Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ১৬ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ২ ১৪২৮ ||  ০৩ জিলক্বদ ১৪৪২

জীবনে কাউকে শত্রু ভাবিনি: হাবীবুল্লাহ সিরাজী

হারুন পাশা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ২৮ মে ২০২১   আপডেট: ২৩:১১, ২৮ মে ২০২১
জীবনে কাউকে শত্রু ভাবিনি: হাবীবুল্লাহ সিরাজী

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ষাটের দশকে কাব্যচর্চার সূচনা। লেখালেখির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন আমৃত্যু। তাঁর কবিতায় রয়েছে বিষয়ভাবনার সুগভীর বৈচিত্র্য। মানুষ, মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস, লোকসমাজ এবং প্রগতির অভিযাত্রা উপজীব্য করে ব্যক্তির একান্ত মানস কিংবা নৈর্ব্যক্তিক ব্যঞ্জনা নির্মাণে পারঙ্গম কবি গদ্য রচনাতেও সমান সিদ্ধ। সদ্য প্রয়াত কবি-স্মরণে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুণ কথাসাহিত্যিক হারুন পাশা।

হারুন পাশা: ষাটের দশক আপনার কাব্যচর্চার সূচনা কাল। সে-সময় বাংলাদেশে কাব্যচর্চার পরিবেশ কেমন ছিল?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: বাংলাদেশ তো না, তখন পূর্ব-পাকিস্তান। ষাটের দশক রাজনৈতিকভাবে উত্তাল সময়। এই উত্তালের ভেতরেই সাতচল্লিশ পরবর্তী দেশবিভাগের পর আমাদের কবিতায় একটা অন্য হাওয়া লাগে। সেই হাওয়াটা কেমন? পঞ্চাশের লেখকেরা ঢাকা এলেন। তারা নতুন চিন্তা-ভাবনা করলেন। একটি অংশ চলে গেল পাকিস্তানি কিংবা ইসলামী মতাদর্শের দিকে আবেগ থেকে; নতুন রাষ্ট্র হয়েছে। এরপর আঘাত এলো যখন ভাষা আন্দোলন শুরু হলো। আমরা নতুন অভিঘাতের দিকে গেলাম। যার শুরু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে। 

হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় একটি সংকলন হলো। সেখানে প্রকৃতপক্ষে আমাদের সাহিত্যের, বিশেষভাবে আমাদের কবিতার অংশটুকু নতুনভাবে উন্মোচিত হলো। ষাটে এসে আমরা বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করি। বাংলা কবিতা নতুন একটি মোড় নেয় ষাটের দশকে। বিশেষ করে ছেষট্টি সালের ছয় দফার পর থেকে আন্দোলন, সংগ্রাম আমাদের চেতনার ভেতরে নতুন একটি বোধ দিয়ে গেল। ফলশ্রুতিতে কবিতার গায়ে একটা নতুন রঙ লাগল। 
তবে ষাটের দশকে আমি অন্তত যা দেখেছি, যাঁরা লেখালেখিতে এসেছিলেন তাদের নিষ্ঠা, তাদের পাঠ এবং চর্চায় অসম্ভব যত্নবান ছিলেন। এখনো তাদের ভেতর থেকে যারা লিখছেন তারা ধারাবাহিকতায় বাংলা কবিতার সঙ্গে পরম্পরায় আছেন। এরকম একটা পরিবেশের ভেতর আমরা কাব্যচর্চা শুরু করি।

