ঢাকা     রোববার   ০৩ মার্চ ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১৯ ১৪৩০

অষ্টম পর্ব

দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

ইকরামুল হাসান শাকিল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৫, ৩১ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৩:১৯, ৩১ জানুয়ারি ২০২৪
দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

এই গ্রামটি খুব বেশি ঘনবসতিপূর্ণ না। যেহেতু এই গ্রামে মানুষের সংখ্যা কম তাই ঘরবাড়িগুলোও একটু ফাঁকা ফাঁকা। গ্রামটি খুব বেশি পুরনো না সেটা খুব সহজেই বোঝা গেল। প্রতিটি বাড়ির ঘরের চালা নীল রঙের টিন দিয়ে তৈরি। ঘরের দেয়াল পাথর বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তবে একটা বিষয় চোখে পড়লো, সেটা হলো দেয়ালে কাদামাটির প্রলেপ দেওয়া। প্রতিটা ঘরের দুইটা অংশ। নিচের অংশ, যেখানে গরু, ছাগল বা শূকর রাখা হয়। আর উপরের অংশে পরিবারের সবাই থাকে। 

প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বারান্দা আছে। বারান্দায় ভুট্টা ঝুলিয়ে রাখা আছে রোদে শুকানোর জন্য। গ্রাম ঘুরে এসে পুকুরের পাড়ে একটি বড় গাছের নিচে বসলাম। এই একটা মাত্র বড় গাছ গ্রামে। যদিও গাছে কোনো পাতা নেই। গাছটি মরে শুকিয়ে আছে। আমাকে দেখে বিপ্লব ভাইও চলে এলো। রোদের মধ্যে বসে বসে দুজনে গল্প করছি আর গ্রামের শিশুদের খেলা দেখছি। 

খাবার রান্না শেষ। মুহিত ভাই ডাকলেন খেতে। আমরা খেতে চলে এলাম। দোকানের সামনে ফাঁকা জায়গায় গ্রামের কিশোরীরা ভলিবল খেলছে। আমিও একপাশে দাঁড়িয়ে গেলাম খেলতে। দু’একটা বল খেলে খাবার প্লেট নিয়ে খেতে বসে পড়লাম। ডাল ভাতের সঙ্গে মুরগির মাংস আর সবজি দিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খেলাম। খাবার শেষে আমরা আবার ট্রেকিং শুরু করলাম। এখান থেকে গাড়ির রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের উপর ট্রেকিং ট্রেইল ধরে এগিয়ে চলছি। কখনো ঝুঁকিপূর্ণ রক ফল এরিয়া, আবার কখনো পাথুরে খাঁজ কাটা পথ ধরে হাঁটছি। সারাদিন পর এই উচ্চতায় ছোট একটি জঙ্গলের দেখা মিললো। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আলোছায়ার মধ্যে হাঁটার সময় পুরনো ও পরিত্যক্ত ঘর দেখতে পেলাম। শুকনো পাতা আর ঝোঁপঝাড়ের ভিতরে সবুজ শেওলায় ভাঙা দেয়াল ঢেকে আছে। যাযাবর পশুপালকরা এ সব ঘর বানিয়ে থাকতেন।  

বিকাল তিনটা নাগাদ আমরা নয়াবাজার নামক একটি গ্রামে এসে পৌঁছালাম। এখানে মাত্র দুটি বাড়ি। এক বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। এই গ্রামের সব বাড়িগুলো কিছুটা নিচে। এখান থেকে গ্রামটির ভিতরে যেতে প্রায় মিনিট দশেকের পথ। ঘরের দুটি অংশ। উপরের অংশ এবং নিচের অংশ। নিচের অংশে খাবারের জায়গা এবং উপরে থাকার। উপরে জায়গাজুড়ে একটি মাত্র রুম। এই রুমটাতেই আজ আমাদের রাত্রিবাস করতে হবে। প্রথম দিনের ট্রেকিং ভালোভাবেই শেষ হলো। বিকেলটা কাটলো গরম গরম চা, পপকর্ন আর গল্প আড্ডায়। হিমালয়ে সন্ধ্যার মধ্যে সবাই রাতের খাবার খেয়ে ফেলে। আমাদেরও তাই সন্ধ্যার মধ্যেই রাতের খাবার শেষ করতে হলো। এই উচ্চতায় বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। এখন তাপমাত্র প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। খাবার শেষ করে সবাই উপরের রুমে উঠে এলাম। রুমে কোনো চৌকি নেই। সবাইকে একসঙ্গে মেঝেতে শুতে হলো। 

