ভাতের চারপাশে সবজি, শাক, চাটনি, সালাদ ও ছোট কাসার বাটিতে ডাল সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। 

খাবার শেষ করে আবার বাসে উঠে বসলাম। সেই ভোরে কাঠমাণ্ডু থেকে এই বাসে উঠেছি। এখনো জানি না কখন এই বাস জার্নি শেষ হবে। বাস আবার চলতে শুরু করল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। আমার আর ঘুম এলো না। আমি জার্নিতে তেমন ঘুমাতে পারি না। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চাঁদ দেখছি। মনে হচ্ছে গাছগুলো পেছনের দিকে দৌড়াচ্ছে আর চাঁদ আমাদের সাথে সাথে সামনে দৌড়াচ্ছে। ক্লান্ত চোখ মাঝে মাঝেই ঝাপসা হয়ে আসছে। তন্দ্রা ভেঙে আবার জানালার বাইরে চোখ রাখি। (চলবে)  

পড়ুন পঞ্চম পর্ব : দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়