হারুন পাশা: আপনি কখন স্থির করলেন কবিতা লিখবেন?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: ৬৬ সাল থেকে ভাবলাম কবিতা সিরিয়াসলি লিখবো এবং কবিতার সঙ্গে থাকবো। একুশের সময় প্রচুর সংকলন বের হতো। এবং এই সংকলনে সারা বছরের কবিতা প্রায় জড়ো করে রাখা হতো ওই সময়ে ছাপার জন্য। সাহিত্য পত্রিকা যা ছিল তাতে লেখালেখি হতো। ‘আজাদ’, ‘সংবাদ’, ‘সমকাল’ ছিল। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘কণ্ঠস্বর’ ছিল। এছাড়াও ভালো কিছু লিটলম্যাগ ছিল। বলা যায় একটি কাগজে লেখা ছাপা হলে সেই কাগজ কয়েকদিন কাছে রাখতেই পছন্দ করতাম।

হারুন পাশা: বুয়েটে সাহিত্যবন্ধু পেয়েছিলেন? সেখানে সাহিত্যচর্চার জন্য কেমন পরিবেশ ছিল? 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: বুয়েট থেকে আগে প্রতিবছর টেকনিক্যাল জার্নাল বের হতো। আমি ১৯৬৮-৬৯ সালে বুয়েটের কেন্দ্রীয় কমিটির সাহিত্য সম্পাদক ছিলাম। টেকনিক্যাল জার্নাল যেহেতু হতো, আমি বাংলায় একটি পত্রিকা করি। বুয়েটের হলগুলোতে বাৎসরিক সাহিত্য প্রতিযোগিতা হতো। সেখানে মৌলিক লেখালেখি, গল্প, কবিতার পাশাপাশি আবৃত্তি, এমনকি কোনো কোনো হলে সংগীতের চর্চা হতো। সংগীত প্রতিযোগিতা হতো। পরিবেশ ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো যে, সুষ্ঠু, সুন্দর যদিও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে বুয়েট সবসময়ই জড়িত ছিল, তবুও তার ভেতর দিয়ে মৌলিক একটা চিন্তা, সুন্দর একটি স্বপ্ন দেখার আগ্রহ বুয়েটের যারা ছাত্র ছিল তারা সব সময় রাখতো।

আর ‘বন্ধু’ শব্দটি বড় আপেক্ষিক। আমার নিজের একটি কবিতার বই আছে ‘আমার একজনই বন্ধু’। প্রথম লাইনটি এরকম: ‘আমার একজনই বন্ধু তার নাম হাবীবুল্লাহ সিরাজী’। বন্ধু এবং শত্রু দুটি শব্দ যদিও মনে হয় বিপরীতমুখি, কিন্তু একসঙ্গে চলে। তাই যে শব্দটি বন্ধু বললেন তাকে স্বজন হিসেবে, শরিক হিসেবে বিবেচনা না করে আমি অস্বীকার করবো না যে আমার লেখালেখির ৫৫ বছরের জীবনে কেউ নেই। প্রচুর আছে। এখনো যাদের সঙ্গে চলাফেরা করি, কথা বলি তাদেরকে শরীক হিসেবে বিবেচনা করি, বন্ধু হিসেবে না আনলেও। আমি জীবনে কাউকে শত্রু ভাবিনি। এটা আপনাকে নিশ্চিত বলতে পারি।