আজ অক্টোবরের ১৪ তারিখ। ট্রেকিংয়ের দ্বিতীয় দিন। সবাই ভোর ছয়টার মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে রুকস্যাক গুছিয়ে নিলাম। সকালের নাস্তা শেষ করে দ্বিতীয় দিনের ট্রেকিং শুরু হলো সকাল সাতটার মধ্যেই। প্রথমেই নিচের দিকে সরু ট্রেইল ধরে নয়াবাজার গ্রামে এলাম। হিমালয়ের মানুষের দিন শুরু হয় ভোরের পাখিদের ডাকে। গ্রামের মানুষ সবাই কাজে ব্যস্ত। বাড়ির উঠানে কেউ ভুট্টার খোসা ছাড়াচ্ছে আবার কেউ পিঠে ঝুড়ি ঝুলিয়ে বাড়ির বাইরে কাজে বেরুচ্ছে। রোদে বসে এক মা তার শিশু সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছে। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে গ্রামটি পেরিয়ে এলাম। গ্রামের শেষে ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়ে একদম খাড়া পথ জিগজ্যাগ করে নামতে হলো প্রায় মিনিট বিশেক। এরপর একটি ঝুলন্ত ব্রিজ পাড় হয়ে নদী পাড় হয়ে এসে আবার খাড়া চড়াই উঠতে হলো। 

আজকের অধিকাংশ পথ গাড়ির পথ। বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধ্বস হয়েছে তাই রাস্তা বন্ধ। যে কারণে এখন গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে আছে। এই পথে ফোর হুইলার জিপ চলাচল করে। অল্প কিছু দিন আগেই এই পথ তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে তেমনটাই শুনতে পেলাম। বড় একটি পাহাড় ধ্বস চোখে পড়লো। পুরো রাস্তার উপরে ধ্বসটি হয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। বড়ো বড়ো পাথরের বোল্ডার আর গাছ ভেঙে পড়ে আছে। দেখে মনে হলো দুই একদিনের মধ্যেই ধ্বসটি হয়েছে। আমরা কোনো মতে গাছের ফাঁক দিয়ে এবং পাথরের বোল্ডারের উপর দিয়ে জায়গাটি পেরিয়ে এলাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম উপর থেকে গ্রামের একদল তুরুণ যুবক কিছু একটা কাঁধে করে নিয়ে নেমে আসছে। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো মৃত মানুষকে নামিয়ে আনছে। 

কাছে আসতেই দেখলাম একজন অসুস্থ বৃদ্ধ নারীকে নিচে নিয়ে যাচ্ছে। তাকসারাতে নিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। সেখানে ছোট একটি সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। আমি আগেও দেখেছি আপার ডোলপাতে একজন অসুস্থ কিশোরকে একইভাবে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে। গ্রামের কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে তাকে চিকিৎসার জন্য যেখানেই নিতে হবে সেখানেই নিয়ে যাবে। এই কাজ করে গ্রামের তরুণরা। আর এ কাজে প্রতিটি পরিবার থেকে কমপক্ষে একজন করে মানুষ থাকতে হবে। এটাই তাদের সামাজিক নিয়ম। একে অপরের বিপদে আপদে এভাবেই তারা পাশে থাকে। 

রাস্তার উপরে বড় একটা জলপ্রপাত। অনেক উপর থেকে রাস্তার পাথরের উপরে আছড়ে পড়ছে। প্রচন্ড ঠান্ডা পরিষ্কার পানি। এই জলপ্রপাতের পাশেই রাস্তার মধ্যে আমাদের দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হলো। কিচেন স্টাফ রান্নার কাজে লেগে গেল। কেউ সবজি কাটছে, কেউ রান্নার জিনিসপত্র জলপ্রপাতের পানিতে ধুয়ে নিচ্ছে, কেউ স্টোভে আগুন দিচ্ছে। রাস্তার উপরেই ম্যাট্রেস বিছিয়ে আমরা রোদে শুয়ে-বসে আছি। প্রথমে কিলু জামাকাপড় খুলে জলপ্রপাতে গোসল শুরু করল। তারপর একে একে বিপ্লব ভাই, নিমা ও আমিও হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নিলাম। 

গোসলের সময় পায়ের কাছে জলপ্রপাতের পানি যেখানে পড়ছে ঠিক সেখানে রংধনু দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। দূর থেকে, কাছ থেকে, উপর দিকে তাকিয়ে কিংবা নিচের দিকে তাকিয়ে, সমতলে কিংবা হিমালয়ে অসংখ্যবার বিভিন্নভাবে রংধনু দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু এই প্রথম রংধনুর মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি। এই অনুভূতি সুখের। গোসল করার পর শরীর প্রায় জমে যাবার অবস্থা। দ্রুত শরীর মুছে পোশাক পরে রোদে বসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। 

খোলা আকাশের নিচে জলপ্রপাতের পাশে রাস্তায় বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছি। ভাতের সাথে ডাল আর সবজি দিয়েই হলো আমাদের আজকের খাবার। খাবার শেষ করে আবার ট্রেকিং শুরু। বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ধ্বস এলাকা পেরিয়ে আসতে হলো। এর মধ্যে একটি জায়গায় চোখের সামনেই পুরো রাস্তা ধ্বসে নিচে নেমে গেল। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। পরে খুবই সাবধানতার সাথে এই জায়গাটি পাড় হলাম শেরপাদের সহযোগিতায়। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে রাস্তা উপরে উঠে গেছে। বড় বড় গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে মাটিতে। এ যেনো এক শিল্পীর শিল্পকর্ম। আমরা সেই শিল্পকর্ম মাড়িয়ে উপরে উঠে এলাম।

পড়ুন সপ্তম পর্ব : দোগারি পর্বতে বাংলাদেশের প্রথম অভিযান

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়