হারুন পাশা: আলোচনার এ পর্যায়ে একটা প্রশ্ন রাখি- কবিতা আপনার ভেতর কীভাবে তৈরি হয়?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: একেক জনের প্রক্রিয়া একেকভাবে কবিতা লেখার ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়। আপনি যেতে যেতে একটা ফুলের ঘ্রাণ পেলেন। ফুলের ঘ্রাণের সঙ্গে দেখলেন যে নিচে একটি কীটও পড়ে আছে। আপনার ভেতর হয়তো কুড়িয়ে পাওয়ার মতো ঐ ঘ্রাণ এবং কীট একসঙ্গে এলো। আপনি সেটাকে কবিতায় স্থাপন করলেন। কবিতা তার নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব রঙে এবং নিজস্ব দর্শনে চলে। কোনটি পদ্য এবং কোনটি গদ্য তা পৃথক করতে গিয়ে আমরা কোনো কোনো লেখাকে কবিতা এবং কোনো কোনো লেখাকে গদ্য বলছি। এ বলার মধ্য দিয়ে যে রূপটি প্রকাশিত হয়, যে ছবিটি চোখে ভাসে, গদ্যের একটি মোটামুটি প্রচলিত রীতি আমাদের চোখে ঠাসা থাকবে। লাইনগুলো টানা থাকবে। কবিতায় লাইনগুলো হয়তো একটু ভাঙা থাকবে। অবশ্য গদ্য কবিতার কথা অনেকে বলে থাকেন কিংবা বাইবেলিক ভার্সনের কথা বলেন, যে তার শরীর দেখে বোঝা যায় না। তবে কবিতার ভেতরে এমন একটি জিনিস থাকে যে জিনিসটি কবিও হয়তো অনেক সময় জানেন না, কখন সেই জিনিসটি সেখানে রেখেছেন। এমন কোনো মুক্তো থাকে ঝিনুকও জানে না, এটি তার পেটের ভেতরে আছে। সেই ফুলও জানে না তার এমন সৌরভ আছে যা পথিককে আকৃষ্ট করে। সেই কীটও জানে না তার এমন বিষ আছে যা একজনের জীবন হরণকারি হতে পারে। 

কবিতা অদ্ভুত এক বিষয়! কবিতা আশ্চর্য এক অবয়ব যা ভেতরে শব্দ থাকে, বর্ণ থাকে, গন্ধ থাকে এবং সর্বোপরী জীবনের একটা স্বপ্ন থাকে, বিশ্বাস থাকে, ধ্বংস থাকে আর আমরা এইসব কিছু নিয়েই কবিতাকে কখনো কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করি। কখনো তারও বাইরে গিয়ে অন্য কিছু হিসেবে যার নাম আমি জানি না হয়তো; চিহ্নিত করি।

হারুন পাশা: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৫ সালে। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : তিক্ত, ভালো- কোনোটাই নয়। বইয়ের পাণ্ডুলিপি বহুবার তৈরি করেছি। বহুবার বাতিল করেছি। আবার তৈরি করেছি। আমি কবি শামসুর রাহমানের ওখানে যেতাম। তিনি তখন ‘দৈনিক বাংলা’য় নিয়মিত বসতেন। একদিন তাঁকে বললাম, তিনি পাণ্ডুলিপি দিতে বললেন। দিলাম। তিনি বললেন দুইদিন পরে মতামত দেবেন। দুইদিন পরে তিনি কিছু না বলে আমাকে সরাসরি পাণ্ডুলিপি হাতে তুলে দিলেন এবং তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মুখটি প্রসন্ন। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। আমিও তাঁকে কিছু বলিনি। তবে নিজের ভেতরে অভিমান জন্মালো কিছু বলতে পারতেন শামসুর রাহমান। তখন ‘দৈনিক বাংলা’র বিল্ডিংয়ের চারতলায় আহসান হাবীব বসেন। তিনি সাহিত্য সম্পাদক। হাবীব ভাইকে পাণ্ডুলিপিটি দিলাম। বললাম এখানে আমার কিছু কবিতা আছে। বই করতে চাই। আপনি যদি পছন্দ-অপছন্দ কলম দিয়ে একটু টিক দিয়ে দেন। 

সাত কি দশদিন পরে গেলাম। পাণ্ডুলিপির পাতা উলটিয়ে দেখি অধিকাংশ কবিতাই টিক দেওয়া। এবারে মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিলাম বই করবো। প্রকাশক দরকার। কথায় কথায় প্রকাশনার কথাটি আবদুস সাত্তারকে বললাম। আবদুস সাত্তার তখন ‘পূর্বাচল’ পত্রিকার সম্পাদক। এটি সরকারি সাহিত্যের কাগজ। বের হতো তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনা দপ্তর থেকে। তার মাধ্যমেই ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ। প্রথম কবিতার বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা আমার ভালোই এবং আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে আনন্দ হয়।

হারুন পাশা: আপনার কবিতায় একটা গল্প থাকে ...

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: প্রত্যেক কবির কবিতায় গল্প থাকে। কখনো নৈর্ব্যক্তিক, কখনো সরাসরি। আমার গল্পটি এমন যে আমি একটি সূত্র ধরে এগোই। আমি একখানে খুঁটি পুতি এবং একটি সুতোর বল সেই খুঁটির সঙ্গে একমাথা বেঁধে বলটি ছেড়ে দেই। আমি জানি এই বলটি কতোদূর যেতে পারে এবং তাকে যাওয়ার অবকাশ দেই। দেয়ার পর আমার কাজ হলো বলটি যতো দূরে যাক না কেন সে যেন বুঝতে পারে আমি ঐ খানে বাঁধা আছি। এটি আমার গল্প। কথার কথা, আমি একটি কবিতা লিখছি লাইটার নিয়ে। আমি জানি যে এর দেহের ভেতরে কিছু জ্বালানি আছে এবং সেই জ্বালানি জ্বালানোর জন্য একটি আঘাত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এভাবে একটি জ্বালানি আঘাত দেওয়ার ব্যবস্থা, শরীরের গঠন সব কিছু মাথার ভেতরে নিয়ে আমি লেখাটি শুরু করতে চাই। তবে দেখা যায় শুরু এবং শেষ সব সময় এক থাকে না। ঐ সুতোর বলের কথা বললাম, মাঝে মাঝে সেটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। কেউ কাঁচি দিয়ে কেটে দেয়। কোনো ফড়িং তার উপরে বসে নষ্ট করে যাত্রাপথ, তা হয়। তবুও মোটামুটিভাবে গল্পটিকে টেনে নেওয়ার জন্য গল্পটিকে তার গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য একটি প্রক্রিয়া শেষ অবধি খেলা করে।

হারুন পাশা :  একটা কবিতায় বলেছেন ‘ইতিহাস বদমাশ হ’লে মানুষ বড়ো কষ্ট পায়’- এটা কেমন?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: খুব সরল সাপটা লাইন। ইতিহাস যদি বদমাশ হয় মানুষের বড়ো কষ্ট হয়। আমাদের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তা শাসকের ইতিহাস। কখনো ভূমির ইতিহাস লেখা হয়নি। কখনো ফসলের ইতিহাস লেখা হয়নি। কল্যাণের ইতিহাস লেখা হয়নি। এখন পর্যন্ত যতো ইতিহাস লেখা হয়েছে শাসক তার প্রয়োজন মতো ইতিহাস লিখিয়েছেন। এখানে তার প্রশংসা, কর্মযোগ, কর্মফল লেখা হয়েছে। তার যুদ্ধের কথা আছে। তার কল্যাণের কথা আছে। কিন্তু ঘামে ভেজা একজন মানুষ, রোদে পোড়া একজন মানুষ এবং তার পরিপার্শ্বের কথা ইতিহাস কখনো বলেনি। আমরা ইতিহাসের নামে আমাদের প্রবঞ্চনা করেছি। এটুকুই আমি বলতে চেয়েছি। ইতিহাস যখন বদমাশ হয় তখন মানুষের বড়ো কষ্ট হয়। 

সভ্যতা এমনই একটি জিনিস যার হাতে রচিত হয় সেভাবে তা বিকশিত হয়। হ্যাঁ, সভ্যতা যদি মানুষের হাতে রচিত হয়ে আসতো সারাজীবন, তাহলে সভ্যতার চিহ্ন অন্যরকম হতো। ইতিহাসও যদি মানুষের হাতে রচিত হতো, কিন্তু ইতিহাস মানুষের হাতে রচিত হয়নি। ইতিহাস তোষামোদকারীর হাতে রচিত হয়েছে, ইতিহাস অন্নভোগী মানুষের হাতে রচিত হয়েছে। পরান্নভোগী মানুষের হাতে রচিত হয়েছে। এই কথাটি আমি এই কবিতায় বলেছি।

হারুন পাশা: ‘যমজ প্রণালি’ কবিতার বইয়ের নামকরণ কেন এমন?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: আমার সঙ্গে আরেকটা আমি। আমার ছায়ার সঙ্গে আরেকটি কায়া। কায়াটি যদি আমি হই, ছায়াটি আমার সঙ্গে যায়। আমরা একে অপরের সঙ্গে যাচ্ছি। এটা একটি গেল। আরেকটি ব্যাপার হলো- একটি নয় দুটি প্রণালি যায়। লোকটি বড়ো হয় না। ছায়াটি কখনো বড়ো হয়, কখনো ছোটো হয়- এই। দার্শনিকভাবে অতো কিছু না।

হারুন পাশা: আপনার পঞ্চপাণ্ডব সম্পর্কে জানতে চাই।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: আমার প্রথম দিককার বই ‘হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি’, এটা গতানুগতিকতার বাইরে এসে লেখা। আমি চেয়েছিলাম একটি নয় বিভিন্ন বিষয় এক বইয়ে রাখবো। কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা যোগসূত্র থাকে কোনো শিরোনাম ছাড়া। এর ফলে নামটি খেয়াল করবেন ‘হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি’। এই কলটা হলো হাওয়া কল। হাওয়া কলে গাড়িটা জুড়ে দিলাম। গাড়িটা হলো কবিতাগুলো। পঞ্চাশটি কবিতা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরে আরেকটি বই লিখি। সেটি ‘মুখোমুখি’। এখানে একটি প্রশ্ন আছে, একটি উত্তর আছে। এখানেও উদ্দেশ্য ছিল শিরোনামহীন জুড়ে দেওয়া। এরপর ‘যমজ প্রণালি’ এটাও জুড়ে দেওয়ার ব্যাপার। সঙ্গে আরেকটি গেঁথে দেওয়া। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে একসঙ্গে গেঁথে দেওয়া। এই যে গাড়িটা আছে এটি মালগাড়ি, এটি মহিলাদের জন্য রিজার্ভ, এটি সেকেন্ড ক্লাস, এটি ফাস্ট ক্লাস, একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া। কিন্তু ইঞ্জিন একটি। মানে বইয়ের নাম একটি। গাড়িগুলো ভিন্ন। ‘সুভাষিত’ প্রায় তাই। ‘একা ও করুণা’ আরেকটি বই আমার। এটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে একটু ভিন্ন। একটু কাব্যনাটকের ফর্মে লেখা। তার ভেতর বাংলাদেশ আছে। বঙ্গবন্ধু আছে। গান্ধী আছে। পুলিশ আছে। চোর আছে। কিন্তু সব কিছুর নিয়ন্ত্রক দুইজন। সে কে? ‘একা’ একটি পুরুষচরিত্র। আর ‘করুণা’ একটি মেয়ে চরিত্র। এরা জীবনদর্শনের কথা বলছে। সৃষ্টির কথা বলছে। এরা কীভাবে এলো? এরা একদিকে থাকতো। একটি কাহিনিকে এভাবে কয়েকটি খণ্ডে জুড়ে দেওয়া। প্রতিটি খণ্ডের আগে কথামুখ আছে। আর প্রথম বই থেকে শেষ বই পর্যন্ত চল্লিশ বছরের ব্যবধান। এরা আমার পাঞ্চপাণ্ডব। 

মাঝেমধ্যে অনেকেই আমাকে বলেছে লেখার বাঁক বদল করছি, মোড় ফেরাচ্ছি। এই বইগুলো কিন্তু মোড় ফেরানোর অংশ হিসেবে কাজ করেছি। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর কবিতার বই প্রকাশের ভেতর দিয়ে যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে তা দিয়ে মহাকাব্য লিখতে পারবো না, সেই ক্ষমতা আমার নেই, এজন্য যে শক্তি বা মেধা দরকার বিবেচনা করি সেটাও আমার নেই। প্রয়োজনীয়তা মহাকাব্যের আছে কিনা তাও জানি না। তবে খণ্ড খণ্ড অংশের ভেতর যদি নিজেকে প্রকাশ করতে পারি, প্রকাশের অংশটুকু ছিন্ন করে ফেলে দিয়ে একটা অংশ নিলে বোঝা যায়, আবার সব একসঙ্গে করলেও বোঝা যায়- এই ভাবনা থেকেই এটি। মোদ্দাকথা, আমার পাণ্ডব সম্পর্কে আমার বলার অনেক, কিন্তু সব নির্ভর করবে পাঠকের গ্রহণযোগ্যতার উপর।

হারুন পাশা: আপনাকে আমরা ঔপন্যাসিক হিসেবেও দেখি। পদ্য এবং গদ্যের ফারাক আপনার কাছে বিষয়গুলো কেমন মনে হয়? 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: পদ্য ও গদ্যের মাঝে যে ফারাকটি কাজ করে তা হলো- পেন্সিলকে পেন্সিল হিসেবে আপনি কখন চিহ্নিত করেন? একটি কাঠির ভেতরে একটি শিস ঢুকানো আছে, এটার কোনোরকম অর্থ দাঁড়ায় না। যখন আপনি কাঠিটি কেটে শিসটি বের করলেন তখন তাকে পেন্সিল বলে। আমি চিকন করে লিখবো তখন খুব মিহি করে কাটবো। যখন মোটা করে লিখবো তখন মোটা করে কাটবো। গদ্য এবং পদ্যের ভেতর আমার ফারাক হলো এই চিকন করে কাটা, না মোটা করে কাটা প্রয়োজনমতো। আমার গদ্য লেখার ব্যাপারটা পেন্সিল কাটার মতো। পদ্য লিখতে লিখতে একটুখানি গদ্য লেখার চেষ্টা করি। অতি সম্প্রতি আমি কিছু লেখালেখির চেষ্টা করেছি যাপিত জীবনের, আত্মজীবনী বা ভ্রমণ বিষয়ক। 

বাংলায় একটি বাক্য লিখতে গেলে আমাদের সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয় ক্রিয়াপদ। তাকে কোথায় রাখি? যেমন, আপনি যখন প্রথম প্রথম বক্তৃতা দিতে ওঠেন তখন দুটি হাত কোথায় রাখবেন এ নিয়ে বড়ো বিপত্তি দেখা দেয়। হাত ঝুলিয়ে রাখবেন, না বুকে ভাঁজ করে রাখবেন? ক্রিয়াপদ এমনভাবে যন্ত্রণা দেয়। কিন্তু তাকে তো রাখতেই হবে। না রাখলে পরে বাক্য পূর্ণ হবে না। কোথায় রাখবো এই ব্যবহারটুকু শেখার জন্যই গদ্যে আসতে চেয়েছিলাম। কারণ ক্রিয়া পদ রাখার ব্যাপারটি কবিতায় এতো যন্ত্রণা দেয় না। ক্রিয়াপদ ব্যবহার না করেও আপনি কবিতা লিখতে পারবেন। 

শুরুর দিকে আমি গল্প নয়, কাহিনি লেখার চিন্তা করেছিলাম। তারই অংশ হিসেবে দুই বছর আগে আমার একটি গল্প নামের গ্রন্থ বেরিয়েছে ‘আয় রে আমার গোলাপজাম’। যে কথাটি আমি বলতে চাই, গদ্যে সেই কথাটি বলা সহজ করে দিয়েছে, কেন জানি মনে হয় কবিতায় যতো আড়াল করে হোক কিংবা পরিষ্কার করে হোক বলতে পারি। গদ্যে বলতে পারি না। 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়